আশুরা নিয়ে প্রচলিত ভুল বিশ্বাস ও ইসলামের সঠিক শিক্ষা
আশুরা: প্রচলিত ভুল বিশ্বাস ও সঠিক ইসলামী শিক্ষা

পবিত্র মহররম ইসলামী বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং চারটি সম্মানিত মাসের অন্যতম। এই মাসের ১০ তারিখ, অর্থাৎ আশুরার দিন, ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে সময়ের পরিক্রমায় আশুরাকে ঘিরে মুসলিম সমাজে নানা ধরনের লোকাচার, কুসংস্কার ও ভিত্তিহীন বিশ্বাস প্রচলিত হয়েছে, যেগুলোর অনেকগুলোর সঙ্গে কুরআন ও সহিহ হাদিসের কোনো সম্পর্ক নেই।

আশুরার প্রকৃত শিক্ষা

আশুরার প্রকৃত শিক্ষা হলো আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা, তাওবা-ইস্তিগফার, নফল রোজা এবং নবীদের সংগ্রাম থেকে শিক্ষা গ্রহণ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রে এসব মূল শিক্ষা আড়ালে পড়ে যায় এবং মানুষের মনোযোগ চলে যায় ধর্মীয় ভিত্তিহীন কিছু প্রথা ও বিশ্বাসের দিকে। তাই আশুরার প্রকৃত মর্যাদা ও সঠিক আমল সম্পর্কে জানা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

আশুরার ঐতিহাসিক গুরুত্ব

ইসলামী বর্ণনা অনুযায়ী, মহররমের ১০ তারিখে মহান আল্লাহ তাআলা হজরত মুসা (আ.) এবং বনী ইসরাইলকে ফেরাউনের জুলুম থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। এ উপলক্ষে ইহুদিরা এ দিনে রোজা পালন করত। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর ইহুদিদের এই আমল দেখতে পান। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা বলল, এটি একটি মহান দিন; এ দিনে আল্লাহ বনী ইসরাইলকে তাদের শত্রুর হাত থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তাই মুসা (আ.) এ দিনে রোজা রেখেছিলেন। তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘মুসার অনুসরণের ক্ষেত্রে আমরা তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার।’ এরপর তিনি নিজে রোজা রাখলেন এবং অন্যদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দিলেন।’ (বুখারি)

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আশুরার রোজার ফজিলত

আশুরার রোজা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নফল ইবাদত। এ রোজার বিশেষ ফজিলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—‘আশুরার দিনের রোজা সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, তিনি এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছরের (সগিরা) গুনাহ মাফ করে দেবেন।’ (মুসলিম)

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আশুরা নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা

সমাজে আশুরাকে কেন্দ্র করে এমন অনেক বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে, যেগুলোর পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো কুরআনি দলিল বা সহিহ হাদিস পাওয়া যায় না। তাহলো—

  • আশুরার দিন হজরত আদম (আ.) সৃষ্টি হয়েছিলেন: এ দাবির পক্ষে কোনো সহিহ হাদিস নেই। বিভিন্ন দুর্বল ও অগ্রহণযোগ্য বর্ণনার মাধ্যমে এটি প্রচারিত হয়েছে।
  • এ দিনে হজরত ইবরাহিম (আ.) জন্মগ্রহণ করেছিলেন: এ সম্পর্কেও কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র ইসলামী গ্রন্থসমূহে পাওয়া যায় না।
  • আশুরার দিন গোসল করলে সারা বছর রোগ হবে না: এটি সম্পূর্ণ লোকজ বিশ্বাস। ইসলামের কোনো গ্রহণযোগ্য সূত্রে এমন ফজিলতের উল্লেখ নেই।
  • এ দিনে সুরমা ব্যবহার করলে চোখের রোগ হয় না: এই ধারণার পক্ষে কোনো সহিহ হাদিস নেই। অনেক জাল ও দুর্বল বর্ণনার মাধ্যমে এটি প্রচারিত হয়েছে।
  • বিশেষ খিচুড়ি বা খাবার রান্না করাই আশুরার আমল: আশুরার দিনে নির্দিষ্ট কোনো খাবার রান্না বা বিতরণ করার নির্দেশ কুরআন-হাদিসে নেই। পরিবারের জন্য ভালো খাবারের আয়োজন করা বৈধ, তবে একে বিশেষ ধর্মীয় আমল মনে করা ভুল।
  • আশুরা অশুভ বা অপয়া দিন: ইসলামে কোনো দিনকে নিজস্বভাবে অশুভ মনে করার সুযোগ নেই। দিন ও সময় আল্লাহর সৃষ্টি; মর্যাদা ও বরকত আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে।
  • ১০ মহররম কেয়ামত সংঘটিত হবে: এ ধরনের বক্তব্যের পক্ষে কোনো সহিহ হাদিস বা নির্ভরযোগ্য ইসলামী দলিল নেই।

আশুরা ও কারবালার ঘটনা

মহররমের ১০ তারিখে কারবালার প্রান্তরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসেন (রা.) শাহাদাত বরণ করেন। এটি ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম বেদনাদায়ক ঘটনা। তবে আলেমগণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, কারবালার ঘটনার বহু আগ থেকেই আশুরার দিনটি মর্যাদাপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ ছিল। তাই আশুরার মূল আমল হলো রোজা রাখা, আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং নেক আমল বৃদ্ধি করা; শোককে কেন্দ্র করে মাতম, বুক চাপড়ানো বা শরীর আঘাত করা ইসলামী শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত নয়।

কুরআনের শিক্ষা: কৃতজ্ঞতার গুরুত্ব

মুসা (আ.)-এর মুক্তির ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন—‘আর স্মরণ কর, যখন আমি তোমাদের জন্য সাগর দ্বিখণ্ডিত করেছিলাম; অতঃপর তোমাদেরকে উদ্ধার করেছিলাম এবং ফেরাউনের সম্প্রদায়কে ডুবিয়ে দিয়েছিলাম, যখন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করছিলে।’

আশুরার সঠিক আমল

পবিত্র এই দিনে প্রমাণিত আমলগুলো হলো—

  • রোজা রাখা: রাসুলুল্লাহ (সা.) ইহুদিদের থেকে ভিন্নতা বজায় রাখতে ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম রোজা রাখার উৎসাহ দিয়েছেন।
  • তাওবা ও ইস্তিগফার করা: বেশি বেশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
  • জিকির ও নফল ইবাদত বৃদ্ধি করা: কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া এবং নফল আমলে সময় ব্যয় করা।
  • দান-সদকা করা: অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
  • নবীদের জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ: বিশেষ করে হজরত মুসা (আ.)-এর তাওয়াক্কুল, ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসার শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করা।

আশুরা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ দিন। কিন্তু এই দিনের প্রকৃত শিক্ষা বুঝতে হলে আমাদের আবেগ, কুসংস্কার ও লোকাচার থেকে বেরিয়ে এসে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে বিষয়টিকে দেখতে হবে। আশুরার মর্যাদা নিহিত রয়েছে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, নফল রোজা পালন, তাওবা-ইস্তিগফার এবং নবীদের আদর্শ থেকে শিক্ষা গ্রহণের মধ্যে। তাই ভিত্তিহীন বিশ্বাস ও অনৈসলামিক প্রথা পরিহার করে সুন্নাহসম্মত আমলের মাধ্যমে আশুরার দিনকে অর্থবহ করে তোলাই একজন সচেতন মুসলমানের দায়িত্ব।