ঢাকার ব্যস্ততা পেরিয়ে কয়েক ঘণ্টার ফ্লাইট। তারপর পৌঁছালাম এমন এক দেশে, যেখানে সময় চলে সেকেন্ডের হিসাব মেনে। নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের এক্সপ্রেস ট্রেনের দরজা বন্ধ হলো ঠিক নির্ধারিত সময়ে ঘড়ির কাঁটা শূন্য ছুঁতেই, নিখুঁত, নির্ভুল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম টোকিও, পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যস্ত শহরগুলোর একটিতে। চারপাশে শুধু ব্যস্ত মানুষের পিপীলিকার মতো হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য। কারও সঙ্গে কোনো কথা নেই, কথা নেই মুঠোফোনেও। টুকটাক কথাগুলো তাঁরা টেক্সট দিয়েই সেরে নিচ্ছেন। রাস্তায় গাড়িগুলো নিঃশব্দে চলেছে সিগন্যাল লাইট মেনে, সময়ে সময়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। উঁচু গ্লাস বিল্ডিংগুলোর গ্লাসে মাঝেমধ্যে দেখা যাচ্ছে পৃথিবীর ব্যস্ততম মেট্রোগুলোর ছুটে যাওয়ার প্রতিবিম্ব। রাস্তার পাশ দিয়ে চলা সাইকেলটারও ভুল করার উপায় নেই। ভুল হলেই গুনতে হতে পারে হাজার ইয়েনের মামলা।
যেখানে হারিয়ে যাওয়ার উপায় নেই
কথায় আছে, ‘ইউ ক্যান নট গেট লস্ট ইন জাপান’। রাস্তা, বাস আর মেট্রো স্টেশনের পানির মতো সহজ নির্দেশিকা আর ফোনের ম্যাপই হয়ে ওঠে এখানে নীরব পথপ্রদর্শক। নির্ধারিত হোটেল খুঁজে বের করতে আমাদেরও সময় লাগল না। হোটেলে ব্যাগটা রেখেই বের হলাম নতুন একটা শহর দেখতে। পাঁচ মিনিটেই বুঝে গেলাম, জাপান ভ্রমণ মানে শুধু ঘোরা নয়, এটা একধরনের ‘পায়ে হাঁটার চ্যালেঞ্জ’!
শহর দুই স্তরে
এখানে শহর একটা নয়, দুটি! একটি মাটির ওপর, আরেকটি মাটির নিচে। মাটির নিচের মেট্রো স্টেশনগুলো এমাথা–ওমাথা এত বড় যে আপনাকে স্টেশনে ঢুকে কোনো মেট্রো ধরতেও ১৫ মিনিট বা তারও বেশি হাঁটতে হতে পারে। চলার পথে স্টেশনগুলোকে শপিং মল ভেবেও ভুল হতে পারে। বুঝে গেলাম, কেন শহরে এখনো কোনো স্থূলকায় কাউকে দেখছি না। মেট্রো থেকে নেমে গন্তব্য টোকিওর ব্যস্ততার মধ্যেই এক টুকরা শান্তি ‘উইনো পার্ক’। টোকিওতে সেই স্বপ্নের বসন্ত দেখার সেরা জায়গা। পৌঁছাতেই হালকা ঠান্ডা হাওয়ায় সাকুরার ঘ্রাণ নাকে এল। মাটিতে ঝরে পড়া পাপড়ি, পাশে রঙিন টিউলিপ—পুরো জায়গাটা যেন এক নীরব রঙের উৎসব।
অচেনাও চেনা
পার্কে শিশুরা খেলছে, বুড়োরা নাচছে, গল্প করছে, শুয়ে আকাশ দেখছে, কোথাও কোনো তাড়া নেই। সেখান থেকে একটু এগোলেই যেন সময় বদলে যায়। আসাকুসার সরু গলি, ছোট দোকান, আর পুরোনো টোকিওর আবহ। সেই পথের শেষেই দাঁড়িয়ে সানসো-জি টেম্পলের লাল দ্বার, ঝুলছে লন্ঠন। টেম্পলের ধূপের ঘ্রাণ আর নিঃশব্দ প্রার্থনায় ভরা এক অন্য জগৎ। আমরা ঘুরে বেড়াতে লাগলাম শহরের অলিগলি। সিনেমার দৃশ্যের মতো অচেনা গলিগুলোয় প্রথম পা ফেলেও মনে হচ্ছিল এই গলিতে আমার অনেক কালের পথচলা। দিনের সূর্য ডুবে গেলে টোকিও শহরের রঙিন বিলবোর্ডের এলইডি বাতিগুলো যেন সূর্যের চেয়েও বেশি দ্যুতি ছড়ায়!
