ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি: আলেমরাই প্রকৃত শাসক, বুদ্ধিবৃত্তিক কর্তৃত্বের প্রবক্তা
ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি: আলেমরাই প্রকৃত শাসক

ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি হিজরি ষষ্ঠ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, ফকিহ, দার্শনিক ও মুফাসসির। তাঁর তাফসিরে তিনি যে ধারণা তুলে ধরেছিলেন তার মর্মার্থ হলো—আলেমরাই প্রকৃত শাসক, কারণ তাঁদের কর্তৃত্বের উৎস বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেষ্ঠত্ব, যা কখনো বরখাস্ত করা যায় না; অন্যদিকে রাজা-বাদশাহদের কর্তৃত্ব নির্ভর করে নিছক জাগতিক শক্তির ওপর, যা সহজেই বদলে যেতে পারে। (ফখরুদ্দিন রাজি, মাফাতিহুল গাইব, খণ্ড: ৩২, বৈরুত: দারুল ফিকর, ১৯৮১)

নাম ও পরিচয়

তাঁর পূর্ণ নাম মুহাম্মদ ইবনে ওমর ইবনে হোসাইন ইবনে হাসান আল-কুরাশি আত-তাইমি। তাঁর নামের শেষে ‘আল–বাকরি’ও যুক্ত করা হয়, কেননা, তিনি খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.)–এর বংশধর বলে পরিচিত। তিনি ৫৪৪ হিজরিতে (১১৪৯ খ্রি.) পারস্যের রাই শহরে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা জিয়াউদ্দিন ওমর ছিলেন শাফেয়ি মাজহাবের একজন পণ্ডিত, আশআরি ধর্মতাত্ত্বিক এবং রাই শহরের খতিব। রাজি তাই ইতিহাসে ‘ইবনুল খতিব’ নামেও পরিচিত হন। পিতার মৃত্যুর পর তিনি কামাল আস-সামআনি ও মাজদুদ্দিন আল-জিলির কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন।

উলুল আমর-এর তাফসির

তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার বৈধতার প্রশ্নে ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ’ ও ‘ইজমা’কে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দিয়েছেন। সুরা নিসার ৫৯ নম্বর আয়াতে উল্লিখিত ‘উলুল আমর’ শব্দের তাফসিরে তিনি যুক্তি দেখান যে এর দ্বারা একক কোনো শাসককে বোঝানো হয়নি। কারণ যাদের আনুগত্য ফরজ করা হয়েছে, তাদের ভুলের ঊর্ধ্বে হওয়া আবশ্যক এবং একক কোনো শাসক ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। তাই তাঁর মতে উলুল আমর বলতে বোঝানো হয়েছে উম্মতের আলেম ও সমাজপতিদের সম্মিলিত ইজমাকে, যা নবীর হাদিস অনুযায়ী দলগতভাবে ভুল করতে পারে না। (ফখরুদ্দিন রাজি, মাফাতিহুল গাইব, সুরা নিসার তাফসির প্রসঙ্গে)

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যুগের সংকট

ইমাম রাজির জীবনকাল (৫৪৪–৬০৬ হি.) ছিল মুসলিম বিশ্বের জন্য এক টালমাটাল সময়। একদিকে পশ্চিমে ক্রুসেডের বিরুদ্ধে সালাহুদ্দিন আইয়ুবীর হিত্তিনের বিজয় (৫৮৩ হি.), অন্যদিকে পূর্ব সীমান্তে মঙ্গোল আগ্রাসনের পূর্বাভাস ঘনীভূত হচ্ছিল। তাঁর মৃত্যুর কয়েক দশকের মধ্যেই মঙ্গোলরা খোরাসান, বুখারা ও সমরকন্দ ধ্বংস করে ১২৫৮ খ্রিষ্টাব্দে বাগদাদ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এই রাজনৈতিক অস্থিরতার যুগে আলেমদের প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজে একধরনের স্থিতিশীলতার ভূমিকা রেখেছিল।

শাসকদের সঙ্গে সম্পর্ক

তিনি খোরাসান ও পারস্যের শাসকদের কাছে বেশ সমাদৃত ছিলেন। খওয়ারিজম শাহ মুহাম্মদ ইবনে তাকাশ (মৃ. ৬১৭ হি.) তাঁকে যথেষ্ট সম্মান ও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিলেন এবং তাঁর সম্মানে বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে ইতিহাসের সম্পূর্ণ চিত্র একপক্ষীয় নয়। দার্শনিক ও যুক্তিবিদ্যাভিত্তিক অবস্থানের কারণে তিনি রক্ষণশীল মহলের কাছে বিতর্কিতও ছিলেন। ইতিহাসে উল্লেখ আছে যে কারামিয়া সম্প্রদায়ের চাপের মুখে গিয়াসুদ্দিন ঘোরি (মৃ. ৫৯৯ হি.) একপর্যায়ে তাঁকে নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে বহিষ্কারের প্রতিশ্রুতি তাদের দিতে বাধ্য হন। এই দ্বৈত বাস্তবতা—একদিকে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা, অন্যদিকে রক্ষণশীল বিরোধিতা—তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

ইবনে খালদুনের পর্যালোচনা

সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদুন তাঁর মুকাদ্দিমা-তে ইসলামি চিন্তার ইতিহাস আলোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেন যে পরবর্তী যুগের মুতাকাল্লিমিনরা—যাদের মধ্যে ইমাম রাজি অন্যতম প্রধান—কালামশাস্ত্রের সঙ্গে দর্শনের প্রশ্নাবলি মিশিয়ে দিয়েছিলেন, কারণ উভয়ের আলোচ্য বিষয়ে সাদৃশ্য ছিল। ইবনে খালদুন স্পষ্টভাবে রাজির আল-মাবাহিসুল মাশরিকিয়্যাহ গ্রন্থের নাম উল্লেখ করে বলেন, রাজি ও তাঁর পরবর্তী অনুসারীরা দর্শন ও কালামকে কার্যত একই শাস্ত্রে রূপান্তরিত করেছিলেন। (ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, কায়রো: দারুল কিতাবিল আরাবি)

উত্তরাধিকার

ইমাম রাজীর চিন্তাধারা তাঁর ছাত্র ও পরবর্তী প্রজন্মের আলেমদের মাধ্যমে আইয়ুবি ও পরে উসমানীয় শিক্ষাব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করে। আশআরি-শাফেয়ি কালামের যে সমন্বিত ধারা তিনি গড়ে তুলেছিলেন, তা পরবর্তী মাদ্রাসা শিক্ষাক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।