এশিয়ান গেমস বাছাই খেলছে নারী হকি দল। প্রথম জয় পেয়ে ইতিহাসও গড়েছে অর্পিতা-রিয়ারা। তাদের পাশাপাশি বাংলাদেশের আরেক নারী আম্পায়ারও নীরবে ইতিহাসের পাতায় নাম তুলেছেন। সিনিয়রদের আন্তর্জাতিক আসরে এই প্রথম দেশের হয়ে বাঁশি বাজিয়েছেন কিমি কর্মকার। ইন্দোনেশিয়া-কাজাখস্তান ম্যাচে টার্ফে দুই আম্পায়ারের একজন ছিলেন কিমি। শুরুতে কিছুটা জড়তা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ৬০ মিনিটের ম্যাচ সফলভাবে পরিচালনা করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন নড়াইলের লোহাগড়া থেকে উঠে আসা সাবেক হকি খেলোয়াড়।
স্বপ্ন থেকে বাস্তবতা
৩০ বছর বয়সী কিমির স্বপ্ন ছিল জাতীয় হকি দলের হয়ে টার্ফে স্টিক হাতে খেলবেন। কিন্তু সেই সুযোগ পাননি। ২০১২ সালে হকি খেলা শুরু করলেও তখনও নারী জাতীয় দল গঠিত হয়নি। পরে বয়সভিত্তিক দল গঠিত হলেও সেখানেও জায়গা হয়নি। বয়সসীমার কারণে বারবার বাদ পড়তে হয়েছে। ফলে চার বছর আগে খেলা ছেড়ে আম্পায়ারিংয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন, আর সেখানেই আজ তিনি ইতিহাস গড়েছেন।
প্রথম ম্যাচের অভিজ্ঞতা
ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা থেকে অনুভূতি জানিয়ে কিমি বলেন, ‘আমাকে জাকার্তায় এসে বাঁশি বাজাতে হবে, তা এক মাস আগেই নিশ্চিত হয়। সে অনুযায়ী নিজেকে প্রস্তুত করেছি। নিয়মকানুন নিয়ে পড়াশোনা করেছি। বাংলাদেশে আমি বি গ্রেডের আম্পায়ার। এখানে প্রতিটি দেশ থেকে নতুন নারী আম্পায়ারদের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, সেই সুযোগেই আমি এসেছি। বাঁশি বাজিয়েছি—ভালোই লেগেছে।’
প্রশংসা ও ভুলত্রুটি শেখার সুযোগ
প্রথম ম্যাচের পর আয়োজকেরা তার পারফরম্যান্সের প্রশংসা করার পাশাপাশি ভুল-ত্রুটি ধরিয়ে দেন। কিমি বলেন, ‘গত বছর চীনে জুনিয়রদের একটি আসরে বাঁশি বাজিয়েছি, তাই খুব একটা ভয় পাইনি। জাকার্তায় প্রথম ম্যাচে শুরুতে পাঁচ মিনিটের মতো জড়তা ছিল। এরপর স্বাভাবিকভাবে ম্যাচ পরিচালনা করেছি। কোনও সমস্যা হয়নি। পরে আয়োজকেরা কোথায় ভুল করেছি, কোথায় ভালো করেছি—সবই জানিয়ে দিয়েছেন। সব মিলিয়ে আমি খুশি।’
চোট থেকে ফেরা
২০২১ সালে বাংলাদেশ গেমসের ফাইনালে নড়াইলের হয়ে খেলতে গিয়ে ডান হাত ভেঙে প্রায় নয় মাস মাঠের বাইরে ছিলেন কিমি। তখন মনে হয়েছিল, হকিতে আর ফেরা হবে না। তবে সবার সহযোগিতায় তিনি ফিরেছেন—তবে খেলোয়াড় হিসেবে নয়, আম্পায়ার হিসেবে।
ভবিষ্যৎ লক্ষ্য
ভবিষ্যৎ লক্ষ্য নিয়ে কিমি বলেন, ‘আমি আরও বড় পরিসরে বাঁশি বাজাতে চাই, দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনতে চাই। জাতীয় বা বয়সভিত্তিক কোনও দলেই খেলতে পারিনি। সে দিক থেকে আন্তর্জাতিক আম্পায়ার হতে পেরে আমি আনন্দিত। হাত ভেঙে যাওয়ার পর হতাশ ছিলাম, হকিতে ফিরতে পারবো কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা ছিল। পরে খেলা ছেড়ে আম্পায়ারিংয়ে আসি। এ জন্য ফেডারেশনকে ধন্যবাদ। এখন আরও কোর্স করে এগিয়ে যেতে চাই।’
পরিবারের সহযোগিতা
তিন ভাইবোনের মধ্যে কিমি মেজো। তিনি বাগেরহাটের শারীরিক শিক্ষা কলেজে পড়াশোনা করছেন। পরিবার থেকেও খেলা ও আম্পায়ারিংয়ে ভালো সহযোগিতা পাচ্ছেন। তবে দেশে নারী হকির প্রসার বাড়লে মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার পথ আরও সহজ হবে বলে মনে করেন তিনি।
কোচের প্রশংসা
নারী হকি দল গঠনের উদ্যোক্তা, কোচ ও কর্মকর্তা তারিকুজ্জামান নান্নু কিমির প্রশংসা করে বলেন, ‘খেলা ছেড়ে আম্পায়ারিংয়ে আসার পর থেকেই সে প্রতিভার পরিচয় দিয়েছে। আমাদের কোচ কাওসার ভাই আম্পায়ারিং কোর্স করিয়েছিলেন, সেখানে কিমি সবার মধ্যে প্রথম হয়। তখনই তাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আজ জাকার্তায় গিয়ে সে ইতিহাস গড়েছে—বাংলাদেশের প্রথম নারী আম্পায়ার হিসেবে সিনিয়র আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনা করেছে।’



