শত বছরের ঐতিহ্য আর লোকবিশ্বাসকে ঘিরে পঞ্চগড়ের প্রত্যন্ত গ্রামে বসেছে পাগলির বাজার। শনিবার (২৭ জুন) বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত পঞ্চগড়ে এভাবেই জমে উঠেছিল এক দিনের পাগলির মেলা।
মেলার আয়োজন ও পরিবেশ
প্রতিবছর মহররম মাসের ১১ তারিখে পঞ্চগড় সদর উপজেলার গরিনাবাড়ি ইউনিয়নের জনবসতিপূর্ণ শেখপাড়া গ্রামে কাঁচা সড়কের ওপর বসে শতবর্ষী এই মেলা। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। একদিকে বিভিন্ন বয়সী মানুষের পদচারণার সঙ্গে দেশীয় খাবার, মুড়ি-মুড়কি, জিলাপি, স্থানীয় কুটির ও মৃৎশিল্পীদের তৈরি নানা সামগ্রী আর খেলনার পসরায় মুখর হয়ে উঠেছিল পুরো এলাকা।
পাগলির কবর ও মানত
একইসঙ্গে মেলার প্রবেশমুখে থাকা পাগলির কবর ঘিরেও ছিল মানুষের ভিড়। কবর ঘিরে কেউ এসেছেন মানত পূরণে টাকা, জিলাপি কিংবা মিষ্টি নিয়ে। মাঠের অভাবে গ্রামের কাঁচা সড়কের দুপাশজুড়েই বসে সারি সারি দোকান। চারদিকে জিলাপি ভাজার সুগন্ধ, রঙিন বেলুন, খেলনা, বাঁশির সুর আর শিশুদের উচ্ছ্বাসে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো গ্রামে।
দর্শনার্থীদের অভিমত
কেনাকাটার পাশাপাশি শত বছরের গ্রামীণ ঐতিহ্যকে কাছ থেকে উপভোগ করতেই দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন নানা বয়সী মানুষ। শেখপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আশিকুর রহমান বলেন, ‘ছেলেকে নিয়ে পাগলির বাজারে এসেছি। অনেক ভালো লাগছে, নানা ধরণের দোকান ও আয়োজন এই পাগলির বাজারকে ঘিরে শুরু হয়েছে।’ সুজন ইসলাম বলেন, ‘এই মেলাটি দীর্ঘদিনের মেলা। কাউকে আয়োজন করার জন্য সিদ্ধান্ত নিতে হয় না। প্রতিবছর এই সময়ে বিভিন্ন দোকান এসে বসে। একটা উৎসবের আয়োজন হয়।’
পাগলির মেলার ইতিহাস
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১০০ বছর আগে আমিরন নামের এক মানসিক ভারসাম্যহীন নারী ভারত সীমান্তঘেঁষা শেখপাড়া গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন। ঘন গাছপালা ও ঝোপঝাড়ে ঘেরা গ্রামটিতে তিনি একা, নীরবে-নিভৃতে থাকতেন। তবে আশুরার সময় তিনি মানুষের মাঝে এসে মহররম ও আশুরা নিয়ে গীত শোনাতেন। স্থানীয় লোকজনও মনোযোগ দিয়ে তার সেই গীত শুনতেন। একদিন হঠাৎ আমিরনের মৃত্যু হলে স্থানীয় লোকজন তাকে গ্রামের সড়কের পাশে সমাহিত করেন। পরে প্রতিবছর তার মৃত্যুবার্ষিকীতে স্থানীয় লোকজন কবরের পাশে দোয়া ও ফাতেহা পাঠ করতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে সেটিই রীতিতে পরিণত হয়। একসময় আমিরনের কবর ‘পাগলির মাজার’ নামে পরিচিতি পায়। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর ১১ মহররম বসতে শুরু করে ‘পাগলির মেলা’।
স্থানীয়দের বক্তব্য
স্থানীয় বাসিন্দা আশরাফুল ইসলাম (৫০) বলেন, ‘মেলাটা মূলত আমাদের বাড়ির সামনেই হয়। এ জন্য একটু দেখাশোনা করতে হয়। এই মেলা পরিচালনার কোনো কমিটি নেই। প্রতিবছর ১১ মহররমের দিনে দোকানদার আর দর্শনার্থীরা এমনিতেই ভিড় শুরু করেন। কেউ কেউ পাগলির মাজার জিয়ারত করে দোয়া করেন। আমি যেমন ছোটবেলা থেকে এ রকম মেলা লাগতে দেখছি, আমার বাবাও নাকি এভাবেই দেখেছেন। তবে শুনেছি, আমাদের দাদারা নাকি ওই পাগলির বিষয়ে জানতেন।’
আয়োজকের বক্তব্য
আয়োজক আসাদুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছরে এই আয়োন হয়ে থাকলেও এবার বাজারটির দেখাশোনা আমরা করছি। সুশৃঙ্খলভাবে বাজারটি পরিচালনা করতে সব ধরণের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।



