খাতার পাতায় কাটাকুটি করতে কার ভালো লাগে? একটু ভুল হলেই আমরা চট করে ইরেজার বা রাবার ঘষে লেখাটা মুছে ফেলি। ল্যাপটপ বা ফোনে যেমন ব্যাকস্পেস বা ডিলিট বাটন চেপে ভুল ঠিক করা যায়, খাতার পাতায় সেই ডিলিট বাটনের কাজ করে এই ছোট্ট ইরেজার। কিন্তু পেনসিলের দাগ ইরেজার ঘষলেই কেন উধাও হয়ে যায়? কলমের কালি তো এভাবে মোছা যায় না! ইরেজার আসলে কীভাবে কাজ করে?
ইরেজারের ইতিহাস
পেনসিলের ইতিহাস অনেক পুরোনো হলেও ইরেজার কিন্তু বেশ দেরিতেই এসেছে। আধুনিক পেনসিল, যেখানে কাঠ বা মাটির আবরণের ভেতর গ্রাফাইট ভরা থাকে, সেটি ১৭ শতকের দিকে আবিষ্কৃত হয়। কিন্তু তখনকার মানুষ পেনসিলের ভুল মুছত কী দিয়ে জানো? দলা পাকানো বাসি পাউরুটি কিংবা মোম দিয়ে! হ্যাঁ, শুনতে অদ্ভুত লাগলেও এটাই সত্যি।
এরপর ১৮ শতকে এসে মানুষ বুঝতে পারে, প্রাকৃতিক রাবার দিয়ে খুব সহজেই দাগ মোছা যায়। পরে ১৯ শতকে এই প্রাকৃতিক রাবারকে তাপ ও সালফার দিয়ে আরও মজবুত করা হয়। আর আমাদের পরিচিত প্লাস্টিকের ইরেজারগুলো এসেছে আরও পরে, ২০ শতকে।
ইরেজার কীভাবে কাজ করে?
ইরেজার কীভাবে কাজ করে, তা জানার আগে বুঝতে হবে পেনসিল কীভাবে লেখে। কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের অধ্যাপক জোসেফ এ. শোয়ার্জের মতে, পেনসিল দিয়ে যখন আমরা কাগজে লিখি, তখন পেনসিলের শিস বা গ্রাফাইট থেকে অতি ক্ষুদ্র কার্বনের কণা খসে পড়ে কাগজের ওপর বসে যায়। পেনসিলের এই শিসকে অনেকেই ভুল করে লেড বা সিসা বলে, যদিও এর ভেতরে সিসার কোনো অস্তিত্বই নেই!
কাগজের ওপর খসে পড়া এই গ্রাফাইটের কণাগুলো কাগজের আঁশের ফাঁকে আটকে যায়। গ্রাফাইট আর কাগজের অণুগুলোর মধ্যে খুব সামান্য আকর্ষণ বল কাজ করে। ফলে দাগটা কাগজের ওপর টিকে থাকে।
ঠিক এখানেই ইরেজারের আসল ম্যাজিক শুরু হয়। গ্রাফাইটের কণাগুলো কাগজকে যতটা আটকে রাখে, তার চেয়ে অনেক বেশি আটকে রাখে ইরেজারকে! বিজ্ঞানের ভাষায় বললে, কাগজের চেয়ে ইরেজার বা রাবারের প্রতি গ্রাফাইট কণাগুলোর আকর্ষণ অনেক বেশি।
তাই তুমি যখন কাগজের ওপর ইরেজার ঘষো, তখন ঘর্ষণের কারণে গ্রাফাইট কণাগুলো কাগজ ছেড়ে ইরেজারের গায়ে আটকে যায়। এর সঙ্গে হালকা একটু ঘর্ষণের ক্ষয়ও কাজ করে, যা গ্রাফাইট কণাগুলোকে জায়গা থেকে সরিয়ে দেয়। এই ঘর্ষণের কারণে কাগজেরও খুব সামান্য একটা অংশ ক্ষয়ে যায়। নরম ইরেজারগুলো কাগজের ওপর বেশ আলতোভাবে কাজ করে বলে খাতা সহজে ছেঁড়ে না। আর শক্ত ইরেজারগুলো একটু বেশি ঘর্ষণ তৈরি করে।
ভ্যান ডার ওয়ালস বল
এই যে গ্রাফাইট আর কাগজের মধ্যে আকর্ষণের কথা বললাম, রসায়নের ভাষায় একে বলে ভ্যান ডার ওয়ালস বল। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, লস অ্যাঞ্জেলেসের রসায়নের সহযোগী অধ্যাপক জাস্টিন ক্যারামের মতে, অণুগুলোর ভেতরে ইলেকট্রনের মেঘ এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করে। এই ছোটাছুটির কারণে অণুর একপাশে সাময়িকভাবে সামান্য ধনাত্মক চার্জ এবং অন্য পাশে ঋণাত্মক চার্জ তৈরি হয়। ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জ একে অপরকে আকর্ষণ করে বলেই গ্রাফাইটের কণাগুলো কাগজের গায়ে লেগে থাকে। তবে এই আকর্ষণ বল খুব দুর্বল। ইরেজারের ঘর্ষণে এই দুর্বল বল সহজেই ভেঙে যায়।