শিবুইয়া ক্রসিংয়ের ছন্দ
এক এক করে চোখের সামনে দেখলাম মেঘ ফুঁড়ে ওপরে উঠে যাওয়া টোকিওর দুই আইকন—টোকিও স্কাইট্রি আর টোকিও টাওয়ার। অলিগলি ঘুরে এসে দাঁড়ালাম আরেক ‘মাস্ট ভিজিট’ স্পট—শিবুইয়া ক্রসিংয়ে। এটা শুধু একটা রাস্তা পার হওয়ার জায়গা নয়, এটা যেন টোকিওর ছন্দ। সিগন্যাল বদলাতেই চার-পাঁচ দিক থেকে শত শত মানুষ একসঙ্গে রাস্তা পেরোয়। একটা মুহূর্তের জন্য মনে হয়, পুরো শহরটাই যেন হাঁটতে শুরু করে।
রঙের মেলা চিবায়
জাপান ভ্রমণের মধ্যেই আমরা জানলাম সেখানকার ‘চিবা’ নামের এক উপকূলীয় এলাকায় বসেছে রঙের মেলা। আকিবোনোয়িমা অ্যাগ্রিকালচারাল পার্কের গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই মনে হলো, যেন কোনো পোস্টকার্ডের ভেতর হাঁটছি। ছোটবেলায় স্টুডিওতে ছবি তুলতে গেলে স্টুডিওর দেওয়ালে যে ছবি লাগানো থাকত, এটা তো সেই জায়গা! দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ডাচ স্টাইলের উইন্ডমিল পুরো দৃশ্যটাকে একটা গল্পের কাঠামো দিয়েছে। যেন এই মাঠের সব রং ওটার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাতাস যখন হালকা ছুঁয়ে যায়, টিউলিপ ফুলগুলো একটু নড়ে ওঠে, আর তখন মনে হয়, ওরা কথা বলছে, নিঃশব্দে। তবু কী স্পষ্ট!
প্রকৃতির শিশুরা
জাপানে ঘুরতে গিয়ে একটা জিনিস বারবার চোখে পড়ছিল, ছোট ছোট শিশুরা, মাথায় লাল, হলুদ, নীল রঙের ক্যাপ, আর তাদের সঙ্গে শিক্ষকেরা। কখনো তারা এ রকম ফুলবাগানে সারি বেঁধে, আবার কখনো পাহাড়ের পথে হাঁটছে, আবার কোথাও পার্কে খেলায় মেতে উঠছে। প্রথমে মনে হয়েছিল এটা শুধু ঘোরাঘুরি। পরে বুঝলাম, এটা আদতে ওদের শেখার একটা অংশ। ক্লাসরুমের বাইরে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে, নিজেরা দেখেশুনে, একসঙ্গে চলতে শিখছে তারা।
বিস্ময়ের পর্বত ফুজি
টোকিওর ব্যস্ততা ছেড়ে এবার লক্ষ্য মাউন্ট ফুজি নিজ চোখে দেখা। আগের রাতে টোকিও ভাসিয়ে বৃষ্টি হলো, মন খারাপ হয়ে গেল। তবু বুকভরা আশা নিয়ে বাসে চড়ে বসলাম। মাউন্ট ফুজি মূলত এক দিনে দেখে ফেলার মতো কোনো বিষয় নয়, তাই ব্যাগ গুছিয়ে রওনা হলাম সময় নিয়ে এই সৌন্দর্য অনুভব করতে। বাস এগোতে থাকল, মেঘ কেটে সূর্য উঁকি দিতে লাগল। আমাদের উৎসুক চোখ খুঁজতে থাকল আকাশের ধার, হঠাৎ এক বাঁকে সূর্যের আলোয় ঝলমল করে জানালায় ভেসে উঠল ফুজি। মুখ থেকে অজান্তেই বের হলো—‘ওয়াও!’
