সুইডেন ১৯৫৮: পেলের সূর্যোদয়, ফুটবলের নতুন দিগন্ত
সুইডেন ১৯৫৮: পেলের সূর্যোদয়, ফুটবলের নতুন দিগন্ত

চার বছর আগে বার্নের অলৌকিক রাতে পশ্চিম জার্মানি হাঙ্গেরির স্বপ্ন ভেঙে বিশ্বকাপ ছিনিয়ে নিয়েছিল। সেই জয়ের উল্লাসে জার্মান জাতি যেন নিজেদের হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস বলছে, অতিমাত্রায় আত্মবিশ্বাসী মানুষ কখনও কখনও নিজের পতনের দরজাটাও নিজেই খুলে দেয়। ফুটবলের মুকুট যেমন গৌরব এনে দেয়, তেমনি তার ভারও বহন করতে হয় রক্তমাংসের মানুষদেরই।

১৯৫৪ সালের সেই অবিশ্বাস্য সাফল্যের পর পশ্চিম জার্মান দলে বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম আর অতিরিক্ত মদ্যপান সব মিলিয়ে ছড়িয়ে পড়ল জন্ডিস। একে একে ছিটকে গেলেন তুরেক, কোহলমেয়ার, লিবেরিশ, মাই, ওটমার ওয়াল্টার এবং মরলক। তবু এক মানুষ ছিলেন জার্মানদের কেন্দ্রবিন্দু, সাঁইত্রিশ বছর বয়সী ফ্রিটজ ওয়াল্টার। তার চোখে ছিল অভিজ্ঞতার ধূসর আলো, যুদ্ধবিধ্বস্ত এক প্রজন্মের দীর্ঘ ক্লান্তি আর ফুটবলের প্রতি অটুট ভালোবাসা। তিনি বুঝতে পারছিলেন, ফুটবলের সাম্রাজ্য খুব দ্রুত বদলে যেতে চলেছে।

হেলমট রানকে আবার ডানপ্রান্তে ফিরিয়ে আনা হলো। নতুন মুখ হিসেবে উঠে এলেন দুই শক্তিমান ফুটবলার, লেফট হাফ জিমানিয়াক এবং হামবুর্গের তরুণ সেন্টার ফরোয়ার্ড উয়ে জিলার। মাত্র আঠারো বছর বয়সে জাতীয় দলে জায়গা পাওয়া এই কিশোরকে দেখে অনেকেই বলেছিলেন, ‘এই ছেলে একদিন জার্মান ফুটবলের প্রতীক হবে।’ ভবিষ্যৎ সত্যিই সেই ভবিষ্যদ্বাণীকে সম্মান জানিয়েছিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অন্যদিকে আর্জেন্টিনা এসেছিল দোদুল্যমান এক দল নিয়ে। মাত্র এক বছর আগে মাসচিও, অ্যাঞ্জেলিলো ও সিভোরির পায়ে দক্ষিণ আমেরিকা কেঁপেছিল। তাদের ফুটবলে ছিল ট্যাঙ্গোর ছন্দ, ছিল রাস্তাঘাটের উন্মাদ সৌন্দর্য। কিন্তু ইতালির ক্লাবগুলো তাদের প্রতিভায় এতটাই মুগ্ধ হয়েছিল যে মোটা অর্থের বিনিময়ে টেনে নিয়ে গেল ইউরোপে। আর্নেস্টো গ্রিলোর মতো শান্ত ফুটবলারও জড়িয়ে পড়লেন সেই ইউরোপীয় মোহে। ফলে আর্জেন্টিনার দল হয়ে পড়ল ছিন্নভিন্ন, অসংলগ্ন, আত্মাহীন। বলিভিয়ার মতো অপেক্ষাকৃত দুর্বল দলের কাছেও তারা হারল। প্রবীণ নেস্তর রসিকে ফিরিয়ে আনা হলেও তার মধ্যে আর আগের সেই দৃঢ়তা ছিল না। মনে হচ্ছিল, একসময়ের দুর্দান্ত আর্জেন্টিনা যেন নিজের ছায়াকেই খুঁজে ফিরছে।

