রাঙ্গামাটিতে বৈসাবি উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন
বর্ষ বিদায় ও বরণের প্রাক্কালে পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি এখন উৎসবের রঙে সেজেছে। বৈসাবি উৎসবকে ঘিরে শহর, নগর এবং পাহাড়ি পল্লিগুলোতে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে শুরু হয়েছে চার দিনব্যাপী এই ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানমালা, যেখানে বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, চাংক্রান, চাংলান, পাতা ও বিহু নামে পরিচিত বিভিন্ন উৎসব একসাথে পালিত হচ্ছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের বিস্তারিত
বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, চাংক্রান, চাংলান, পাতা ও বিহু উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার। সাবেক উপসচিব প্রকৃতি রঞ্জন চাকমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক সাংসদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য উষাতন তালুকদার। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মনোজ্ঞ নৃত্য পরিবেশনের পর উপস্থিত অতিথিরা বেলুন উড়িয়ে উৎসবের শুভ সূচনা করেন।
শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন
উৎসবের প্রথম দিন সকালে রাঙ্গামাটি পৌরসভা প্রাঙ্গণ থেকে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়, যা শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে রাঙ্গামাটি শিল্পকলা একাডেমী মিলনায়তনে গিয়ে শেষ হয়। শোভাযাত্রায় বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তরুণ-তরুণীরা নিজ নিজ সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে অংশগ্রহণ করেন, যা স্থানীয় সংস্কৃতির বৈচিত্র্যকে ফুটিয়ে তোলে। এরপর চিংহ্লামং মারী স্টেডিয়ামে শুরু হয় চারদিন ব্যাপী বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যেখানে মঞ্চ নাটক, নৃত্য ও সঙ্গীত পরিবেশনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
নেতাদের বক্তব্য ও আহ্বান
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উষাতন তালুকদার বলেন, ‘পাহাড়ের ১৩টি ভাষাভাষী মানুষ বর্ষ বিদায় ও বরণকে কেন্দ্র করে এই উৎসব পালন করেন। বিজু মানে অস্তিত্ব, বিজু মানে সংস্করণ। আমরা অনেক ভাষা ও সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলেছি, তাই আমাদের ঐতিহ্যকে ভুলে না যাওয়ার জন্য সতর্ক থাকতে হবে।’ তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘পার্বত্য অঞ্চলকে অবহেলিত না রেখে আমাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করুন। আমরা বাংলাদেশের নাগরিক, মানুষের মতো বেঁচে থাকতে চাই।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা জাতীয় ও রাজনৈতিক, এবং স্বদিচ্ছা নিয়ে এগিয়ে আসলে এর সমাধান সম্ভব। অনুষ্ঠানে সাবেক যুগ্ম সচিব কৃষ্ণ চন্দ্র চাকমা ও উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব ইন্টু মনি তালুকদারও বক্তব্য রাখেন।
উৎসবের অন্যান্য আয়োজন
চার দিনব্যাপী এই উৎসবে আরও রয়েছে:
- ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন খেলাধুলা
- শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা
- পিঠা উৎসব
- ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
- মঞ্চ নাটক
আয়োজকদের মতে, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, বিহু, সাংক্রাই, চাংক্রান, পাতা উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠান আগামী ১২ এপ্রিল শেষ হবে। এরপর ১৭ এপ্রিল মারমা সংস্কৃতি সংস্থার সাংগ্রাই জলোৎসবের মধ্য দিয়ে পার্বত্য রাঙ্গামাটির বৈসাবি উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে।
উৎসবের তাৎপর্য
এই উৎসব জুন্ম জাতির অস্তিত্ব সংরক্ষণ এবং অপ-সংস্কৃতির প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে আয়োজন করা হয়েছে। এটি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরে, যা বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।



