ছবি: এআই/বন্ধুসভা
নীতু, কোনো সম্বোধন না করায় কিছু মনে করিস না। কেমন আছিস, কোথায় থাকিস, তা জানতে চাইনি বলে ক্ষোভ চেপে না রেখে ভাবিস, আমি কখনোই তোকে বিব্রত করতে চাই না। আমি জানি, তোর মন যখনই জাগতিক জ্যোৎস্নায় স্নান করত, তখন আমার কানে ফিসফিসিয়ে জানতে চাস, কিরে, জ্যোৎস্নায় ভিজবি নাকি? আমি জবাব দেওয়ার চেয়ে আগে প্রয়োজন বোধ করি, জ্যোৎস্নাস্নান আজও তোর মন ভেজিয়ে রাখুক—দেহ না ভেজালেও।
নীতু, অমাবস্যা তিথিও তোর নখদর্পণে
এতেও তুই আনন্দ পাস। অন্ধকারও তোর ভালো লাগা থেকে রেহাই পায়নি। আমি তোর কাছ থেকে বিশেষ এই দুটি দিনে পালিয়ে বেড়াতাম তখন—এখন আমার পালাতে হয় না। এত দ্রুত কেউ কাউকে কি মুক্তি দিয়ে দেয়? আমার জানালার ফাঁক দিয়ে যখন জ্যোৎস্না গলে গলে পড়ে, পর্দা টেনে দিই। আমি অন্ধকার ঘরে ঘুমোতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না। কেন যেন কোনো কিছুই ইচ্ছা করে না।
কবিতার কথা
তোর মনে আছে, আমাকে বলেছিলি একটা কবিতা লিখে দিতে। আমি বলেওছিলাম তোকে—আমি অন্তত নির্দ্বিধায় তোর ইচ্ছাধীন আর সব করতে পারব, কিন্তু কবিতা! ঠাস করেই গালে চড় বসিয়ে দিলি। আমার মোটেই খারাপ লাগেনি, বরং আশ্চর্যান্বিত হয়েছিলাম তোর এই কাণ্ডে। মনে পড়ে, আমার তাকিয়ে থাকা দেখে খিলখিলিয়ে হেসেছিলি? আমি সেদিনকার সময়টা কেন ভুলিনি জানিস? জানিস না। কারণ, জানার আগেই আমার জানানোর ক্ষমতার বাইরে চলে গিয়েছিলি।
ও, কবিতার কথা! আদায় করেছিলি, আমি সারা রাত জেগে লিখেছিলাম, সকালে তোকে দিলাম, বিকেলে বলেছিলি—এসব ছাইপাঁশ বুঝি কবিতা নাকি! আগে জানলে লিখতে বলতিস না। তখনই বোকা বনে গেলাম। কিছু বলার জন্যই বলেছিলাম (আসলে লজ্জা ঢাকার জন্য), তোকে তো আগেই বলেছিলাম, আমি ওসব পারি না। তুই কাগজ মুচড়ে হাতে রেখে দিয়ে বলেছিলি, বেরোব, কাজ আছে। চাইলে যেতে পারিস। যাবি? সাবধান, কোনো প্রশ্ন নয়। হ্যাঁ কিংবা না।
আরও পড়ুনডাকলেই আসব৩০ জানুয়ারি ২০২৬
আমি যাইনি। তুই জানতেও চাসনি, আর আমিও জানাইনি। হঠাৎ করেই আমার কাছে এসে বললি, ‘বুঝলি হাঁদারাম, আজকাল পত্রিকার সম্পাদকেরাও কবিতা সম্পর্কে কিছুই জানে না।’ আমি প্রশ্ন করিনি। তুই যখন বলতেই থাকতি, আমার শুনতে ভালো লাগত। বলেছিলি, যদি সে কবিতা বুঝতই, তোর লেখা এই কবিতা নামক ছাইপাঁশ ছাপত না। নে, আজকে তোর কবিতা ছেপেছে, আর এ জন্য আমাকে একটা কবিতার বই কিনে দিতে হবে। তোর কাছে টাকা না থাকলে আমার কাছ থেকে ধার নে আর তাড়াতাড়ি কর, বেরোব।
সেই কবিতার বই
সেই দিনটায় যে কবিতার বইটা কিনেছিলি, তা আমাকেই দিয়ে বলেছিলি, তোর মতো পশুশ্রেণির কোনো মানুষ আমি আজও দেখিনি। এই শ্রেণিবদ্ধ করাতেও ভুল হবে। তুই আমাকে এই আট বছরে কতটা চিনেছিস? কখনো বলেছিস, ‘নীতু, তোর হাতটা ধরি?’ আমার চোখে চোখ রেখে বলতে পারিস, তোর কখনোই ইচ্ছা করেনি?
আমার চোখে ক্রমাগত জল পড়ছিল। তুই যখনই আমার কাঁধে হাত রেখে ভেজা গলায় বলেছিলি, ‘মন খারাপ করছিস কেন, হাঁদারাম? আমিও তো কখনোই বলিনি। কিন্তু আমি এমন মেয়ে নই যে তোর ইচ্ছার আশায় বসে থাকব। শোন, আমি যাচ্ছি; কখনো আর দেখা না হলে আমাকে খুঁজবি না একদম। যদি জানতে পারি যে আমার খোঁজ করেছিস, এমন লাত্থি খাবি, জীবনেও ভুলবি না।’
আজ তোর কথা মনে হলো
নীতু, আজ কোনো কারণে তোর কথা মনে হলো, আর এই দীর্ঘ পত্র লিখলাম। তুই যে চিঠিটা কবিতার বইটায়ে রেখেছিলি, সেটা অনেক দিন পড়ে ছিল। অন্য কোনো ক্ষোভ নয়, তুই যাচ্ছি বলেই চলে যাচ্ছিলি যখন, একবারের জন্যও পেছনে তাকাসনি। যাক, নীতু, আমি চিঠিটা পড়েছিলাম, মুখস্থও হয়ে আছে; কিন্তু তুই কি আমার লেখাটা পড়েছিলি? নাকি তোকে সময় দেয়নি তোর লিউকেমিয়া। বড্ড বাজে মেয়ে তুই। খুব বাজে।
ইতিটিতি লিখতে পারব না। নিচে নাম লিখে দিচ্ছি, যে নামে চিনতিস।
‘হাঁদারাম’
বন্ধু, কুমিল্লা বন্ধুসভাবন্ধুদের লেখা থেকে আরও পড়ুনচিঠিপত্রবন্ধুসভা চিঠিভালোবাসা



