ঢাকা শহরের এক অভিজাত এলাকায় বহু বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশাল সম্পত্তি। চারদিকে উঁচু দেয়াল, টিনের বাউন্ডারি, বিশাল গেট ও পুরনো গাছ। কিছু অংশে বহু বছর আগে ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হয়েছে। বলা হয়, নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়েই সেই উন্নয়ন কাজ শুরু হয়েছিল। এলাকাটির মূল্য সময়ের সঙ্গে আকাশ ছুঁয়েছে, জমির দাম বেড়েছে, সম্পত্তির পরিমাণ বেড়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে কমেছে পরিবারের শান্তি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং মানুষের মানবিকতা।
পরিবারের পটভূমি
এই পরিবারের কর্তা ছিলেন রাষ্ট্রের একজন অত্যন্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি সম্মান, প্রভাব ও বিপুল সম্পদ অর্জন করেছিলেন। সমাজে তার পরিচয় ছিল ক্ষমতাবান মানুষ হিসেবে। অসংখ্য মানুষ তাকে সম্মান করত। তিনি প্রশাসনিক ক্ষমতার কেন্দ্রের খুব কাছাকাছি অবস্থানে ছিলেন। জীবনের বহু বছর তিনি ব্যয় করেছেন রাষ্ট্র পরিচালনার অংশ হয়ে। স্বাভাবিকভাবেই পরিবার, সন্তান এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা ভেবে বিপুল সম্পদ গড়ে উঠেছে।
তার এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলে উচ্চশিক্ষিত, ইঞ্জিনিয়ার। মেয়ে উচ্চশিক্ষিত, ব্যারিস্টার। বাইরে থেকে দেখলে এটি ছিল সফল পরিবারের প্রতিচ্ছবি। সমাজ সাধারণত এমন পরিবারকে আদর্শ ভাবে। কারণ এখানে শিক্ষা আছে, অর্থ আছে, মর্যাদা আছে, পরিচিতি আছে।
সংকটের সূত্রপাত
কিন্তু মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় সংকট অনেক সময় বাইরে থেকে বোঝা যায় না। এই পরিবারে সংকট শুরু হয় তখন, যখন সম্পত্তি ভালোবাসার জায়গা দখল করে নেয়। একসময় ছেলের বিয়ে হয়। পরিবারের নতুন অধ্যায় শুরু হওয়ার কথা ছিল। বাবা-মা সাধারণত আশা করেন, ছেলে সংসার করবে, পরিবার বড় হবে, সুখ বাড়বে। কিন্তু অনেক পরিবারে বিয়ের পর সম্পর্কের ভেতরে নতুন হিসাব ঢুকে পড়ে। কে কত সম্পত্তির মালিক হবে, কে কী পাবে, কার নিয়ন্ত্রণ থাকবে—এসব প্রশ্ন ধীরে ধীরে সম্পর্ককে গ্রাস করতে শুরু করে। এই পরিবারেও তাই ঘটেছে।
বলা হয়, সম্পত্তির বড় অংশ ছিল মায়ের নামে। এই অবস্থায় উত্তরাধিকার, নিয়ন্ত্রণ এবং মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। সেই দ্বন্দ্ব ধীরে ধীরে মতবিরোধে রূপ নেয়। মতবিরোধ থেকে বিরোধ। বিরোধ থেকে সংঘর্ষ। সংঘর্ষ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, শিক্ষিত একজন ছেলে নিজের বাবার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।
শিক্ষা বনাম মানবিকতা