কিন্তু ফুটবলের আকাশে তখন অন্য এক সূর্য ধীরে ধীরে উঁকি দিতে শুরু করেছে। সেই সূর্যের নাম ব্রাজিল। সুইডেনে পৌঁছানোর পর থেকেই ব্রাজিল যেন টুর্নামেন্টজুড়ে এক অন্যরকম আলো ছড়াতে থাকে। তাদের উপস্থিতির মধ্যেই ছিল উৎসবের গন্ধ। বাছাই পর্বে পেরুর বিপক্ষে শেষ ম্যাচে তারা জিতেছিল মাত্র এক-শূন্য গোলে। কিন্তু সেই এক গোলই ইতিহাস হয়ে যায়। ডিডির নেওয়া সেই ‘ফলিং লিফ’ ফ্রি-কিক, যা পরে ‘ব্যানানা শট’ নামে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়। বল বাতাসে এমনভাবে বাঁক নিত যেন প্রকৃতিও তার গতিপথ বুঝতে পারছে না।

অথচ সেই ডিডিকেই বাদ দেওয়ার কথা উঠেছিল! অভিযোগ ছিল, তার বয়স ত্রিশ, তিনি শ্বেতাঙ্গ নারীকে বিয়ে করেছেন, অনুশীলনে আগের মতো মনোযোগী নন। ডিডি হেসে বলেছিলেন, ‘আমাকে বাদ দিলে সেটা খুব হাস্যকর হবে। দলের অনেকের টিকিটের দামও তো আমি দিয়েছি!’ কথাটির ভেতরে ছিল ব্যঙ্গ, ছিল আত্মবিশ্বাস, ছিল এক ধরনের আহত অহংকার।

১৯৫৬ সালের ইউরোপ সফর ব্রাজিলকে ভেতর থেকে বদলে দিয়েছিল। সেখানেই তারা বুঝতে পারে চার-দুই-চার কৌশলের অসীম শক্তি। দেশে এই পদ্ধতি নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠলেও কোচ ভিসেন্তে ফিওলা পিছিয়ে যাননি। তার বিশ্বাস ছিল, ফুটবল শুধু রক্ষণ নয়, ফুটবল হলো মুক্তির নাচ। আর সেই চার-দুই-চার ছিল যেন সাম্বার তালে ছুটে চলা এক ঝড়, যেখানে গতি, আক্রমণ, শিল্প আর ছন্দ একসাথে বিস্ফোরিত হতো। সেই ফুটবলে ছিল রিও ডি জেনেইরোর সৈকতের স্বাধীনতা, ছিল দরিদ্র বস্তির ছেলেদের স্বপ্ন, ছিল আনন্দকে অস্ত্র বানানোর দুঃসাহস।

ফিওলা সুইডেনে নিয়ে এলেন ব্রাজিলের ইতিহাসের অন্যতম সেরা দল। তার পাশে ছিলেন চিকিৎসক ডক্টর হিল্টন গসলিং, যিনি খেলোয়াড়দের শরীরের পাশাপাশি মনও তৈরি করতেন। গোটেনবার্গের বাইরে হিন্ডাস বনের ভেতর তিনি খুঁজে বের করেন নিখুঁত অনুশীলন কেন্দ্র। সেখানে প্রতিদিন প্রতিধ্বনিত হতো ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারদের সম্মিলিত চিৎকার। দূরে দাঁড়িয়ে সোভিয়েত খেলোয়াড়রা বিস্ময়ে সেই অনুশীলন দেখতেন। যেন যুদ্ধের আগে সৈনিকদের প্রস্তুতি চলছে, আর তাদের একমাত্র অস্ত্র একটি বল।

গসলিং দীর্ঘ বক্তৃতা দিতেন না। তিনি প্রতিটি খেলোয়াড়কে আলাদা করে বুঝিয়ে দিতেন প্রতিপক্ষের দুর্বলতা, বিপদ আর সুযোগ। তার কাছে ফুটবল ছিল বিজ্ঞান, মনস্তত্ত্ব ও শিল্পের মিশ্রণ। তিনি জানতেন, বড় ম্যাচ জিততে শুধু পা নয়, মনও শক্ত হতে হয়।

ফিওলা তখনও দ্বিধায় ছিলেন তরুণ জোসে আলতাফিনিকে নিয়ে। ‘ম্যাজোলা’ নামে পরিচিত উনিশ বছরের এই স্ট্রাইকার সদ্য ইতালির মিলানে মোটা অঙ্কের টাকায় যোগ দিয়েছেন। ফিওলার মনে সন্দেহ ছিল, অল্প বয়সে এত খ্যাতি তরুণ মনকে পথভ্রষ্ট করতে পারে। তাই তিনি আস্থা রাখলেন ভাভার ওপর, এক নীরব, কার্যকর আর নির্মম গোলশিকারির ওপর।