কাওয়াগুচিকোতে ফুজির দেখা
কাওয়াগুচিকো পৌঁছে বুঝলাম, এখানে ফুজিকে আপনার খুঁজতে হয় না, ফুজিই আপনাকে খুঁজে নেয়! হোটেলের জানালা, স্টোরের ছাদ, রাস্তার ধার থেকেও উঁকি দেয় এই পর্বত। ঐশী পার্কের রঙিন ফুলের মধ্যে দাঁড়িয়ে দূরের ফুজি যেন এক জীবন্ত পোস্টকার্ড। ভোরে উঠে গেলাম চুরেতো প্যাগোডার পেছনে সেই বিখ্যাত দৃশ্যের অপেক্ষায়। দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর মেঘ সরে গেলে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এল ফুজি—নীরব, বিস্ময়কর। শেষে ঘুরে এলাম ওশিনো হাক্কাই। মাউন্ট ফুজি গলে নেমে আসা স্বচ্ছ পানির ধারায় গড়ে ওঠা ছোট্ট গ্রাম, যেখানে সময় ধীরে চলে, আর প্রতিটা দৃশ্য মনে হয় রূপকথার কোনো দৃশ্য।
গতির শহর ওসাকা
টোকিও আর ফুজির শান্ত সৌন্দর্য পেরিয়ে এবার পালা গতির, পৃথিবীর অন্যতম দ্রুতগতির বুলেট ট্রেনের অভিজ্ঞতা নেওয়ার। ঘণ্টায় ৩০০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে ছুটে চলা এই ট্রেন যেন মাটির ওপর দিয়ে উড়তে থাকে! চোখের পলকেই যা আমাদের টোকিও থেকে পৌঁছে দিল জাপানের লাস ভেগাস ওসাকায়। এখানে রাত নামতেই ঢুকে পড়লাম দোতনবাড়ি, চারপাশে নিয়ন আলো, খাবারের ঘ্রাণ আর মানুষের ঢল। দোতনবাড়ি এলাকার চারদিকে মাকড়সার জালের মতো অলিগলিতে দিনরাত চলে জমজমাট খানাপিনা, ক্লাবিং আর শপিং।
অলিখিত প্রতিযোগিতা
খাবারের দোকানগুলোর মালিকদের মধ্যে সম্ভবত একটা প্রতিযোগিতা চলে, কার দোকানটা সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় হবে—এই হলো প্রতিযোগিতার বিষয়। এত ঝলমলে জায়গা জীবনে খুব কমই দেখেছি। সামনে দেখা দিল সেই বিখ্যাত গ্লাইকো রানিং ম্যানের বিলবোর্ড, হাত তুলে বিজয়ের হাসি দিয়ে যেন তা পুরো শহরের এনার্জি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এ এক অন্য জগৎ। আগে শহরে প্রথম এলে মানুষ যেমন অবাক হতো, দালানের ফ্লোর গুনত; জাপানে এসে আমার হয়েছে সেই দশা!
