বিশ্বকাপের মঞ্চ: পুরুষের কান্নার অনুমতি ও সমাজের দ্বিচারিতা
বিশ্বকাপের মঞ্চ: পুরুষের কান্নার অনুমতি ও দ্বিচারিতা

বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের বেশিরভাগ ম্যাচ তেমন নাটকীয়তা ছাড়াই শেষ হয়, কিন্তু নকআউট পর্বের কাছাকাছি এসে কিছু একটা ভেঙে পড়ে। প্রায় ৯০ মিনিটের দুর্দান্ত ফুটবলের পর, পরাজিত দলের ১১ জন খেলোয়াড় ভেঙে পড়েন, স্ট্যান্ডের দর্শকরাও তাদের সঙ্গে কাঁদেন, এবং গোটা জাতি কান্নায় ভেঙে পড়ে।

একটি সুযোগ, চার বছরে একবার। তা মিস করলে আরও চার বছর অপেক্ষা, এবং কিছু খেলোয়াড়ের জন্য তাদের ক্যারিয়ার সেখানেই শেষ। একটি দল নিখুঁত নব্বই মিনিট খেলতে পারে, জাপানের মতো গতিতে এগিয়ে যেতে পারে, তবুও অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তে একটি গোল গোটা জাতিকে কাঁদানোর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

পুরুষের কান্নার অনুমতি

এটাই সম্ভবত বিশ্বের একমাত্র মঞ্চ যেখানে পুরুষরা তাদের বুকের ভার চোখের জল হিসেবে ফেলতে পারেন, কেউ তাদের বিচার করবে এই ভয় ছাড়াই। শুরুটা ছোটবেলায়, সাইকেল থেকে পড়ে 'ছেলেরা কাঁদে না' শুনে, এবং বছর পর একইভাবে শেষ হয়: পুরুষরা কাঁদে না। পুরুষদের রোবটের মতো ঘুরতে বাধ্য করা হয়, কাজ করতে, স্বাভাবিক থাকতে, যখন প্রয়োজন তখন হাসি ধরে রাখতে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফুটবল সত্যিই এক অদ্ভুত অনুমতি পত্র। সমাজ পুরুষ শরীরকে শক্তির প্রতীক হিসেবে গড়ে তুলেছে, এবং বিশ্বকাপের মাঠই সম্ভবত একমাত্র জায়গা যেখানে সেই শরীর ভেঙে পড়তে পারে, কেউ একে দুর্বলতা বলবে না। যখন জাপানি খেলোয়াড়রা অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তে গোল হজম করে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, স্ট্যান্ডের কেউ তাদের নরম বলে ডাকেনি। বরং, গোটা জাতি সেই মুহূর্তে তাদের সঙ্গে কাঁদার অধিকার খুঁজে পেয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শৈশবের শিক্ষা ও বাস্তবতা

সেই ছোটবেলার সাইকেলের ঘটনা আসলে শুধু শুরু। পরে স্কুলের মাঠে আঘাত পেয়ে 'মেয়েদের মতো কাঁদছ কেন?' শোনা, বা পরীক্ষায় ফেল করে 'এখন যদি এমন করো, বড় হয়ে কী করবে?' শোনা। তারপর ব্যর্থ সম্পর্ক বন্ধুদের হাসির পাত্রে পরিণত হয়। ধীরে ধীরে একটি ছেলে শিখে যায় যে কান্না ব্যর্থতার প্রমাণ, দুর্বলতার স্বাক্ষর। সে তার চোখের জল গিলে ফেলতে শেখে, গলায় চিরস্থায়ী একটি পাথর চেপে রাখতে শেখে।

বছরের পর বছর এই পাথরগুলো জমতে থাকে, যতক্ষণ না বুকের ভিতরে এক কবরস্থান তৈরি হয়, যা সে কখনো বলতে পারেনি এমন সব জিনিসে ভরা। আর তারপর একদিন, চার বছরে একবার আসা একটি মঞ্চে, ৯০ মিনিটের ফুটবল সব দেয়াল ভেঙে দেয়। কারণ এখানে, হারের কারণ সুস্পষ্ট, প্রকাশ্য, এমন কিছু যা সবাই একসঙ্গে দেখেছে। এখানে, কাউকে তার কান্নার ব্যাখ্যা দিতে হয় না।

কান্নার গ্রহণযোগ্যতা ও সমাজের দ্বিচারিতা

একজন পুরুষ ফুটবল মাঠের বাইরে কাঁদলে তাকে প্রথমে নিজেকে ব্যাখ্যা করতে হয়, তার কান্নাকে ন্যায্যতা দিতে হয়। কিন্তু মাঠে হেরে যাওয়া খেলোয়াড়ের কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই, তার কান্না আগেই বৈধ বলে গৃহীত হয়। আর এই গ্রহণযোগ্যতাই সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয়। এর মানে হলো, একজন পুরুষের ব্যথা তখনই সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় যখন এর একটি 'যুক্তিসঙ্গত', দৃশ্যমান কারণ থাকে। কিন্তু জীবনের বেশিরভাগ ব্যথারই এমন স্পষ্ট কারণ থাকে না।