ইরেজেবল কলমের রহস্য
ইরেজেবল কলমের কথা কি শুনেছ? যে কলমের কালি ইরেজার দিয়ে অনায়াসেই মোছা যায়! এই কালিগুলো কিন্তু গ্রাফাইটের মতো কাজ করে না। পাইলটের মতো কলম প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো একধরনের বিশেষ কালি ব্যবহার করে, যাকে বলে থার্মোক্রোমিক ইঙ্ক। এই কালি তাপমাত্রার পরিবর্তনে নিজের রং বদলায়।
তুমি যখন ইরেজার দিয়ে ঘষো, তখন ঘর্ষণের ফলে কাগজের ওই জায়গার তাপমাত্রা বেড়ে ১৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপরে চলে যায়। এই তাপমাত্রায় কালির রাসায়নিক বন্ধন ভেঙে গিয়ে কালিটা পুরোপুরি স্বচ্ছ বা রংহীন হয়ে যায়। অর্থাৎ, তোমার লেখাটা কিন্তু কাগজের ভেতরেই থেকে যায়, শুধু আমরা আর চোখে দেখতে পাই না! মজার ব্যাপার হলো, তুমি যদি এই কাগজটাকে একটি পলিথিনে মুড়িয়ে রেফ্রিজারেটরের ডিপ ফ্রিজে (মাইনাস ৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায়) রেখে দাও, কিছুক্ষণ পর দেখবে তোমার মুছে ফেলা লেখাগুলো আবার জাদুকরীভাবে ফিরে এসেছে!
তবে সাধারণ কালির দাগ কিন্তু ইরেজার দিয়ে মোছা যায় না। কেন? কারণ সাধারণ কলমের কালি দিয়ে লিখলে তা কাগজের আঁশের একেবারে গভীরে মিশে যায়। তরল শুকিয়ে গেলেও কালির রংটা কাগজের মলিকিউলার নেটওয়ার্কের সঙ্গে শক্তভাবে আটকে থাকে। তাই সাধারণ কালি ইরেজার দিয়ে মুছতে গেলে কাগজই ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।
এই সমস্যা সমাধানের জন্যই বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে সাদা কালির আবিষ্কার হয়। তবে ভুল হলে সাদা রং ঢেলে তা ঢেকে দেওয়ার আইডিয়াটা কিন্তু আরও অনেক প্রাচীন। হাজার বছর আগে মিসরীয় কারিগরেরাও প্যাপিরাস কাগজের ওপর ভুল হলে তা সাদা রং দিয়ে ঢেকে দিতেন!
পেনসিল-ইরেজারের জুটি
১৮৬৮ সালে ফিলাডেলফিয়ায় পেনসিলের ঠিক পেছনে ইরেজার জুড়ে দেওয়ার আইডিয়াটা প্রথম পেটেন্ট করা হয়। মজার ব্যাপার হলো, একসঙ্গে খুব মানিয়ে গেলেও শুরুতেই এদের জুটি বাঁধেনি। উদাহরণস্বরূপ, জাপানের বিখ্যাত পেনসিল কোম্পানি টমবো ১৯১৩ সালে তাদের প্রথম পেনসিল বাজারে আনলেও, তাদের প্রথম ইরেজারটি বাজারে আনতে সময় লেগেছিল আরও ২৬ বছর! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রাকৃতিক রাবারের চরম সংকটের কারণেই মূলত তেলের ব্যবহার কমিয়ে প্লাস্টিকের ইরেজার তৈরির হিড়িক পড়ে।
আজকের এই ডিজিটাল যুগে এসে আমাদের স্ক্রিন টাইম অনেক বেড়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু খাতা, পেনসিল এবং ইরেজারের কদর আজও কমেনি। শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে অফিসকর্মীসহ মোটামুটি সবার হাতেই এরা ঘুরছে। মানুষ মাত্রই ভুল হয়। আর সেই ভুল খুব সুন্দর করে শুধরে নেওয়ার দারুণ এক সুযোগ করে দেয় ইরেজার!



