রান্নার আগে চাল ধোয়া: কী বলছেন বিজ্ঞানীরা?
রান্নার আগে চাল ধোয়া: বিজ্ঞানীদের মতামত

রান্নার আগে চাল ধুতে গেলে ফ্যাকাশে ও দুধের মতো সাদা পানি দেখা যায়। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের প্রধান খাবার ভাত। কিন্তু যাঁরা ভাত রান্না করেন, তাঁদের কি রান্নার আগে চাল ধুয়ে নেওয়া উচিত? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গবেষণা করেছেন বিজ্ঞানীরা।

চাল ধোয়া ও ভাতের গঠন

এই প্রশ্ন নিয়ে বিজ্ঞানীরা বেশ কিছু গবেষণা করেছেন। তাঁরা দেখতে চেয়েছেন, চাল ধোয়ার ফলে ভাতের গঠন ও পুষ্টিগুণে কী পরিবর্তন আসে। সেই সঙ্গে চাল ধুলে এর ভেতরে থাকা ধুলাবালু, আর্সেনিক কিংবা মাইক্রোপ্লাস্টিকের মতো ক্ষতিকর উপাদান কতটা দূর হয়, তা–ও তাঁরা পরীক্ষা করেছেন।

সাধারণত ধান চাষ করা হয় নিচু ও পানি জমা জমিতে। কারণ, ধানের বৃদ্ধির জন্য প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। ধান পেকে যাওয়ার পর তা কেটে মেশিনে ভাঙানো হয়। প্রথমে ধানের অখাদ্য খোসা ফেলে দিয়ে বাদামি চাল বা লাল চাল পাওয়া যায়। এই বাদামি চালকে আরও পলিশ করে তুষের স্তরটি ফেলে দিলে শেষ পর্যন্ত আমরা সাদা চাল পাই।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মেশিনে চাল ভাঙানোর এই প্রক্রিয়ায় চালের দানাগুলোর কিছুটা ক্ষতি হয়। ফলে চালের ওপরের অংশে একধরনের স্টার্চ বা শ্বেতসারের গুঁড়া স্তর তৈরি করে জমে থাকে। আলু, গম কিংবা চালে এই স্টার্চ প্রচুর পরিমাণে থাকে। চাল যখন পানিতে ধোয়া হয়, তখন মূলত ওপরের এই স্টার্চের গুঁড়া অংশ ধুয়ে পানির সঙ্গে বেরিয়ে আসে।

গবেষণার ফলাফল

২০১৭ সালের একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা প্রথমে ভেবেছিলেন, চাল ধুয়ে নিলে হয়তো রান্না করা ভাতের গঠন বদলে যেতে পারে। কারণ, চালের দানাগুলোকে একে ওপরের সঙ্গে জুড়ে রাখতে ওপরের এই স্টার্চ কাজ করে, যা ধোয়ার সময় অনেকটাই চলে যায়। তবে পরবর্তী সময়ে গবেষণায় ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিদ ইভাঞ্জেলিন ম্যানজিওরিস বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি জানান, চাল ধোয়ার কারণে রান্না করা ভাতের আঠালো ভাবে কোনো পরিবর্তন আসে না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

২০১৯ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, চালের ওপরের স্টার্চ ভাতের আঠালো ভাবের জন্য দায়ী নয়; বরং চালের দানার একদম ভেতরে অ্যামাইলোপেকটিন নামের অন্য একধরনের স্টার্চ থাকে, যা মূলত ভাতকে আঠালো করে। রান্না করার সময় এই ভেতরের স্টার্চটি বাইরে বেরিয়ে আসে। এটা ভাত কতটা আঠালো হবে, তা ঠিক করে।

বিজ্ঞানীদের পরীক্ষায় দেখা গেছে, রান্নার সময় চাল থেকে কতটুকু অ্যামাইলোপেকটিন বের হবে, তার সঙ্গে চাল ধোয়া বা না ধোয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। পুষ্টিবিদ ম্যানজিওরিস বলেন, ‘আসলে ভাতের আঠালো ভাব নির্ভর করে চালের জাতের ওপর।’ বিজ্ঞানীরা তিন ধরনের চাল নিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছেন, চাল যতই ধোয়া হোক না কেন, জাতের কারণেই ভাতের আঠালো ভাব আলাদা হয়। আঠালো ভাত খেতে হলে গ্লুটিনাস রাইস অর্থাৎ বিন্নি চালের মতো আঠালো চাল রান্না করতে হবে। কারণ, জেসমিন রাইস বা মাঝারি দানার চালগুলো রান্নার পর তুলনামূলকভাবে কম আঠালো হয়।

