নবীজির ঐতিহাসিক চিঠি: বিশ্বনেতাদের কাছে ইসলামের আহ্বান
নবীজির ঐতিহাসিক চিঠি: বিশ্বনেতাদের কাছে ইসলামের আহ্বান

ছবি: পেক্সেলস

হোদাইবিয়ার সন্ধির পর এক অনন্য কূটনৈতিক উদ্যোগ

হোদাইবিয়ার সন্ধির পর আরবের রাজনৈতিক পরিবেশ তখন মোটামুটি শান্ত। ঠিক সেই মুহূর্তে নবীজি (সা.) এক অনন্য কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। সমকালীন বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর সম্রাট এবং প্রভাবশালী আঞ্চলিক নেতাদের কাছে ইসলামের আহ্বান-সংবলিত পত্র প্রেরণের সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত যখন নিলেন, তাঁকে জানানো হলো যে সমকালীন রাজন্যবর্গ সিলমোহর ছাড়া কোনো চিঠি গ্রহণ করেন না। ফলে তিনি রুপা দিয়ে একটি বিশেষ আংটি তৈরি করান, যাতে খোদাই করা ছিল—‘মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এই সিলমোহরযুক্ত চিঠিগুলো নিয়ে সাহাবিরা দূত হিসেবে ছুটে যান বিভিন্ন দেশের রাজা-বাদশাহদের দরবারে।

হাবশার বাদশাহ নাজাশির নামে চিঠি

ইসলামের ইতিহাসে হাবশার বাদশাহ নাজাশির (আসহামা ইবনে আবজার) নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। মক্কা যুগে যখন মুসলিমরা চরম নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলেন, তখন নবীজি (সা.) তাঁর চাচাতো ভাই জাফর ইবনে আবু তালিবের নেতৃত্বে একদল সাহাবিকে হাবশায় হিজরতের নির্দেশ দেন।

তখন নাজাশির উদ্দেশে পাঠানো পত্রে নবীজি অনুরোধ করেন—মুহাজিরদের যেন আশ্রয় দেওয়া হয় এবং তাঁদের প্রতি কোনো জবরদস্তি না করা হয়।

পরবর্তী সময়ে হোদাইবিয়ার সন্ধির পর নাজাশিকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে আরেকটি চিঠি পাঠানো হয়, যাতে আল্লাহর একত্ববাদ ও নবী ইসা (আ.)-এর প্রকৃত পরিচয় উল্লেখ ছিল। সেখানে বলা হয়, ‘ইসলাম গ্রহণ করুন, নিরাপদ থাকবেন; অন্যথায় আপনার জাতির পাপের ভার আপনার ওপর বর্তাবে।’

নবীজির পক্ষ থেকে চিঠি পৌঁছে দেন সাহাবি আমর ইবনে উমাইয়া জামরি (রা.)। নাজাশি শ্রদ্ধার সঙ্গে চিঠিটি গ্রহণ করে নিজের চোখে ছোঁয়ান। উত্তরে তিনি নবীজির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে সিংহাসন থেকে নেমে জাফর (রা.)-এর হাতে ইসলামের বায়আত গ্রহণ করেন। (ইবনুল কাইয়িম, জাদুল মাআদ ফি হাদয়ি খাইরিল ইবাদ, ৩/৬০-৬১, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ২০১৩)

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নাজাশি নবম হিজরিতে ইন্তেকাল করলে নবীজি (সা.) মদিনায় সাহাবিদের নিয়ে তাঁর গায়েবানা জানাজা আদায় করেন।

আরও পড়ুন

যেভাবে রচিত হয় হিজরতের পটভূমি

১৩ জুন ২০২৬

মিসর অধিপতি মোকাওকিসের নামে চিঠি

মিসর ও আলেকজান্দ্রিয়ার বাদশাহ জুরাইজ ইবনে মাত্তার কাছে হাতিব ইবনে আবি বালতাআর মাধ্যমে তিনি একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। বাদশাহর উপাধি ছিল মোকাওকিস।