এখানে সমাজের জন্য বড় প্রশ্ন আছে- একজন মানুষ ইঞ্জিনিয়ার হতে পারে, ডিগ্রি অর্জন করতে পারে, বিদেশে পড়াশোনা করতে পারে, কিন্তু শিক্ষা কি মানুষকে মানবিক করে তুলেছে? কারণ একজন সন্তানের প্রথম শিক্ষা হলো—বাবা-মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা। যে সমাজে শিক্ষিত সন্তান বৃদ্ধ বাবাকে আঘাত করে, সেই সমাজকে নতুন করে নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে।
এই ঘটনার সবচেয়ে ভয়াবহ অংশ হলো, একজন বৃদ্ধ বাবাকে নিজের নিরাপত্তার জন্য দেহরক্ষী রাখতে হয়েছে। মাসে হাজার হাজার টাকা খরচ করে তিনজন শক্তিশালী মানুষ রাখা হয়েছে শুধু এজন্য, যেন নিজের সন্তান কাছে এলে তিনি নিরাপদ থাকেন।
একবার ভাবা দরকার, একজন বাবা সন্তানের হাত ধরে হাঁটতে শেখান, রাতে জেগে রাখেন, ভবিষ্যৎ গড়েন, শিক্ষা দেন, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় সন্তানদের জন্য ব্যয় করেন। সেই বাবা যদি বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের হাত থেকে বাঁচতে দেহরক্ষী রাখেন, তাহলে এটিকে কেবল পারিবারিক সমস্যা বলা যায় না। এটি সভ্যতার সংকট, এটি মানবিকতার পতন, এটি মূল্যবোধের ভাঙন, এটি সামাজিক ব্যর্থতা।
সম্পদের অভিশাপ
সম্পদের আরেকটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে। যখন সম্পদ কম থাকে, মানুষ ভাবে—আরও পেলে শান্তি আসবে। কিন্তু সম্পদ যখন অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়ে যায়, তখন নতুন ভয় জন্মায়। কে সম্পদ নেবে? কে নিয়ন্ত্রণ করবে? কে উত্তরাধিকার পাবে? কে বেশি পাবে? সেখান থেকেই শুরু হয় সন্দেহ, সন্দেহ থেকে অবিশ্বাস, অবিশ্বাস থেকে সম্পর্ক ভাঙন।
এই পরিবারে সেই ভাঙন এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, শেষ পর্যন্ত বাবা-মা ও মেয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। একজন বৃদ্ধ বাবা, একজন বৃদ্ধ মা, একজন মেয়ে, তার স্বামী। নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নেওয়া। প্রশ্ন হলো, কেন? কারণ নিরাপত্তা ছিল না। যে মানুষ একসময় রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ ছিলেন, তিনি নিজেই নিরাপদ ছিলেন না। এখানে জীবনের গভীর এক বিদ্রূপ লুকিয়ে আছে। ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, পদ চিরস্থায়ী নয়, সম্পদও নয়। শুধু মানুষের আচরণ ও সম্পর্কের স্মৃতি টিকে থাকে।
মামলা ও পরিণতি
এখন সেই বিশাল সম্পত্তি নিয়ে মামলা চলছে। একটি নয়, একাধিক মামলা, আদালত, আইনজীবী, কাগজপত্র, শুনানি। বছরের পর বছর সময়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় সম্পত্তি মামলা অনেক সময় একটি প্রজন্ম শেষ করে দেয়। মামলার শুরু যারা করে, শেষ দেখে তাদের সন্তানরা। এই পরিবারও সম্ভবত সেই দীর্ঘ বাস্তবতার অংশ। এখানে প্রশ্ন আসে—শেষ পর্যন্ত কে জিতবে? ছেলে, বাবা, মা, মেয়ে, আইনজীবী, নাকি আদালত? বাস্তব উত্তর হলো, সবাই কিছু না কিছু হারাবে। কারণ সম্পত্তির মামলায় রায় হতে পারে, কিন্তু ভাঙা সম্পর্কের রায় হয় না। আদালত জমির মালিক নির্ধারণ করতে পারে, কিন্তু বাবা ও সন্তানের ভালোবাসা ফিরিয়ে দিতে পারে না। বিচারক সম্পত্তির ভাগ নির্ধারণ করতে পারেন কিন্তু সম্মান ফিরিয়ে দিতে পারেন না।
