যাদের কুরবানি কবুল হবে না: জেনে নিন কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা
যাদের কুরবানি কবুল হবে না: কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা

কুরবানি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়; এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক গভীর মাধ্যম। বাহ্যিকভাবে পশু জবাই করাই এর মূল উদ্দেশ্য নয়—বরং এর অন্তরে রয়েছে ত্যাগ, তাকওয়া এবং একনিষ্ঠতা। তাই অনেকেই কুরবানি করলেও সবার কুরবানি আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হয় না। কেন হয় না? সেই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনায়।

কুরবানির বিধান: কুরআনের আলোকে

আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে প্রতিটি জাতির জন্য কুরবানির বিধান নির্ধারণ করেছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: 'প্রত্যেক জাতির জন্য আমি কুরবানির নিয়ম করে দিয়েছি; যাতে তারা আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে, যে সমস্ত জন্তু তিনি রিজিক হিসেবে দিয়েছেন তার উপর। তোমাদের ইলাহ তো এক ইলাহ; অতএব তাঁরই কাছে আত্মসমর্পণ করো; আর অনুগতদেরকে সুসংবাদ দাও।' (সুরা হজ: আয়াত ৩৪) আরও বলা হয়েছে: 'আপনি আপনার রবের জন্য নামাজ আদায় করুন এবং কুরবানি করুন।' (সুরা কাউসার: আয়াত ২)

যাদের কুরবানি কবুল হবে না

১. নিয়তে ইখলাস না থাকলে

কুরবানি কবুল হওয়ার জন্য একনিষ্ঠতা তথা নিয়ত বিশুদ্ধতা থাকা জরুরি। কুরবানিতে কাউকে শরিক করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভালোভাবে জেনে-বুঝে অংশীদার নির্বাচন করা। কারণ কোনো শরিকের নিয়ত গলদ হলে কারও কুরবানিই (অন্য শরিকদের কুরবানিও) শুদ্ধ হবে না। কেননা আল্লাহর কাছে কুরবানি রক্ত, মাংস ও হাড় কিছুই পৌঁছায় না বরং পৌঁছে মানুষের নিয়ত তথা তাকওয়া। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন: 'আল্লাহর কাছে কখনো ওগুলোর (কুরবানির পশুর) গোশত পৌঁছে না এবং রক্তও না; বরং তার কাছে পৌঁছে তোমাদের (মানুষের অন্তরের) তাকওয়া (সংযমশীলতা); এভাবে তিনি ওগুলোকে (কুরবানির পশুগুলোকে) তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো। এই জন্য যে, তিনি তোমাদের পথ প্রদর্শন করেছেন। আর তুমি সুসংবাদ দাও সৎকর্মশীলদের।' (সুরা হজ: আয়াত ৩৭)

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

২. কুরবানির পশুর প্রদর্শনী করলে

কুরবানি হবে শুধু আল্লাহর জন্য। লোক দেখানোর জন্য কিংবা সুনাম-সুখ্যাতির জন্য নয়। মানুষকে দেখানোর জন্য বাজারের বড় বড়, সুন্দর ও দামি পশুই জবাই করলেই কুরবানি হবে না। বরং তাতে ইখলাস থাকতে হবে। তবেই কুরবানি কবুল হবে। কুরবানির পশু প্রদর্শনীর ইচ্ছা থাকলে এ কুরবানি আল্লাহর কাছে কবুল হবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন: 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তো মুত্তাকি (পরহেজগার ও সংযমীদের) কুরবানিই কবুল করে থাকেন।' (সুরা মায়েদা: আয়াত ২৭)

৩. কুরআন-সুন্নাহর বিধানের লঙ্ঘন হলে

আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.)-এর বিধি-বিধান অনুসরণ করা ছাড়া কোনোভাবেই কুরবানি কবুল হবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন: 'যে তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করে; সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার প্রতিপালকের ইবাদতে কাউকে শরিক না করে।' (সুরা কাহফ: আয়াত ১০) সুতরাং যারা কুরবানি করবেন, তাদের কুরবানি কবুল হওয়ার জন্য কুরআন-সুন্নাহর দিকনির্দেশনার প্রতি লক্ষ্য রাখার গুরুত্ব অপরিসীম। যারা শুধু বছরজুড়ে এ পশু জবাই করে গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্যে কুরবানি দেয়; তাদের কুরবানিও গ্রহণযোগ্য হবে না।

৪. ভাগ-বণ্টনে গড়মিল হলে

কুরবানির পশুতে প্রত্যেকের অংশ সমান হতে হবে। কারও অংশ অন্যের অংশ থেকে কম/বেশি হতে পারবে না। যেমন কারো আধা ভাগ, কারও দেড় ভাগ। এমন হলে কোনো শরিকের কুরবানি শুদ্ধ হবে না। (বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭) উট, গরু, মহিষ সাত ভাগে এবং সাতের কমে যেকোনো সংখ্যা যেমন— দুই, তিন, চার, পাঁচ ও ছয় ভাগে কুরবানি করা জায়েজ। (মুসলিম ১৩১৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭)। উটের বয়স পাঁচ বছর হতে হবে। গরু ও মহিষের বয়স দুই বছর হতে হবে। (মুয়াত্তা মালেক ৭৫৪)

৫. গোশত খাওয়ার নিয়তে কুরবানি করলে

যদি কেউ আল্লাহ তাআলার হুকুম পালনের উদ্দেশ্য ছাড়া কুরবানি না করে শুধু গোশত খাওয়ার নিয়তে কুরবানি করে তাহলে তার কুরবানি সহিহ হবে না। তাকে অংশীদার বানালে শরিকদের কুরবানিও কবুল হবে না। (বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৮, কাজিখান ৩/৩৪৯)

৬. অবৈধ টাকায় কুরবানি করলে

হারাম টাকা দিয়ে কেউ কুরবানি করলে তার কুরবানি আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। কেননা 'আল্লাহ তাআলা পবিত্র, তিনি শুধু পবিত্রতাই গ্রহণ করেন...।' (তিরমিজি ২৯৮৯) তাছাড়া কুরআনে হালাল সম্পদ থেকে ব্যয় করার নির্দেশ এসেছে: 'হে ঈমানদারগণ! তোমরা ব্যয় কর তোমাদের অর্জিত হালাল সম্পদ থেকে...' (সুরা বাকারা: আয়াত ২৬৭)

কুরবানি শুধু পশু জবাই নয়—এটি অন্তরের পরীক্ষা। এখানে আল্লাহ দেখেন না কার পশু কত বড় বা দামি; তিনি দেখেন কার নিয়ত কতটা বিশুদ্ধ, কার অন্তর কতটা তাকওয়ায় পরিপূর্ণ। তাই কুরবানি করার আগে নিজের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা জরুরি। যদি ইখলাস, হালাল উপার্জন এবং সুন্নাহর অনুসরণ নিশ্চিত করা যায়—তবেই কুরবানি হবে কবুলের যোগ্য।