বিষণ্ণতা, একাকীত্ব, ভাঙা সম্পর্ক, বাবা হওয়ার ভয়, চাকরি হারানোর লজ্জা—এগুলোর কোনোটিরই স্টেডিয়াম নেই, কোনোটিরই কান্নায় শামিল হওয়ার মতো ভিড় নেই। তাই এই ব্যথা একা, অব্যক্ত থাকে।

সমাধানের পথ

প্রকৃত প্রশ্ন হলো: আমরা কি পুরুষের কান্নার অনুমতি দেওয়ার জন্য বিশ্বকাপের মতো বিরল মঞ্চের অপেক্ষায় থাকব? নাকি আমরা এমন একটি সমাজ গড়তে পারি যেখানে ঘরের কোণে, বন্ধুর কাঁধে, বা নিজের জায়গায় কান্না করা একজন পুরুষের জন্য মেসি বা নেইমারের বিশ্বকাপের কান্নার মতোই স্বাভাবিক মনে হয়?

২০২২ বিশ্বকাপের সেই রাতগুলো মনে আছে? যখন মেসি ট্রফি ধরে কাঁদছিলেন, ঢাকার রাস্তায় ছেলেরা, মেসবাড়ির ছাদে, চায়ের দোকানের সামনে বসে তার সঙ্গে কাঁদছিল। অথচ এই একই ছেলেরা সম্ভবত পরিবারের কোনো সদস্যের মৃত্যুতেও খোলাখুলি কাঁদতে পারেনি, কারণ 'তোমাকেই এখন পরিবার ধরে রাখতে হবে, শক্ত থাকো।' কোনোভাবে আর্জেন্টিনার জার্সি পরে হাজার মাইল দূরের অচেনা একজনের কান্নার সঙ্গে সংযোগ বোধ করা নিজের ভেতরের কান্না স্বীকার করার চেয়ে সহজ হয়ে যায়।

এখানে আমি আমার নিজের কাজে লক্ষ্য করা একটি বিষয় যোগ করতে চাই। সাংবাদিকতা করতে গিয়ে আমি অসংখ্য গল্প শুনেছি: নদীভাঙনে সব হারানো মানুষ, চাকরি হারানো বাবা, সন্তান হারানো পুরুষ। তাদের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে আমি লক্ষ্য করেছি, একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর পুরুষরা কথা বলার সময় নিচের দিকে তাকান, তাদের কণ্ঠ কাঁপে, কিন্তু তারা সবকিছু দিয়ে কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করেন। যেন সেই চোখের জল ফেলে দিলে সাক্ষাৎকার অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, যেন কান্না নিজেই রেকর্ডারে দুর্বলতার নথি হয়ে বসে থাকবে। অথচ এই একই পুরুষরা বাড়ি গিয়ে টেলিভিশনের সামনে বসে একটি ম্যাচ দেখতে দেখতে নীরবে কাঁদতে পারেন, কারণ কেউ দেখছে না, বা দেখলেও কেউ কারণ জিজ্ঞেস করবে না।

ভয়টা দেখা যাওয়ার

আসল সমস্যা কখনোই কান্না নিজে ছিল না, বরং দেখা যাওয়ার ভয়। পুরুষরা কাঁদতে পারে না তা নয়, বরং যদি কাঁদে, তাহলে কেউ দেখে ফেলতে পারে, এবং সেই দেখা বিচারে পরিণত হতে পারে। যখন পুরো স্ট্যান্ড, গোটা জাতি একসঙ্গে কাঁদে, কেউ একা পড়ে না, বিচারের মুখে একা দাঁড়ায় না। কান্না সম্মিলিত হয়, এবং তাই নিরাপদ হয়।

সম্ভবত এখান থেকেই সমাধানের শুরু। যদি একা কান্না ভীতিকর হয়, তাহলে আমাদের প্রয়োজন ছোট ছোট বৃত্ত, বন্ধুদের মধ্যে, পরিবারের মধ্যে, সম্পর্কের ভিতরে, যেখানে একজন পুরুষের কান্না মানে এই নয় যে তাকে একা সেই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে। যেখানে 'কী হয়েছে, বলো' প্রশ্নটির মধ্যে কোনো বিচার নেই, শুধু তার পাশে বসার আন্তরিক ইচ্ছা আছে।

হয়তো প্রতিটি পুরুষের নিজের ছোট মুহূর্ত প্রয়োজন, যেখানে হেরে গেলেও, কাঁদলেও, কেউ তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, বিচারক হিসেবে নয়, বরং স্ট্যান্ডের সমর্থক হিসেবে। বিশ্বকাপ আমাদের শেখায় না যে পুরুষরা কাঁদতে জানে না, এটি শেখায় যে পুরুষরা কান্না ভুলে যায়নি, তারা শুধু অনুমিতির অপেক্ষায় আছে। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই অনুমতি, সেই নিরাপদ স্ট্যান্ড, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে গড়ে তুলতে পারব? নাকি আমরা চার বছর পর পর একটি ট্রফির জন্য অপেক্ষা করতে থাকব আমাদের কান্নাকে বৈধতা দিতে?