প্রতি শীতকালে চীনের উত্তরাঞ্চলীয় শহর হারবিনে হিমায়িত নদী থেকে কাটা হাজার হাজার বরফের খণ্ড দিয়ে তৈরি করা হয় দুর্গ, প্রাসাদ ও নজরকাড়া ভাস্কর্য। বসন্তের আগমনের সাথে সাথে এই পুরো শহরটি গলে বিলীন হয়ে যায়। যারা জীবনে ভিন্নধর্মী ভ্রমণের অভিজ্ঞতা খুঁজছেন, তাদের জন্য এই বরফ নগরী শীর্ষস্থানীয় গন্তব্য।
হারবিন আইস অ্যান্ড স্নো ওয়ার্ল্ড: বিশ্বের বৃহত্তম বরফ থিম পার্ক
চীনের অন্যতম শীতলতম অঞ্চল হেইলুংচিয়াং প্রদেশের রাজধানী হারবিন। প্রতি শীতে এখানকার তীব্র ঠান্ডা আবহাওয়া শিল্পী ও প্রকৌশলীদের জন্য বরফ ও তুষার দিয়ে আস্ত একটি শহর গড়ার নিখুঁত পরিবেশ তৈরি করে। এর ফলেই গড়ে ওঠে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম বরফ ও তুষারভিত্তিক থিম পার্ক ‘হারবিন আইস অ্যান্ড স্নো ওয়ার্ল্ড’। এর অসাধারণ দিক হলো, এখানে দৃশ্যমান বিশাল সব বরফের দুর্গ, দৈত্যাকার স্লাইড, টানেল কিংবা বিশ্বের বিখ্যাত সব স্মৃতিস্তম্ভের বরফ প্রতিকৃতি সবই সাময়িক। তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করলেই এই হিমায়িত শহরটি ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায়, যা পরবর্তী শীতে আবার নতুন করে তৈরি করা হয়।
সূর্যাস্তের পর জাদুকরী আলোকসজ্জা
দিনের বেলা হারবিনের রূপ চমৎকার হলেও আসল জাদু শুরু হয় সূর্যাস্তের পর। অন্ধকার নামতেই হাজার হাজার রঙিন এলইডি বাতি স্বচ্ছ বরফের কাঠামোগুলোকে নীল, গোলাপি, সবুজ ও বেগুনি রঙে আলোকিত করে তোলে। এই আলো ঝলমলে রাস্তা দিয়ে হাঁটার অনুভূতি যেন কোনো কাল্পনিক সিনেমার দৃশ্যে রূপ নেয়। আর এই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করতেই প্রতি বছর বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আলোকচিত্রী ও পর্যটকেরা এখানে ছুটে আসেন।
বরফ নগরীতে পর্যটকদের জন্য অভিজ্ঞতা
ইনস্টাগ্রামে ছবি দেওয়ার মতো চমৎকার দৃশ্যের পাশাপাশি হারবিনে পর্যটকদের জন্য রয়েছে দারুণ সব অভিজ্ঞতা। দর্শনার্থীরা বিশাল এই বরফ নগরী ঘুরে দেখার পাশাপাশি ‘সান আইল্যান্ড সিনিক এরিয়া’র বিশাল তুষার ভাস্কর্যগুলো উপভোগ করতে পারেন। এছাড়া বরফের স্লাইড ও স্কেটিংয়ের মতো বিভিন্ন অ্যাক্টিভিটিতে মেতে ওঠার সুযোগ তো রয়েছেই। কনকনে ঠান্ডায় দিন কাটানোর পর শরীর গরম করতে এখানকার ঐতিহ্যবাহী ও সুস্বাদু ‘দংবেই’ খাবারের স্বাদ নেন পর্যটকেরা।
চীনা ও রুশ সংস্কৃতির মিশ্রণ
চৈনিক ও রুশ সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিশ্রণ এই শহরটিকে কেবল একটি বরফ উৎসবের চেয়েও বেশি সাংস্কৃতিক মাত্রা দিয়েছে। উনিশ শতকের শেষের দিকে এবং বিশ শতকের শুরুতে চাইনিজ ইস্টার্ন রেলওয়ে নির্মাণের পর এই শহরের দ্রুত বিকাশ ঘটে, যা বিশেষ করে রাশিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশের মানুষকে এখানে বসতি গড়তে আকর্ষণ করেছিল। সেই বহুমাত্রিক অতীতের ছাপ আজও এখানকার স্থাপত্য, গির্জা ও খাবারে স্পষ্ট।
ভ্রমণের সেরা সময় ও প্রস্তুতি
সাধারণত আবহাওয়ার ওপর ভিত্তি করে ডিসেম্বরের শেষ বা জানুয়ারির শুরুতে এই ‘হারবিন ইন্টারন্যাশনাল আইস অ্যান্ড স্নো ফেস্টিভ্যাল’ শুরু হয়ে ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত চলে। তবে জানুয়ারি মাসকে এখানে ভ্রমণের জন্য সেরা সময় মনে করা হয়, কারণ এ সময় ভাস্কর্যগুলোর নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হয় এবং তীব্র শীতের কারণে সেগুলো তার জমকালো রূপ ধরে রাখে। যেহেতু এই সময়ে হারবিনের তাপমাত্রা প্রায়ই মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যায়, তাই থার্মাল ইনার, বিশেষ বুট জুতো, গ্লাভস ও শীতের গরম কাপড় সাথে রাখা আবশ্যক। হাড়কাঁপানো ঠান্ডা উপেক্ষা করে প্রতি বছর লাখো দর্শনার্থীকে আকর্ষণ করা এই ক্ষণস্থায়ী ও চোখধাঁধানো নগরীটি পর্যটকদের মনে করিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর সবচেয়ে অবিস্মরণীয় গন্তব্যগুলোর কয়েকটি আসলে খুবই ক্ষণস্থায়ী হয়।
সূত্র: এনডিটিভি