চিঠির ভাষ্য ছিল, ‘আল্লাহর বান্দা ও রাসুল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে কিবতিদের সম্রাট মোকাওকিস সমীপে। তাঁর ওপর শান্তি বর্ষিত হোক, যে হেদায়েতের পথে চলে। আমি আপনাকে ইসলামের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, নিরাপদ থাকবেন। ইসলাম গ্রহণ করলে আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ প্রতিদান দেবেন; আর বিমুখ হলে কিবতিদের পাপের বোঝাও আপনার কাঁধে বর্তাবে।’

উত্তরে মোকাওকিস লিখেছিলেন, ‘মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহর প্রতি কিবতি সম্রাট মোকাওকিসের পক্ষ থেকে। আপনার চিঠি আমার হস্তগত হয়েছে এবং আপনার দাওয়াত আমি বুঝতে পেরেছি। আমি জানতাম একজন নবী আসা বাকি ছিল, তবে আমার ধারণা ছিল তিনি শামে আবির্ভূত হবেন। আমি আপনার দূতকে সম্মান জানিয়েছি এবং উপহারস্বরূপ দুজন সম্মানী দাসী (মারিয়া ও সিরিন), কিছু পোশাক এবং একটি খচ্চর (দুলদুল) পাঠাচ্ছি।’ (ড. মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ, রাসুলে আকরাম কি সিয়াসি জিন্দেগি, পৃষ্ঠা: ১৪১, দারুল এশায়াত, করাচি, ১৯৬১)

মোকাওকিস ইসলাম গ্রহণ না করলেও নবীজির চিঠির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন এবং চিঠিটি হাতির দাঁতের তৈরি একটি কৌটায় সংরক্ষণ করেন। দাসী মারিয়া (রা.)-কে নবীজি নিজের কাছে রাখেন, যাঁর গর্ভে নবীজির পুত্র ইব্রাহিম জন্ম নেন।

পারস্য অধিপতি খসরু পারভেজের নামে চিঠি

পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজের কাছে আবদুল্লাহ ইবনে হুজাফার মাধ্যমে তিনি ওহি-সংবলিত চিঠি পাঠিয়েছিলেন। চিঠির শুরুতে ‘আল্লাহর রাসুল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে’ লেখা দেখে অহংকারী খসরু রাগে ফেটে পড়ে। সে অত্যন্ত ধৃষ্টতার সঙ্গে চিঠিটি ছিঁড়ে টুকরা টুকরা করে ফেলে।

এই ধৃষ্টতার খবর পেয়ে নবীজি (সা.) বলেছিলেন, ‘আল্লাহ যেন তার সাম্রাজ্যকেও এভাবে ছিন্নভিন্ন করে দেন।’ এর কয়েক দিনের মধ্যেই খসরুর নিজ পুত্র শিরওয়া তাকে হত্যা করে সিংহাসন দখল করে এবং পরবর্তী সময়ে পারস্যের অধীন ইয়ামেনের প্রশাসক বাজান সপরিবার ইসলাম গ্রহণ করেন। (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি শারহু সহিহিল বুখারি, ৮/১২৭-১২৮, দারুস সালাম, রিয়াদ, ২০০০)

রোম সম্রাট কায়সারের নামে চিঠি

রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে প্রেরিত চিঠিটি ছিল সমকালীন কূটনীতিতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত। সাহাবি দিহয়া কালবি (রা.) যখন এই চিঠি নিয়ে যান, তখন সম্রাট হিরাক্লিয়াস কোরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানকে (যিনি তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি) দরবারে ডেকে নবীজি সম্পর্কে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

আরও পড়ুন

যেভাবে তৈরি হয়েছিল বিদায় হজের রূপরেখা

১৬ মে ২০২৬

আবু সুফিয়ানের উত্তরে নবুয়তের সত্যতা আঁচ করতে পেরে রোম সম্রাট মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমি যদি তাঁর কাছে পৌঁছাতে পারতাম, তবে তাঁর পা ধুয়ে দিতাম।’ হিরাক্লিয়াস ক্ষমতার মোহ এবং আমলাদের বিরোধিতার কারণে প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ না করলেও নবীজির দূতের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আচরণ করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭)

