সময় ব্যবস্থাপনা: চাকরিজীবীদের সাফল্যের মূলমন্ত্র
সময় ব্যবস্থাপনা: চাকরিজীবীদের সাফল্যের মূলমন্ত্র

পবিত্র ঈদুল আজহার বাড়তি খরচে চাকরিজীবী বুবনের পকেট জুনের মাঝামাঝি আসতেই প্রায় ফাঁকা। মাসের বাকি দিন কাটানোর চিন্তায় জরুরি টাকার খোঁজে সে ঢুকেছিল কারওয়ান বাজারের একটি এটিএম বুথে। সেখানে গিয়ে বুবন পড়ল ধৈর্যের চরম পরীক্ষায়। ভেতরের ভদ্রলোক কার্ড ঢুকিয়ে এমনভাবে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেন মস্ত বড় কোনো জটিল বৈজ্ঞানিক হিসাব মেলাচ্ছেন। পাসওয়ার্ড ভুল করা আর ধীরগতিতে ব্যালান্স চেক করতেই তিনি পার করে দিলেন বেশ কয়েক মিনিট। লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা বুবনের (ছদ্মনাম) মতো আরও ১০ জন এর খেসারত দিলেন। অনেকের মিস হলে অফিসের পাঞ্চ টাইমিং।

সময় ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব

বুবনের মনে হলো, এই যে সামান্য একটি বুথ ব্যবহারের ঠিকঠাক না জানা... বেসরকারি চাকরিজীবীদের ব্যর্থতার শুরুটা ঠিক এখান থেকেই হয়। বুবনের অফিস অঞ্চল কারওয়ান বাজারের ভেতরের চিত্রটিও ঠিক একই রকম বৈপরীত্যে ভরা। একদিকে কাঁচাবাজারের কাদা আর কুলিদের চিৎকার, অন্যদিকে বড় বড় করপোরেট অফিসের ঠান্ডা এসি। প্রতিদিনের এই নিত্যনতুন ঝামেলা ও যানজট সামলেই বুবনের মতো হাজারো চাকরিজীবী কারওয়ান বাজারে অফিস সামলান।

বুবনের দেখা বেসরকারি চাকরিজীবীদের একটা বড় অংশের ব্যর্থতার কারণ একটাই—নিজের আসল কাজটা ঠিকঠাক ‘টাইম বিয়িং’ ও টাইমিংয়ের পার্থক্য না বোঝা। কোন কাজটা ঠিক কতক্ষণ ধরে করা উচিত, সেই হিসাব অধিকাংশ কর্মীর মাথায় থাকে না।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সফল চাকরিজীবীদের উদাহরণ

বুবনের অফিস পাড়াতেই লুকিয়ে আছেন তিন ওস্তাদ চাকরিজীবী। মোহাম্মদ রফিক, নরেন দা কিংবা মিস্টার লিপ্টন (তিনটি নামই ছদ্ম)। তিন মূর্তি নিজেদের প্রাত্যহিক যাপনে টাইমিং তত্ত্বের সফল চর্চা করে বুবনের চোখ খুলে দিচ্ছেন।

রফিক সাহেবের সময় ব্যবস্থাপনা

বুবনের চেনা ষাটোর্ধ্ব রফিক সাহেব একটানা ১৪ বছর ধরে এক প্রতিষ্ঠানে প্রধান হিসাব কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি প্রতিটি কাজ নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করেন এবং কাজের চাপ সামাল দিতে সক্ষম হন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নরেন দার সময় ব্যবস্থাপনার কৌশল