স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার দিক

আমাদের দেশের পটভূমিতে ভাবলে, সাধারণত স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার কথা চিন্তা করে রান্নার আগে চাল ধোয়া হয়। চালের ভেতরে থাকা ধুলাবালু, তুষ, ছোট পাথর কিংবা পোকা পরিষ্কার করার জন্যই মূলত আমাদের রান্নায় চাল ভালোভাবে বেছে ও ধুয়ে নেওয়া হয়। খোলাবাজারের চালের ক্ষেত্রে এই নিয়ম এখনো বেশ দরকারি।

তবে বর্তমান সময়ে আমাদের দেশেও প্যাকেটজাত চালের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। সুপারশপ বা নামী ব্র্যান্ডের যেসব চাল প্যাকেটে বিক্রি হয়, সেগুলোর ক্ষেত্রে ধুলাবালু বা পাথরের সমস্যা অনেকটাই কম থাকে। কারখানায় আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে এসব চাল ভালোভাবে পরিষ্কার করা, খোসা ছাড়ানো ও মাড়াই করা হয়। বিশেষ করে চাল শুকানোর প্রক্রিয়ায় আর্দ্রতা বা ভেজা ভাব একদম কমিয়ে ফেলা হয়; যাতে চালের মান ভালো থাকে। আর প্লাস্টিকের বস্তা বা প্যাকেটে দীর্ঘদিন রাখলেও কোনো পোকা বা জীবাণু জন্মাতে পারে না। ফলে প্যাকেট থেকে বের করা চাল অনেকটাই পরিষ্কার ও নিরাপদ থাকে। তবে আমাদের দেশের আবহাওয়া ও বাজার ব্যবস্থার কারণে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে রান্নার আগে চাল অন্তত একবার ধুয়ে নেওয়া ভালো।

ক্ষতিকর উপাদান দূরীকরণ

তবু চাল ধোয়ার পেছনে আরও কিছু কারণ রয়েছে। খাদ্যবিজ্ঞানী পারমাল দেও জানান, ধান চাষের সময় মাটি ও পানি থেকে প্রাকৃতিকভাবেই চালের মধ্যে কিছু অজৈব ক্ষতিকর উপাদান জমা হতে পারে। রান্নার আগে চাল ভালোভাবে ধুয়ে নিলে এর ওপরের স্তরে থাকা আর্সেনিক অনেকটাই দূর হয়ে যায়।

এ ছাড়া চাল ধুলে আরেকটি উপকার হয়, তা হলো মাইক্রোপ্লাস্টিক দূর হওয়া। ২০২১ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, রান্না করার আগে চাল ধুয়ে নিলে প্লাস্টিকের সূক্ষ্ম কণা বা দূষণের পরিমাণ প্রায় ২০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে যায়। যদিও আমাদের শরীরে এই প্লাস্টিক কণার ক্ষতিকর প্রভাব ঠিক কতখানি, তা নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।

পুষ্টির ক্ষতি

অবশ্য চাল ধোয়ার একটি ছোট অসুবিধাও রয়েছে। ম্যানজিওরিস উল্লেখ করেন, চাল ধোয়ার সময় পানির সঙ্গে তামা, লোহা, দস্তা ও ভ্যানাডিয়ামের মতো কিছু দরকারি খনিজ উপাদান ধুয়ে যায়। তবে আমাদের প্রতিদিনের পুষ্টির চাহিদার তুলনায় চাল থেকে এই উপাদানগুলো খুব সামান্য পরিমাণে পাওয়া যায়। তাই চাল ধোয়ার কারণে শরীরে পুষ্টির তেমন কোনো ঘাটতি হয় না।

পরামর্শ

সব মিলিয়ে খাদ্যবিজ্ঞানীদের পরামর্শ হলো, বেশির ভাগ মানুষের জন্য রান্না করার আগে চাল পরিষ্কার পানিতে মাত্র একবার বা দুবার হালকাভাবে ধুয়ে নেওয়াই যথেষ্ট।

সূত্র: লাইভ সায়েন্স