মারাকানাজো: ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসের বেদনাদায়ক অধ্যায়
মারাকানাজো: ব্রাজিলের ফুটবল বেদনার অধ্যায়

১৯৫০ সালের ১৬ জুলাই। ব্রাজিল প্রস্তুতি নিচ্ছিলো এক মহাউৎসবের। বিশ্বকাপ জয়ের অপেক্ষায় প্রহর গুনছিল পুরো দেশ। যে উন্মাদনার কেন্দ্র ছিল রিও ডি জেনেইরোর ঐতিহাসিক মারাকানা স্টেডিয়াম। স্টেডিয়ামে আগত প্রায় দুই লাখের বেশি দর্শকে তখন শুধু স্বাগতিকদের জয়ই কামনা করছিলেন। কিন্তু ফুটবল কখনও কখনও এমন গল্প রচনা করে, যা কল্পনাকেও হার মানায়। ব্রাজিলে এমন এক রাতের জন্ম নিয়েছিল যা আজও কাঁদায় সেলেসাওদের। সেদিনের সেই ফাইনাল এখনও ইতিহাসে ‘মারাকানাজো’ নামে পরিচিত।

যুদ্ধোত্তর বিশ্বকাপের আয়োজন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সেটিই ছিল প্রথম বিশ্বকাপ। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে ফুটবল আবার বিশ্বমঞ্চে ফিরেছিল ১৯৫০ সালে। তবে সেই আসরের ফরম্যাট ছিল এখনকার বিশ্বকাপের চেয়ে আলাদা। অংশ নিয়েছিল মাত্র ১৩টি দল- ইউরোপ থেকে ছয়টি এবং আমেরিকা মহাদেশ থেকে সাতটি দেশ। চারটি গ্রুপে ভাগ করা দলগুলোর মধ্যে প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দল উঠেছিল চূড়ান্ত রাউন্ড-রবিন পর্বে।

ফাইনালের পথে ব্রাজিল ও উরুগুয়ে

তারই ধারাবাহিকতায় শেষ চারে জায়গা করে নেয় ব্রাজিল, উরুগুয়ে, স্পেন, ও সুইডেন। ব্রাজিল দুর্দান্ত ফুটবল প্রদর্শনীতে স্পেন ও সুইডেনকে উড়িয়ে দেয়। অন্যদিকে উরুগুয়ে স্পেনের সঙ্গে ড্র এবং সুইডেনকে হারিয়ে ব্রাজিলের বিপক্ষে শিরোপা নির্ধারণী লড়াইয়ে নামে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ম্যাচের নাটকীয় মোড়

স্বাগতিক ব্রাজিল তখন ছিল অপ্রতিরোধ্য। সংবাদপত্রগুলো আগেভাগেই স্বাগতিকদের জয়জয়কার করছিল। অনেকের চোখে ফাইনালটা ছিল আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। ম্যাচের ৪৭ মিনিটে ফ্রিয়াকা গোল করে ব্রাজিলকে এগিয়ে দিয়ে সেই চিত্রনাট্যের সূচনা পর্ব সাজিয়ে দিয়েছিলেন। মুহূর্তেই বিস্ফোরিত হয় মারাকানা। গ্যালারিতে শুরু হয়ে যায় উৎসব। কিন্তু ফুটবল দেবতার চাওয়া তো ছিল ভিন্ন! ৬৬ মিনিটে হুয়ান আলবার্তো শিয়াফিনো সমতা ফেরান উরুগুয়েকে। তখনও অনেকে ভাবেনি, সামনে কী অপেক্ষা করছে!

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ম্যাচের ৭৯ মিনিটে ইতিহাস লিখে ফেলেন আলসিদেস ঘিঘিয়া। ডান দিক দিয়ে এগিয়ে গিয়ে তার নেওয়া শট জড়িয়ে যায় জালে। মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো মারাকানা। ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায় লাখো দর্শকের চোখের সামনে।

অলৌকিক জয়ের নায়ক ও প্রভাব

উরুগুয়ের সেই জয়কে তখন বলা হয়েছিল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অলৌকিক ঘটনা। শুধু ফলাফলের কারণে নয়, যেভাবে তারা অপ্রতিরোধ্য ফেবারিটদের বিপক্ষে জয়টা ছিনিয়ে নিয়েছিল, সেটাই বিস্ময়ের জন্ম দেয়।

সেই ম্যাচের নায়ক ঘিঘিয়া তখন মাত্র ২৩ বছরের তরুণ। টুর্নামেন্টে উরুগুয়ের চারটি ম্যাচেই খেলেছিলেন তিনি এবং প্রতিটি ম্যাচেই গোল করেছিলেন। তবে ব্রাজিলের বিপক্ষে সেই এক গোল তাকে অমর করে রেখেছে।

ব্রাজিলের বেদনা ও শিক্ষা

বহু বছর পর পেলে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ওই ম্যাচের দিন প্রথমবার তার বাবাকে কাঁদতে দেখেছিলেন তিনি। শুধু তার বাবা নন, কেঁদেছিল পুরো ব্রাজিল। যা ফুটবল ইতিহাসে ব্রাজিলের বেদনাতুর এক অধ্যায়। উরুগুয়েতে অবশ্য এটি জাতীয় গৌরবের প্রতীক, যা এখনও আনন্দের সঙ্গে উদ্‌যাপিত হয়। তবে মারাকানাজো ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় এবং হৃদয়ভাঙা এক অধ্যায়। যে ম্যাচ শুধু একটি ট্রফির ভাগ্য নির্ধারণ করেনি, বদলে দিয়েছিল ব্রাজিলের ফুটবলের ইতিহাস। শেষ পর্যন্ত তারা ১৯৫৮ সালে বিশ্বকাপ জেতে- যা তাদের ইতিহাসে প্রথম। বলা হয়ে থাকে ১৯৫০ সালের সেই বেদনা ছাড়া তারা হয়তো কখনোই এই প্রতিযোগিতার ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল হয়ে উঠতে পারতো না।