অন্যদিকে প্রতিটি বাক্যে ‘টাইম বিয়িং’ ব্যবহার করা নরেন দা মনে করেন, একজন মানুষ কতক্ষণ ঘুমাবে, কতক্ষণ খাবে আর কতক্ষণ কাজ করবে, তার নির্দিষ্ট পরিমাপ থাকা দরকার। তিনি নিজে অফিসের ডেস্কে নানা পদের শুকনা খাবার রাখেন, কাজের ফাঁকে নিজে অল্প খান ও অন্যদের খাওয়ান। দুপুরের খাবারের পর ঠিক ১০ মিনিটের একটা পরিমিত বিশ্রাম নেন তিনি। এরপর ডেস্কেই চলে সহকর্মীদের সঙ্গে কাজের ফাঁকে আড্ডা। প্রতি ৪৫ মিনিট কাজ শেষে পুরো ফ্লোর এক রাউন্ড করে হাঁটেন। ফ্লোরের সহকর্মীদের সঙ্গে দুষ্ট–মিষ্টি আড্ডা দেন। তাঁর মতে, চটপটে সাত মিনিটের আড্ডা, আর পাঁচ মিনিটের গ্রিন টি ব্রেক তাঁকে অফিসের পুরো সময় চনমনে রাখে, যা কাজের ক্লান্তি দূর করে শক্তি দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়। সময়ের কাজ সময়ে শেষ করে তিনি বিকেলে নজরুলসংগীতের একটি টিউশনি সেরে ঠিক রাত আটটার পরে বাড়ি ফেরেন।

মিস্টার লিপ্টনের সময়ের নিখুঁত হিসাব

বুবনের দেখা সময়ের নিখুঁত হিসাবের আরও এক অনন্য উদাহরণ মিস্টার লিপ্টন। তিনি করপোরেট পাড়ার এক উচ্চপদস্থ সৎ কর্মকর্তা। শতকোটি টাকার বাজেট ও বড় বড় ফাইলের ভিড়েও তাঁর সততা ও কাজের গতি প্রশ্নাতীত। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা—এই পুরো সময়টার প্রতিটি মিনিট তাঁর ছক কাটা থাকে। ঠিক বেলা দেড়টায় হালকা মধ্যাহ্নভোজ সেরে ঘড়ি ধরে ১৫ মিনিট চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নেন তিনি। এরপর সাততলা অফিসের প্রতিটি ফ্লোরে ঢুঁ মারেন তিনি। লিপ্টনের প্রতিদিনের কাজের সংখ্যা থাকে নির্দিষ্ট। একটি করে কাজ সেরে ঢুঁ মারেন একেকটি ফ্লোরে। নির্দিষ্ট সময় নির্দিষ্ট কাজটি শেষ করেন। কাজের চমৎকার ভারসাম্যের কারণেই অফিসের সবচেয়ে কঠিন ও জটিল ডিলগুলো তিনি হাসিমুখে নামিয়ে ফেলেন। ঠিক বিকেল পাঁচটায় অফিস শেষে সোজা চলে যান ক্লাবে। সেখানে নিয়ম করে টানা এক ঘণ্টা টেনিস খেলেন। নিজের স্বাস্থ্য, বিশ্রাম ও দায়িত্বকে এভাবে ঘড়ির কাঁটায় বেঁধে ফেলা লিপ্টন সাহেব প্রমাণ করেছেন, সততা ও টাইমিং এক সুতায় গাঁথা।

সময় ব্যবস্থাপনার শিক্ষা

কারওয়ান বাজারের কাদা ও এসির ঠান্ডার মধ্যে রফিক, নরেন কিংবা লিপ্টন সাহেবরা আসলে একজন করে সজীব মানুষ। তাঁরা ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে যুদ্ধ করেন না; বরং সময়কে নিজের মুঠোয় পুরে নেন। বুবনের ডায়েরির এই অভিজ্ঞতা শেষমেশ একটি বড় সত্যকে সামনে আনে। পকেটের শূন্যতা সাময়িক। কিন্তু সময়ের শূন্যতা স্থায়ী ব্যর্থতা ডেকে আনে। বেসরকারি চাকরির জাঁতাকল থেকে বাঁচতে হবে। পৌঁছাতে হবে ক্যারিয়ারের চূড়ায়। তাই আজই শুরু হোক চর্চা। কাজের ফাঁকে থাক হালকা খাবার। চলুক, চটপটে আড্ডা ও পরিমিত বিশ্রাম। আর চাই সময়ের নিখুঁত হিসাব। সঠিক টাইমিং ছাড়া জীবনের কোনো যুদ্ধেই জেতা সম্ভব নয়।