আঞ্চলিক অন্য শাসকদের অবস্থান

১. বাহরাইনের শাসক মুনজির ইবনে সাবি

নবীজি বাহরাইনের শাসক মুনজিরের কাছে আলা ইবনুল হাজরামি (রা.)-এর মাধ্যমে চিঠি পাঠান। মুনজির সানন্দে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁর ভূখণ্ডের ইহুদি ও অগ্নিপূজারিদের জন্য জিজয়া করের মাধ্যমে নাগরিক সুবিধা বহাল রাখার নববি নির্দেশনা লাভ করেন। (ইবনুল কাইয়িম, জাদুল মাআদ, ৩/৬১-৬২)।

২. ইয়ামামার শাসক হাওজা ইবনে আলি

হাওজার কাছে চিঠি নিয়ে যান সালিত ইবনে আমর (রা.)। হাওজা শর্ত দিয়ে লিখেছিল যে ক্ষমতার কিছু অংশ তাকে দিলে সে আনুগত্য করবে। নবীজি (সা.) এই রাজনৈতিক শর্তযুক্ত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘ধর্মের নামে ক্ষমতার কোনো ভাগাভাগি হবে না’ (ইবনুল কাইয়িম, জাদুল মাআদ, ৩/৬৩)। এর কিছুদিন পরেই হাওজা মারা যায়।

৩. দামেশকের শাসক হারিস গাসসানি

রোম সম্রাটের অধীন দামেশকের শাসক হারিস গাসসানির কাছে ঐতিহাসিক পত্রটি বহন করেন শুজা ইবনে ওয়াহাব (রা.)। হারিস অত্যন্ত ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে চিৎকার করে বলেছিল, ‘কার সাধ্য আছে আমার থেকে আমার রাজত্ব ছিনিয়ে নেয়?’ (খুজারি বেগ, মুহাজারাতু তারিখিল উমামিল ইসলামিয়া, ১/১৪৬)।

৪. আম্মান অধিপতি জায়ফর ও আবদ

আম্মানের শাসক দুই ভাই জায়ফর ও আবদের কাছে আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কুশলী রাজনীতিক আমর ইবনুল আস (রা.) চিঠি নিয়ে যান। আমরের রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও ইসলামের অর্থনৈতিক সমতার (জাকাত) দর্শন শুনে দুই ভাই মুগ্ধ হয়ে রাজকীয় দম্ভ বিসর্জন দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। (ইবনুল কাইয়িম, জাদুল মাআদ, ৩/৬২-৬৩)।

সারকথা

ইসলাম যেকোনো জবরদস্তির ধর্ম নয়, বরং এক শাশ্বত জীবনের প্রতি নির্মল ও যৌক্তিক আহ্বান—নবীজি (সা.)-এর এই পত্রবিনিময় থেকেই তা প্রতিভাত হয়। এসব চিঠির প্রভাবে সমকালীন বিশ্বরাজনীতিতে যে চিরস্থায়ী পরিবর্তন এসেছিল, তা হাজার বছর পরেও বিশ্ব-কূটনীতি ও দাওয়াতের ইতিহাসে এক দেদীপ্যমান ও উজ্জ্বল দলিল হয়ে আছে।

ইলিয়াস মশহুদ : লেখক ও গবেষক

আরও পড়ুন

শিক্ষাদানে মহানবীর ১৫ কৌশল: উপমা, চিত্র ও যুক্তিনির্ভর সংলাপ

০৯ জুন ২০২৬

প্রথম আলোর খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

ইসলাম থেকে আরও পড়ুন

চিঠিপত্র

ইসলামের কথা

সিরাত

মহানবী (সা.)

নবীজি (সা.)

ইসলামধর্ম