কিন্তু পৃথিবী তখনও জানত না, ব্রাজিলের প্রকৃত বিস্ময় এখনও পুরোপুরি মঞ্চে আসেনি। মাত্র সতেরো বছরের এক কিশোর, পেলে। চোখে শিশুর সরলতা, পায়ে মহাবিশ্বের জাদু। আরেক বিস্ময় ছিলেন গারিঞ্চা। তার পা ছিল বিকলাঙ্গ, হাঁটাচলা ছিল অদ্ভুত, কিন্তু বল পায়ে পেলেই তিনি যেন প্রকৃতির নিয়ম ভেঙে ফেলতেন। তার ড্রিবলিং, বডি ফেইন্ট আর বাঁক নেওয়া দৌড়, সবকিছুই ছিল ব্যাখ্যার বাইরে। যেন ঈশ্বর ফুটবলকে আনন্দ দিতে এক ভুলভাল শরীরের ভেতরে অলৌকিক প্রতিভা ঢেলে দিয়েছেন।

চার-দুই-চার কৌশলে ব্রাজিলের দুই হাফব্যাক মাঝমাঠে উঠে আসতেন, উইঙ্গাররা ঝড়ের বেগে সামনে ছুটতেন, আর প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের ওপর নেমে আসত দমবন্ধ করা চাপ। এই কৌশল চালাতে দরকার ছিল অক্লান্ত দৌড়, সৃজনশীলতা ও প্রতিভা। ব্রাজিলের কাছে সেই সম্পদ ছিল অফুরন্ত।

জাগালো হয়ে উঠলেন এই কৌশলের প্রাণ। তার ফুসফুস যেন অন্তহীন। টাচলাইনের একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্তে ছুটে চলতেন তিনি। মাঠের ঘাসও যেন তার ক্লান্তি অনুভব করতে পারত না। তার দৌড়ের ভেতরে ছিল এক ধরনের শ্রমজীবী সৌন্দর্য।

ইংল্যান্ডও স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল সুইডেনে। কিন্তু মিউনিখ বিমান দুর্ঘটনা তাদের দলের আত্মাকে ভেঙে দিয়েছিল বহু আগেই। রজার বায়ার্ন, টমি টেলর ও ডানকান এডওয়ার্ডস, সেইসব মৃত ফুটবলারের স্মৃতি যেন প্রতিটি ইংরেজ খেলোয়াড়ের চোখে ছায়া ফেলে রাখত। তবু জনি হেইনস, ববি রবসন ও ব্রায়ান ডগলাসদের নিয়ে তারা লড়াই চালিয়ে যায়। তাদের ফুটবলে ছিল ব্যথা, ছিল হারিয়ে যাওয়া প্রজন্মের জন্য নীরব শোক।

সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে সাহসী ফুটবল খেলেও তারা আটকে যায় লেভ ইয়াশিনের কাছে। কালো পোশাকের সেই গোলরক্ষককে তখন মনে হতো যেন অন্ধকার থেকে উঠে আসা কোনো প্রাচীর। তার উপস্থিতিই প্রতিপক্ষের আত্মবিশ্বাস কাঁপিয়ে দিত।

গ্রুপ পর্বে ব্রাজিল ও ইংল্যান্ডের ম্যাচ শেষ হয় গোলশূন্য সমতায়, যা ছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম গোলহীন ম্যাচ। ডিডি মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করেন রাজকীয় ভঙ্গিতে, ভাভার শট বারে লাগে, ম্যাজোলার হেড ঠেকিয়ে দেন ম্যাকডোনাল্ড। কিন্তু সেদিনও পেলে ও গারিঞ্চা পুরোপুরি বিস্ফোরিত হননি। তবু সবাই বুঝতে শুরু করেছিল, একটি ঝড় এগিয়ে আসছে।

