নবীজি (সা.)-এর অপছন্দের তিন স্বভাব
নবীজি (সা.)-এর অপছন্দের তিন স্বভাব

মানুষের চরিত্র ও কথাবার্তাই তার প্রকৃত পরিচয় বহন করে। ইসলাম শুধু ইবাদত-বন্দেগির শিক্ষা দেয়নি; বরং মানুষের ভাষা, আচরণ, বিনয় ও সামাজিক ব্যবহারের প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। অনেক সময় মানুষের জিহ্বা তাকে সম্মানিত করে, আবার এই জিহ্বাই তাকে আল্লাহ ও তার রাসুলের অসন্তুষ্টির কারণ বানায়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন কিছু স্বভাব ও চরিত্রের ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছেন, যা মানুষের অহংকার, আত্মপ্রশংসা ও অন্যকে হেয় করার প্রবণতা সৃষ্টি করে। বিশেষত অনর্থক বেশি কথা বলা, মানুষকে ছোট করা এবং কথার মাধ্যমে নিজের জ্ঞান ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করা ইসলামে অত্যন্ত নিন্দনীয়। একজন মুমিনের সৌন্দর্য হলো— সংযত ভাষা, নম্র আচরণ এবং বিনয়পূর্ণ ব্যক্তিত্ব।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অপছন্দ

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ইন্না মিন আহাব্বিকুম ইলাইয়া ওয়া আকরাবিকুম মিন্নি মাজলিসান ইয়াওমাল কিয়ামাতি আহাসিনাকুম আখলাকান, ওয়া ইন্না আবগাদাকুম ইলাইয়া ওয়া আব'আদাকুম মিন্নি মাজলিসান ইয়াওমাল কিয়ামাতি আস-সারসারুনা ওয়াল মুতাশাদ্দিকুনা ওয়াল মুতাফাইহিকুন। অর্থ: 'তোমাদের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় এবং কেয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে তারা, যাদের চরিত্র উত্তম। আর তোমাদের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় এবং কেয়ামতের দিন আমার থেকে সবচেয়ে দূরে থাকবে তারা, যারা অনর্থক বেশি কথা বলে, মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে এবং কথার মাধ্যমে নিজের পাণ্ডিত্য ও অহংকার প্রকাশ করে।' (তিরমিজি ২০১৮)

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হাদিসে বর্ণিত তিনটি নিন্দনীয় স্বভাব

  1. অনর্থক বেশি কথা বলা: ইসলাম মানুষকে সংযত ভাষায় কথা বলতে শিক্ষা দেয়। অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত কথা অনেক সময় গুনাহ, গীবত, মিথ্যা ও ফিতনার কারণ হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন— মা ইয়ালফিজু মিন কাওলিন ইল্লা লাদাইহি রাকিবুন 'আতিদ। 'মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার কাছে উপস্থিত প্রহরী তা লিপিবদ্ধ করে।' (সুরা ক্বাফ: আয়াত ১৮) আরও ইরশাদ হয়েছে— ওয়া কুলু লিন্নাসি হুসনা। 'মানুষের সাথে উত্তম কথা বলো।' (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ৮৩) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— মান কানা ইউ'মিনু বিল্লাহি ওয়াল ইয়াওমিল আখিরি ফাল ইয়াকুল খাইরান আও লিয়াসমুত। 'যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন উত্তম কথা বলে অথবা নীরব থাকে।' (বুখারি ৬০১৮, মুসলিম ৪৭)
  2. মানুষকে ছোট ও তুচ্ছ করা: অহংকার অন্যকে হেয় করতে শেখায়। অথচ ইসলামে কোনো মুসলমানকে অপমান করা গুরুতর অপরাধ। আল্লাহ তাআলা বলেন— ইয়া আইয়ুহাল্লাজিনা আমানু লা ইয়াসখার কাওমুন মিন কাওমিন 'আসা আন ইয়াকুনু খাইরান মিনহুম। 'হে মুমিনগণ! কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে উপহাস না করে। হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম।' (সুরা আল-হুজুরাত: আয়াত ১১) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— বিহাসবি ইমরিইন মিনাশ শাররি আন ইয়াহকিরা আখাহুল মুসলিমা। 'কোনো মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ মনে করে।' (মুসলিম ২৫৬৪)
  3. কথার মাধ্যমে অহংকার ও পাণ্ডিত্য প্রকাশ করা: কিছু মানুষ জটিল ভাষা, কৃত্রিম ভঙ্গি ও আত্মপ্রশংসার মাধ্যমে নিজেদের বড় প্রমাণ করতে চায়। ইসলাম এটিকে অপছন্দ করে। কারণ প্রকৃত জ্ঞান মানুষকে বিনয়ী বানায়। আল্লাহ তাআলা বলেন— ওয়া লা তামশি ফিল আরদি মারাহা, ইন্নাকা লান তাখরিকাল আরদা ওয়া লান তাবলুগাল জিবালা তুলা। 'পৃথিবীতে অহংকারভরে চলাফেরা করো না। তুমি কখনো জমিন বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় পাহাড়সম হতে পারবে না।' (সুরা আল-ইসরা: আয়াত ৩৭) আরও ইরশাদ হয়েছে— ইন্নাল্লাহা লা ইউহিব্বু কুল্লা মুখতালিন ফাখুর। 'নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো অহংকারী ও আত্মগর্বকারীকে পছন্দ করেন না।' (সুরা লুকমান: আয়াত ১৮) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— লা ইয়াদখুলুল জান্নাতা মান কানা ফি ক্বালবিহি মিসকালু জাররাতিন মিন কিবর। 'যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।' (মুসলিম ৯১)

একজন মুমিনের আদর্শ চরিত্র কেমন হওয়া উচিত

একজন মুমিনের ভাষা হবে কোমল, আচরণ হবে বিনয়পূর্ণ এবং অন্তর হবে অহংকারমুক্ত। সে মানুষের সম্মান রক্ষা করবে, কম কথা বলবে এবং প্রয়োজনীয় ও কল্যাণকর কথা বলার চেষ্টা করবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। আল্লাহ তাআলা তাঁর সম্পর্কে বলেন— ওয়া ইন্নাকা লা 'আলা খুলুকিন 'আজিম। 'নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।' (সুরা আল-কলম: আয়াত ৪)

মানুষের কথাবার্তা ও আচরণ তার ঈমান ও চরিত্রের প্রতিফলন। অনর্থক বেশি কথা বলা, মানুষকে হেয় করা এবং জ্ঞানের অহংকার প্রদর্শন করা এমন স্বভাব, যা আল্লাহর রাসুল (সা.) অত্যন্ত অপছন্দ করতেন। একজন সচেতন মুসলিমের উচিত নিজের জিহ্বাকে সংযত রাখা, বিনয়ী হওয়া এবং অন্যের সম্মান রক্ষা করা।

আমরা যদি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নৈকট্য লাভ করতে চাই, তাহলে উত্তম চরিত্র, নম্রতা ও সুন্দর আচরণকে জীবনের অলংকার বানাতে হবে। কারণ কেয়ামতের দিন সবচেয়ে সম্মানিত হবে সেই ব্যক্তি, যার আখলাক সবচেয়ে সুন্দর হবে।