মাছটার বৈজ্ঞানিক নাম ‘বোটিয়া দারিও’। মাছের নাম রানি। শুনতেই একটু অবাক লাগে। মাছের নাম রানি কেমন করে হয়? তা-ও আবার বাংলায় নয়, ইংরেজিতেও ‘কুইন লোচ’! এই মাছের এমন নামের কারণ কী? কেনই-বা এর এত রাজকীয় খেতাব?
মাছটার বৈজ্ঞানিক নাম ও চেহারা
মাছটার বৈজ্ঞানিক নাম ‘বোটিয়া দারিও’। ছোট্ট একটা মাছ। বড়জোর ছয় ইঞ্চি হবে। কিন্তু দেখতে খুব সুন্দর। গায়ের রং সোনালি-হলুদ। তার ওপর কালো ডোরাকাটা দাগ। সাতটা থেকে নয়টা পর্যন্ত এই কালো পট্টি। পেটের দিকটা একটু ফ্যাকাশে, পিঠের দিকে রংটা গাঢ়। রোদ পড়লে পানির ভেতরে চকচক করে। পাশ থেকে দেখলে মনে হয়, কেউ সোনার ওপর কালো তুলি টেনেছে। এই চেহারা থেকেই এর নাম হয়েছে রানি মাছ।
আবিষ্কারের ইতিহাস
এই মাছ প্রথম আবিষ্কৃত হয় ১৮২২ সালে। ব্রিটিশ প্রকৃতিবিদ ফ্রান্সিস বুকানন-হ্যামিলটন গঙ্গা নদীতে এই মাছ প্রথম আবিষ্কার করেন। তিনি এর নাম দিলেন কবিটিস দারিও (Cobitis dario)। এই ‘dario’ শব্দটা এসেছে বাংলা ‘দাড়ি’ থেকে। উত্তর-পূর্ব ভারতের স্থানীয় মানুষ সেখানকার নদীর এই মাছকে দাড়ি মাছ বলত। হ্যামিলটন সেটাই লাতিন হরফে লিখলেন। বছরের পর বছর গেছে। মাছটার পরিবার বদলেছে, বৈজ্ঞানিক নাম একটু পাল্টেছে। কিন্তু dario থেকে গেছে।
বোটিয়া নামের উৎপত্তি
‘বোটিয়া’ নামটার পেছনেও একটা গল্প আছে। ১৮৩১ সালে ব্রিটিশ প্রাণিবিজ্ঞানী জন এডওয়ার্ড গ্রে এই গোত্রের মাছগুলোকে বোটিয়া নাম দেন। সম্ভবত অসমীয়া শব্দ বাল্লি-পোটিয়া থেকে এসেছে এই নাম। সেটাও একটা স্থানীয় মাছের ডাকনাম ছিল। গ্রে নিজে এ অঞ্চলে এসেছিলেন কি না, তা জানা যায় না। তবে স্থানীয় নামগুলো তাঁর কাছে পৌঁছেছিল, সেটা বোঝা যায়।
কুইন লোচ নামের উৎপত্তি
কুইন লোচ নামটা অবশ্য বিজ্ঞানীদের দেওয়া নয়। ইউরোপ-আমেরিকায় যখন এই মাছ পৌঁছাল, অ্যাকোয়ারিয়ামের শখ থাকা মানুষগুলো মুগ্ধ হয়ে গেল। ট্যাংকের ভেতরে এই মাছ চলে একটা আলাদা ভঙ্গিতে। অন্য মাছকে বিশেষ পাত্তা দেয় না। দলের মধ্যে নিজের একটা জায়গা তৈরি করে নেয়। এই চালচলন দেখেই কেউ একজন নাম দিয়ে ফেলল কুইন লোচ। বাংলায় সেটাই হলো ‘রানি মাছ’।
বাসস্থান ও আচরণ
মাছটা থাকে পাহাড়ি ছড়া আর স্রোতের নদীতে। বাংলাদেশের সিলেট, রাজশাহী, রংপুরের অনেক জায়গায় পাওয়া যায়। ব্রহ্মপুত্র আর যমুনার শাখা নদীতেও আছে। আছে ভুটান আর ভারতের কিছু অংশেও। এই মাছ কখনো একা থাকে না। পাঁচ-ছয়টা রানি মাছ একসঙ্গে থাকলে সবচেয়ে স্বাভাবিক থাকে। দলের ভেতরে একটা নিজস্ব শ্রেণি আছে—কে আগে যাবে, কে পেছনে। ছোট মাছগুলো মাঝেমধ্যে বড়টার পেছনে পেছনে চলে, হুবহু একই ভঙ্গিতে। গবেষকেরা এই আচরণকে বলেন ‘শ্যাডোয়িং’। রানি মাছ কেন এমন করে, সেটা এখনো পুরোপুরি বোঝা যায়নি। খাবার হিসেবে এরা পছন্দ করে শামুক, পোকা, ছোট কীটপতঙ্গ। আর গলার ভেতরের দাঁত দিয়ে ক্লিক ক্লিক শব্দ করে। এটা এদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের উপায়।
সংরক্ষণ অবস্থা
সারা পৃথিবীর হিসাবে মাছটা এখনো বিপদমুক্ত। তবে এই মাছ এখন চাপে আছে। নদীতে দূষণ বাড়ছে। স্রোত কমছে। অনেক জায়গায় বেশি পরিমাণে এদের ধরা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংস্থা আইইউসিএন বলছে, সারা পৃথিবীর হিসাবে মাছটা এখনো বিপদমুক্ত। কিন্তু বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে কমে যাচ্ছে। যমুনার পাড়ের জেলেরা আগে জাল ফেললে অহরহ রানি মাছ উঠে আসত জালে। এখন সারা দিন জাল ফেলেও অনেক সময় দেখা পাওয়া যায় না। নদী আছে, জেলেও আছে, কিন্তু মাছ নেই।
নামের ঐতিহাসিক ঐক্য
এ মাছকে বাংলার নদীর ধারের মানুষ ডাকত ‘দাড়ি মাছ’ বলে। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী সেটা লিখলেন লাতিনে। ইউরোপে গিয়ে মাছটা হলো কুইন লোচ। আর এখানে রয়ে গেল রানি মাছ নামটা। এই নামের ব্যাপারে কিন্তু কেউই কারও সঙ্গে কথা বলেনি। তবু নামটা মিলে গেছে। তথ্যসূত্র: মেইডেনহেড অ্যাকুয়াটিকস, সার্চ ফিশবে।



