সাহাবিদের অনুসরণে হোক আশুরার রোজা: সুন্নাহর শিক্ষা
সাহাবিদের অনুসরণে হোক আশুরার রোজা: সুন্নাহর শিক্ষা

মহররম মাসের ১০ তারিখ 'ইয়াওমে আশুরা' ইসলামের ইতিহাসে একটি মহিমান্বিত দিন। এ দিনে রোজা রাখার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরাম এ দিনের ইবাদতকে নিজেদের জীবনের অংশে পরিণত করেছিলেন। তারা শুধু নিজেরাই রোজা রাখতেন না, বরং সন্তানদেরও এ আমলের প্রতি উৎসাহিত করতেন। আশুরার রোজা তাই কেবল একটি নফল ইবাদত নয়; বরং এটি নববী আদর্শ ও সাহাবিদের জীবনচর্চার এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

মুহাররম: আল্লাহর সম্মানিত মাস

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন— 'নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধানে মাসের সংখ্যা বারোটি। এর মধ্যে চারটি হলো সম্মানিত (হারাম) মাস।' (সুরা আত-তাওবা: আয়াত ৩৬) মুহাররম সেই চার সম্মানিত মাসের অন্যতম। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মুহাররমের রোজা।' (মুসলিম ১১৬৩)

আশুরার রোজা ও সাহাবিদের অনুশীলন

আশুরার দিনকে সাহাবায়ে কেরাম অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করতেন। প্রখ্যাত নারী সাহাবি হজরত রুবাইয়্যি' বিনতে মুআব্বিয (রা.) বর্ণনা করেন, আশুরার দিন রাসুলুল্লাহ (সা.) আনসারদের এলাকায় সংবাদ পাঠিয়েছিলেন— 'যে ব্যক্তি সকালেই কিছু খেয়ে ফেলেছে, সে যেন দিনের বাকি সময় আর কিছু না খায়। আর যে কিছু খায়নি, সে যেন রোজা পূর্ণ করে।' তিনি বলেন, এরপর আমরা নিজেরাও রোজা রাখতাম এবং আমাদের শিশুদেরও রোজা রাখতে উৎসাহিত করতাম। যখন তারা ক্ষুধার কারণে কান্না করত, তখন আমরা তাদের খেলনা দিয়ে ব্যস্ত রাখতাম। এভাবেই ইফতারের সময় পর্যন্ত তারা ধৈর্য ধারণ করত। (বুখারি ১৯৬০, মুসলিম ১১৩৬) এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, সাহাবিদের কাছে আশুরার রোজা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত, যার শিক্ষা তারা পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও ছড়িয়ে দিতে সচেষ্ট ছিলেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কেন ৯ ও ১০ মুহাররমে রোজা রাখা উত্তম?

আশুরার মূল রোজা হলো ১০ মুহাররম। তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইহুদি সম্প্রদায়ের সঙ্গে সাদৃশ্য এড়াতে ৯ তারিখও রোজা রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন— সাহাবিরা বললেন, 'হে আল্লাহর রাসুল! এই দিনটিকে তো ইহুদি ও খ্রিস্টানরাও সম্মান করে।' তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন— 'আমি যদি আগামী বছর পর্যন্ত জীবিত থাকি, তবে অবশ্যই নবম তারিখেও রোজা রাখব।' (মুসলিম ১১৩৪) কিন্তু পরবর্তী বছর আসার আগেই রাসুলুল্লাহ (সা.) ইন্তেকাল করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এ নির্দেশনার আলোকে হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলতেন— 'তোমরা নবম ও দশম তারিখ রোজা রাখো এবং ইহুদিদের বিরোধিতা করো।' (তিরমিজি ৭৫৫) এ কারণে অধিকাংশ আলেম ৯ ও ১০ মুহাররমে রোজা রাখাকে সর্বোত্তম বলে মত দিয়েছেন।

আশুরার রোজার সর্বোত্তম পদ্ধতি

ফকিহ ও মুহাদ্দিসদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী আশুরার রোজা তিনভাবে রাখা যায়— ১. সর্বোত্তম: ৯, ১০ ও ১১ মুহাররম—তিন দিন রোজা রাখা। ২. উত্তম: ৯ ও ১০ মুহাররম—দুই দিন রোজা রাখা। ৩. জায়েজ ও ফজিলতপূর্ণ: শুধু ১০ মুহাররম রোজা রাখা। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) উল্লেখ করেন, মুহাররম মাসে বেশি বেশি রোজা রাখার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। (ফাতহুল বারি, ৪/২৪৬)

আশুরার রোজার ফজিলত

রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন— 'আশুরার দিনের রোজা সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, তিনি এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।' (মুসলিম ১১৬২) অর্থাৎ, এটি এমন একটি মহিমান্বিত আমল যার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর বিশেষ ক্ষমা ও রহমতের আশা করতে পারে।

আশুরার রোজা কেবল একটি ঐতিহাসিক স্মৃতি নয়; এটি ইমান, আনুগত্য, আত্মশুদ্ধি ও সুন্নাহর অনুসরণের এক অনন্য সুযোগ। সাহাবায়ে কেরাম যেভাবে নিজেদের জীবনে এ দিনের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং সন্তানদের মধ্যেও এর শিক্ষা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, তা আজও মুসলমানদের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ। তাই এ মহান দিনে বেশি বেশি ইবাদত, তওবা, দোয়া, সদকা এবং রোজার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য। আশুরার রোজা আমাদেরকে শুধু অতীতের স্মরণ করিয়ে দেয় না; বরং আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথও সুগম করে দেয়।