সেই ঝড় নেমে এল সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে। গোটেনবার্গের সেই বিকেলে গারিঞ্চা যেন প্রথম মিনিট থেকেই ফুটবলকে খেলনা বানিয়ে ফেললেন। কুজনেতসভ তার সামনে অসহায় হয়ে পড়েন। প্রথমে ড্রিবল, তারপর গতি, তারপর বাঁক। গারিঞ্চা যেন প্রতিটি মুহূর্তে প্রতিপক্ষকে নতুন অপমান উপহার দিচ্ছিলেন। একবার তার শট পোস্টে লাগে। কিছুক্ষণ পর পেলের শটও পোস্টে আঘাত করে ফিরে আসে। এরপর ডিডি মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে উঠে এলেন। সোভিয়েত রক্ষণ ভেঙে পাস দিলেন ভাভাকে। গোল। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, ব্রাজিল আর ফুটবল খেলছে না, ফুটবলকে নতুনভাবে সৃষ্টি করছে।

ডিডি এবার পাশে পেলেন জিটোকে। ডিনোর বদলে দলে আসা এই রাইট হাফ ব্রাজিলের রক্ষণকে আরও শক্তিশালী করে তুললেন। একই সঙ্গে আক্রমণেও যোগ দিলেন সমান দক্ষতায়। পুরো প্রতিযোগিতায় তাকে সেরা হাফব্যাক বলা হয়েছিল।

আর পেলে? তিনি যেন অন্য এক গ্রহের প্রাণী। ট্রেস কোরাসোঁসের দরিদ্র কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারে জন্ম নেওয়া এই ছেলেটিকে ছোটবেলায় প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন সাবেক আন্তর্জাতিক ফুটবলার ডি ব্রিটো। তিনিই তাকে নিয়ে যান সান্তোস ক্লাবে। উচ্চতা পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি, কিন্তু শরীর যেন ইস্পাতের। আকাশে লাফ দিলে মনে হতো, বাতাসও তাকে আটকে রাখতে পারে না।

মাঠে যুদ্ধ চলত, কিন্তু পেলের মুখে থাকত শান্তি। তিনি খেলতেন নদীর মতো কোমল হয়ে, তারপর হঠাৎ বজ্রপাতের মতো আঘাত করতেন।

ব্রায়ান গ্ল্যানভিল লিখেছিলেন, পেলে কখনও সাধু ছিলেন না, আঘাতের বদলে আঘাত দিতেও জানতেন, কিন্তু তার শিশুসুলভ নির্মলতা কখনও হারিয়ে যায়নি। পৃথিবী তাকে ভালোবেসেছিল, কারণ তার প্রতিভার সঙ্গে মিশে ছিল মানবিক এক আলো।

গারিঞ্চাকে দলে নেওয়ার জন্য খেলোয়াড়রাই ফিওলার কাছে অনুরোধ করেছিলেন। নিল্টন সান্তোস নেতৃত্ব দেন সেই আবেদনে। ফিওলা শেষ পর্যন্ত রাজি হন। ম্যাচের আগে নিল্টন সান্তোস গারিঞ্চাকে বলেছিলেন, "আজ কিন্তু আমাকে সম্মান রাখতেই হবে।" গারিঞ্চা হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, "তুমি বরং লাইনসম্যানের দিকে তাকাও, লোকটাকে চার্লি চ্যাপলিনের মতো লাগছে!" এমনই ছিলেন তিনি, চিন্তাহীন, মুক্ত, একেবারে শিশুর মতো।

কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলের সামনে দাঁড়ায় ওয়েলস। জন চার্লসের অনুপস্থিতিতে ওয়েলস আত্মরক্ষামূলক ফুটবল খেলতে থাকে। জ্যাক কেলসি গোলপোস্টে দেয়াল হয়ে দাঁড়ান। গারিঞ্চার সঙ্গে দারুণ লড়েন মেল হপকিন্স।

তারপর এল সেই মুহূর্ত। ষাট মিনিটে পেলে রক্ষণভাগের মাঝখানে বল পেয়ে শরীরের শক্তি দিয়ে ডিফেন্ডারকে সরিয়ে দেন। বলটি নিয়ন্ত্রণে এনে ঘুরে শট নেন। গোল। মাত্র সতেরো বছরের এক কিশোর বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজের প্রথম গোল করল। কেউ তখনও বুঝতে পারেনি, এই গোল বিশ্বফুটবলের ভাগ্য বদলে দেবে।

অন্য কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্স বিধ্বস্ত করে আয়ারল্যান্ডকে। ফনটাইন, কোপা ও পিয়ানটনির আক্রমণ যেন আগুনের ঢেউ। সুইডেন হারায় সোভিয়েত ইউনিয়নকে। আর পশ্চিম জার্মানি কষ্টে পেরোয় যুগোশ্লাভিয়াকে।