সামাজিক মুখোশ
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সামাজিক মুখোশ। সমাজ বাইরে থেকে দেখে বড় পরিবার, সফল পরিবার, প্রভাবশালী পরিবার। কিন্তু ভেতরে কত কষ্ট, কত ভয়, কত অপমান—তা কেউ জানে না। অনেক অভিজাত বাড়ির উঁচু দেয়ালের আড়ালে অদৃশ্য যুদ্ধ চলে। সম্পত্তির যুদ্ধ, অহংকারের যুদ্ধ, উত্তরাধিকারের যুদ্ধ। কখনো সেই যুদ্ধ আদালতে যায়, কখনো সংবাদে আসে, আবার কখনো নীরবে মানুষকে শেষ করে দেয়।
শিক্ষার প্রকৃত অর্থ
আমরা প্রায়ই সন্তানদের ভালো শিক্ষা দিতে চাই। ভালো স্কুলে পড়াই, বিদেশে পাঠাই, ডিগ্রি দিই। কিন্তু একটি প্রশ্ন কম করি—আমরা কি মানবিকতা শেখাচ্ছি? আমরা কি শেখাচ্ছি যে, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের পাশে থাকা দায়িত্ব? আমরা কি শেখাচ্ছি, সম্পদ মানুষের চেয়ে বড় নয়? যদি শিক্ষা শুধু আয় বাড়ায়, কিন্তু মূল্যবোধ না বাড়ায়, তাহলে সেই শিক্ষা অসম্পূর্ণ।
শেষ কথা
জীবনের শেষ পর্যায়ে মানুষ সাধারণত তিনটি বিষয় খোঁজে—শান্তি, নিরাপত্তা, ভালোবাসা। অদ্ভুত হলেও সত্য, বিপুল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও অনেকে এই তিনটির একটিও পায় না। কারণ সম্পদ দিয়ে পাহারা কেনা যায়, ভালোবাসা কেনা যায় না। বাড়ি বানানো যায়, পরিবার বানানো যায় না। ক্ষমতা অর্জন করা যায়, শ্রদ্ধা আদায় করা যায় না।
এই ঘটনা আমাদের শেখায়, মানুষের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হওয়া উচিত সম্পর্কের মধ্যে। সন্তানের চরিত্র গঠনে, মূল্যবোধে, সহমর্মিতায়। নইলে হাজার কোটি টাকার সম্পদও শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্ন রেখে যায়—সব ছিল, তবু সুখ কোথায় গেল? শেষ পর্যন্ত মানুষ যখন একা বসে নিজের জীবন দেখে, তখন জমির পরিমাণ মনে থাকে না। ব্যাংক ব্যালেন্স মনে থাকে না। মনে থাকে—কে পাশে ছিল, কে আঘাত দিয়েছে, কাকে ভালোবেসেছিল, আর কার কাছ থেকে ভালোবাসা পায়নি।
ঢাকার সেই বিশাল সম্পত্তির চারপাশে হয়তো এখনো দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। টিনের বাউন্ডারি আছে, মামলা চলছে, দলিল আছে, কাগজ আছে, আইনজীবী আছে। কিন্তু হয়তো সবচেয়ে বড় অনুপস্থিতি হলো—একটি পরিবারের স্বাভাবিক হাসি। আর সেই হারিয়ে যাওয়া হাসির মূল্য কোনো সম্পত্তি দিয়ে পরিশোধ করা সম্ভব নয়। তাই সত্যটি কঠিন হলেও স্পষ্ট— সম্পদ মানুষকে স্বচ্ছলতা দিতে পারে, কিন্তু সুখ নয়। সম্পত্তি নিরাপত্তা দিতে পারে, কিন্তু ভালোবাসা নয়। আর যেখানে ভালোবাসা হারিয়ে যায়, সেখানে হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্যও শেষ পর্যন্ত এক ধরনের নিঃসঙ্গ কারাগারে পরিণত হয়।