প্রাচীন জাপানের স্পর্শ কিয়োটোতে
সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে, শেষের দিনগুলো আমাদের কাটল জাপানের ইতিহাস–ঐতিহ্য অবিকৃতভাবে ধরে রাখা কিয়োটো শহরে। এটা কেবল একটা শহর নয়, যেন সময়ের বুকের ভাঁজে রাখা এক টুকরো প্রাচীন জাপান। ভোরের আলোয় দাঁড়িয়ে ছিলাম কিনকাকুজির সামনে। সোনালি মন্দিরটা পানিতে নিজের প্রতিবিম্ব ফেলে এমনভাবে জ্বলজ্বল করছিল, যেন সূর্যটাই এসে পানিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। তারপর পথ আমাদের নিয়ে গেল গিনকাকুজিতে। এখানে সোনালি চাকচিক্য নেই, বরং আছে একধরনের সংযত সৌন্দর্য, যার আঙিনার প্রতিটি বালুকণায় লেখা প্রাচীন জাপানের ইতিহাস।
শহর যেন গল্প শোনায়
কিয়োমিজু-ডেরার কাঠের মঞ্চে দাঁড়িয়ে পুরো কিয়োটো শহরটাকে যখন দেখছিলাম, মনে হচ্ছিল যেন আকাশের ধারে দাঁড়িয়ে আছি, শহরটা নিচে, আর আমরা তার গল্প শুনছি। আর ফুশিমি ইনারি তাইশা, হাজার হাজার লাল তোরি গেটের সেই পথটা যেন এক অন্তহীন সময়ের করিডর। প্রতিটি গেট পার হওয়া মানে যেন একেকটা ইতিহাস পেরিয়ে যাওয়া। আরাশিয়ামার বাঁশবনে ঢুকতেই মনে হলো, বাস্তব জগতে নেই। বাঁশগুলো মাথার ওপর এমনভাবে দুলছিল, যেন প্রকৃতি নিজেই ফিসফিস করে গল্প বলছে।
যেখানে তাড়া নেই
কিয়োটো থেকে ট্রেনে মাত্র ৪০ মিনিট, কিন্তু নেমেই মনে হলো, সময়টা যেন একটু ধীর হয়ে গেছে। নারা শহরটা আপনাকে তাড়া দেবে না, বরং ধীরে ধীরে নিজের ভেতরে টেনে নেবে। নারা পার্কে হরিণগুলো মানুষের একেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়ায়, কোনো ভয় নেই, ডর নেই। আপনি মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানালে, সে–ও যেন ভদ্রভাবে সেই অভিবাদন ফিরিয়ে দেয়। সেই ছোট্ট মুহূর্তে বুঝতে পারি মানুষ আর প্রকৃতির মধ্যে সম্পর্কটা আসলে কত সহজ হতে পারে।
নিশিবেলার বাজার
রাতের নিশিকি মার্কেট, স্বাদের এক জীবন্ত জাদুঘর। প্রতিটা দোকান যেন একেকটি রঙিন গল্প, আর প্রতিটি খাবার যেন একেকটা অভিজ্ঞতা। দিনের শেষে পৌঁছালাম ইয়াসাকা শ্রাইনে। সন্ধ্যার আলোয় লন্ঠনগুলো জ্বলে উঠতেই জায়গাটা যেন স্বপ্নের মতো লাগছিল, একটা নীরব, শান্ত অথচ গভীর অনুভূতির জায়গা। কিয়োটো আমাকে শিখিয়েছে ভ্রমণ মানে শুধু জায়গা দেখা নয়, বরং প্রতিটি মুহূর্তকে অনুভব করা। এখানে প্রতিটি পথ, মন্দির, শ্রাইন এমনকি বাতাসের ছোঁয়ায় লুকিয়ে আছে আদি জাপানের সময়ের গল্প, যা ভুলে থাকা যায় না।
শেষ কথা
জাপান শুধু সুন্দর নয়, অস্বাভাবিক রকম সুন্দর। এটা এমন এক দেশ, যা আপনি শুধু দেখবেন না, অনুভব করবেন। পরিষ্কার রাস্তা, সময়মতো ট্রেন, মানুষের ভদ্রতা, এই সাধারণ জিনিসগুলোই আপনার মনে গভীর ছাপ রেখে যাবে। জাপান থেকে ফিরে আসার পর সবকিছুই যেন একটু অন্য রকম লাগবে। চারপাশের শব্দ বেশি মনে হবে, বিশৃঙ্খলাও চোখে পড়বে বেশি। আপনি অজান্তেই তুলনা করবেন; কারণ, জাপান আপনাকে দেখিয়ে দেবে, নিয়মে চলা জীবন কতটা সুন্দর হতে পারে। এই দেশে আপনি হারিয়ে যাবেন না, আবার এই দেশটা আপনার মন থেকেও হারিয়ে যাবে না।



