মুত্তাকিদের ছয় গুণ: জান্নাতের পথে অগ্রগামী
মুত্তাকিদের ছয় গুণ: জান্নাতের পথে অগ্রগামী

মুত্তাকিদের ছয় গুণ: জান্নাতের পথে অগ্রগামী

প্রত্যেক মুমিনের জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো আল্লাহর ক্ষমা লাভ করা এবং জান্নাতে প্রবেশ করা। কিন্তু জান্নাত কোনো সাধারণ অর্জন নয়; এটি তাদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে যারা তাকওয়ার জীবন গড়ে তোলে এবং আল্লাহর নির্দেশিত গুণাবলি নিজেদের চরিত্রে ধারণ করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা মুত্তাকিদের এমন কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন, যাদের জন্য রয়েছে তাঁর বিশেষ মাগফিরাত ও চিরস্থায়ী জান্নাতের সুসংবাদ।

আল্লাহ তাআলা বলেন—وَسَارِعُوا إِلَىٰ مَغْفِرَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ‘তোমরা তোমাদের রবের ক্ষমা এবং সেই জান্নাতের দিকে দ্রুত অগ্রসর হও, যার বিস্তৃতি আসমানসমূহ ও জমিনের সমান; যা মুত্তাকিদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৩৩)

এরপর আল্লাহ তাআলা মুত্তাকিদের ছয়টি বিশেষ গুণের কথা উল্লেখ করেছেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

১. সুখে-দুঃখে আল্লাহর পথে দান করা

মুত্তাকিদের প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো তারা শুধু প্রাচুর্যের সময় নয়, অভাব-অনটনের সময়ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করে। তাদের দানের উদ্দেশ্য মানুষের প্রশংসা নয়; বরং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি। আল্লাহ তাআলা বলেন—الَّذِينَ يُنْفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ‘যারা সচ্ছলতা ও অসচ্ছলতা উভয় অবস্থায় ব্যয় করে।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৩৪) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ فِي ظِلِّهِ... وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ فَأَخْفَاهَا‘সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ তাআলা তার আরশের ছায়ায় স্থান দেবেন... তাদের একজন হলো সে ব্যক্তি, যে এমন গোপনে দান করে যে তার ডান হাত যা দান করে বাম হাতও তা জানতে পারে না।’ (বুখারি ১৪২৩, মুসলিম ১০৩১)

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

২. রাগ সংবরণ করা: প্রকৃত শক্তিমানের পরিচয়

রাগ মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি; কিন্তু মুত্তাকির বৈশিষ্ট্য হলো সে রাগকে নিজের উপর কর্তৃত্ব করতে দেয় না। ক্রোধের মুহূর্তেও সে আল্লাহকে স্মরণ করে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। আল্লাহ তাআলা বলেন—وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ‘যারা নিজেদের ক্রোধ সংবরণ করে।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৩৪) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ‘প্রকৃত শক্তিশালী সে নয় যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (বুখারি ৬১১৪, মুসলিম ২৬০৯)

৩. মানুষকে ক্ষমা করার মহান গুণ

ক্ষমা করা দুর্বলতার পরিচয় নয়; বরং এটি বড় হৃদয়ের মানুষের বৈশিষ্ট্য। যারা মানুষের ভুল ক্ষমা করতে পারে, আল্লাহও তাদের প্রতি দয়া ও ক্ষমা প্রদর্শন করেন। وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ‘এবং যারা মানুষকে ক্ষমা করে।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৩৪) আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا ۗ أَلَا تُحِبُّونَ أَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ‘তারা যেন ক্ষমা করে এবং উপেক্ষা করে। তোমরা কি পছন্দ করো না যে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন?’ (সুরা আন-নূর: আয়াত ২২)

৪. মানুষের প্রতি এহসান ও কল্যাণকামিতা

মুত্তাকিরা শুধু অন্যায় থেকে দূরে থাকে না; তারা মানুষের উপকারেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। তারা সমাজে কল্যাণ ছড়ায় এবং মানুষের উপকারে নিজেকে উৎসর্গ করে। وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ‘আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৩৪) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—أَحَبُّ النَّاسِ إِلَى اللَّهِ أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ সে, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী।’ (আল-মু‘জামুল আওসাত)

৫. গুনাহ হয়ে গেলে দ্রুত তাওবা করা

মুত্তাকিরা ফেরেশতা নয়; তাদের দ্বারাও ভুল হতে পারে। কিন্তু তাদের বিশেষত্ব হলো, তারা গুনাহে অটল থাকে না। ভুল বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর কাছে ফিরে আসে এবং ক্ষমা প্রার্থনা করে। وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ‘আর যারা কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেলে অথবা নিজেদের প্রতি জুলুম করে, তখন আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৩৫)

৬. তাওবার পর গুনাহের উপর অটল না থাকা

সত্যিকারের তাওবার অন্যতম শর্ত হলো গুনাহ ত্যাগ করা এবং পুনরায় সেই পাপে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা। وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَىٰ مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ‘এবং তারা জেনেশুনে নিজেদের কৃতকর্মের উপর অটল থাকে না।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৩৫) এটাই প্রকৃত তাওবার পরিচয়—ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং সংশোধনের পথে ফিরে আসা।

এই ছয় গুণের পুরস্কার

আল্লাহ তাআলা এসব গুণের অধিকারীদের জন্য কী প্রতিদান রেখেছেন? أُولَٰئِكَ جَزَاؤُهُم مَّغْفِرَةٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَجَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا ۚ وَنِعْمَ أَجْرُ الْعَامِلِينَ‘তাদের প্রতিদান হলো তাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা এবং এমন জান্নাত, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত হবে। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। আর সৎকর্মশীলদের প্রতিদান কতই না উত্তম!’ (সুরা আল-ইমরান: ১৩৬)

মুত্তাকি হওয়া কেবল একটি পরিচয় নয়; এটি একটি জীবন ব্যবস্থা। সুখে-দুঃখে দান করা, রাগ নিয়ন্ত্রণ করা, মানুষকে ক্ষমা করা, কল্যাণের পথে অগ্রসর থাকা, গুনাহের পর দ্রুত তাওবা করা এবং পুনরায় সেই পাপে ফিরে না যাওয়া— এই ছয়টি গুণ একজন মুমিনকে আল্লাহর প্রিয় বান্দায় পরিণত করে।

আসুন, আমরা নিজেদের অন্তরকে যাচাই করি। এই গুণগুলোর কোনটি আমাদের মধ্যে আছে, আর কোনটি নেই—তা খুঁজে দেখি। যে গুণের ঘাটতি আছে, আজই তা অর্জনের দৃঢ় নিয়ত করি। কারণ আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য—মুত্তাকীদের জন্য রয়েছে মাগফিরাত, রহমত এবং চিরস্থায়ী জান্নাত। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মুত্তাকীদের এই ছয়টি গুণে গুণান্বিত হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।