সেমিফাইনালে গোটেনবার্গে সুইডেন ও পশ্চিম জার্মানির ম্যাচে স্টেডিয়াম পরিণত হয় জাতীয়তাবাদের উত্তপ্ত মঞ্চে। সুইডিশ দর্শকদের চিৎকারে আকাশ ফেটে যাচ্ছিল, "হেজা! হেজা! হেজা!" জার্মানি প্রথমে এগিয়ে গেলেও লিডহোম, হ্যামরিন আর গ্রেণের জাদুতে ম্যাচ ঘুরে যায়। শেষ পর্যন্ত সুইডেন জেতে তিন-এক গোলে।

অন্য সেমিফাইনালে স্টকহোমে ব্রাজিলের সামনে ফ্রান্স। ফনটাইন ও কোপা দুর্দান্ত খেলছিলেন। কোপা মাঝমাঠে সৃষ্টি করছিলেন আতঙ্ক। কিন্তু সেদিন পেলে যেন আকাশ থেকে নেমে এসেছিলেন। ভাভা গোল করেন। ফনটাইন সমতা ফেরান। তারপর শুরু হয় পেলের ঝড়।

একের পর এক আক্রমণ, ড্রিবল, শট। ফ্রান্সের রক্ষণ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। পেলে করেন হ্যাটট্রিক। ব্রাজিল জিতে যায় পাঁচ-দুই গোলে।

বিশ্ব তখন বুঝে গেল, নতুন রাজা এসে গেছে।

ফাইনাল। স্টকহোমে প্রচণ্ড বৃষ্টি। রাসুন্ডা স্টেডিয়াম ভিজে একাকার। সুইডিশ দর্শকের গর্জনে কাঁপছে চারদিক।

শুরুতেই সুইডেন এগিয়ে যায়। গ্রেণের পাস থেকে লিডহোম গোল করেন। চার মিনিটের জন্য ব্রাজিলকে অসহায় দেখাচ্ছিল।

তারপর গারিঞ্চা জেগে উঠলেন।

জিটোর পাস পেয়ে তিনি ডানপ্রান্ত দিয়ে ছুটলেন। তার বাঁকানো দৌড়ে সুইডিশ রক্ষণ দিশেহারা। শেষ মুহূর্তে পেছনে বল বাড়িয়ে দিলেন ভাভাকে। গোল। এক-এক। এরপর আবার গারিঞ্চা। আবার তার দৌড়। আবার ভাভা। দুই-এক।

তারপর এল সেই গোল, যা ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর গোলগুলোর একটি হিসেবে আজও স্মরণীয়। পেলে বক্সের মধ্যে উঁচু বল নিয়ন্ত্রণে আনলেন। মাথার ওপর দিয়ে ডিফেন্ডারকে কাটালেন। বল মাটিতে পড়ার আগেই বজ্রগতির ভলি। গোল।

সুইডিশ রক্ষক শুধু তাকিয়ে রইলেন। পৃথিবীও তাকিয়ে রইল।

জাগালো পরে আরেকটি গোল করেন। সুইডেন একটি গোল শোধ দিলেও শেষ মুহূর্তে পেলে হেড করে পঞ্চম গোলটি করেন। শেষ বাঁশি বাজতেই ব্রাজিলিয়ানরা ছুটে বেড়াতে লাগলেন মাঠজুড়ে। কেউ কাঁদছেন, কেউ হাসছেন, কেউ পতাকা নিয়ে দৌড়াচ্ছেন।

পেলে কাঁদছিলেন শিশুর মতো।

মাত্র সতেরো বছর বয়সে তিনি জিতে ফেলেছেন বিশ্বকাপ। কিন্তু সেদিন শুধু ট্রফি জেতা হয়নি। সেদিন জন্ম নিয়েছিল এক নতুন ফুটবল দর্শন। ব্রাজিলের সাম্বা ফুটবল বলে দিল, ফুটবল শুধু ফল নয়, ফুটবল হলো সৌন্দর্য। ফুটবল শুধু কৌশল নয়, ফুটবল হলো কল্পনা। ফুটবল শুধু প্রতিযোগিতা নয়, ফুটবল হলো মানুষের আত্মার উৎসব।

সুইডেনের সেই বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় বিশ্বফুটবলের আকাশে যে সূর্য উঠেছিল, তার নাম পেলে। আর সেই সূর্যের আলো আজও নিভে যায়নি। পেলে ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল ঘটনাপ্রবাহ: ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