মানুষের হৃদয় বড়ই অদ্ভুত—একদিকে আখেরাতের চিরস্থায়ী শান্তির আহ্বান, অন্যদিকে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহের টান। কখনো আমরা বুঝি, এই দুনিয়া আমাদের গন্তব্য নয়—তবুও অজান্তেই এর রঙিন ফাঁদে জড়িয়ে পড়ি। অথচ আল্লাহর পথে চলতে হলে এই মোহ থেকে নিজেকে রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় সংগ্রাম। সেই পথকে সহজ করতে আমাদের জন্য রয়েছে কুরআন ও সুন্নাহর দিকনির্দেশনা—যা হৃদয়কে জাগ্রত করে, লক্ষ্যকে পরিষ্কার করে এবং জীবনের আসল উদ্দেশ্যের দিকে ফিরিয়ে নেয়।
১. দুনিয়াকে লক্ষ্য না বানিয়ে আখেরাতকে লক্ষ্য করা
দুনিয়ার মোহ থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো—দুনিয়াকে নয়, আখেরাতকে জীবনের মূল লক্ষ্য বানানো। সব কাজ, সব পরিকল্পনা যেন হয় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। হজরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হ'তে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন— مَنْ كَانَتِ الآخِرَةُ هَمَّهُ جَعَلَ اللهُ غِنَاهُ فِي قَلْبِهِ وَجَمَعَ لَهُ شَمْلَهُ، وَأَتَتْهُ الدُّنْيَا وَهِيَ رَاغِمَةٌ، وَمَنْ كَانَتِ الدُّنْيَا هَمَّهُ جَعَلَ اللهُ فَقْرَهُ بَيْنَ عَيْنَيْهِ، وَفَرَّقَ عَلَيْهِ شَمْلَهُ، وَلَمْ يَأْتِهِ مِنَ الدُّنْيَا إِلَّا مَا قُدِّرَ لَهُ ‘আখেরাত যার একমাত্র চিন্তা ও লক্ষ্য হয়, আল্লাহ তাআলা তার হৃদয়কে অভামুক্ত করে দেন এবং বিক্ষিপ্ত বিষয়াবলীকে সমাধান করে দেন এবং তার কাছে দুনিয়া তুচ্ছ হয়ে আসে। পক্ষান্তরে যার চিন্তা ও লক্ষ্য হয় দুনিয়া, আল্লাহ তাআলা তার দু’চোখের সামনে অভাব তুলে ধরেন, তার সমস্যা-গুলোকে বিক্ষিপ্ত করে দেন আর যতটুকু তার জন্য নির্ধারিত করে দেওয়া হয়েছে এর অতিরিক্ত দুনিয়া সে পায় না’। (তিরমিজি ২৪৬৫)
অন্য এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— مَنْ جَعَلَ الْهُمُومَ هَمًّا وَاحِدًا، هَمَّ آخِرَتِهِ، كَفَاهُ اللَّهُ هَمَّ دُنْيَاهُ، وَمَنْ تَشَعَّبَتْ بِهِ الْهُمُومُ فِي أَحْوَالِ الدُّنْيَا لَمْ يُبَالِ اللهُ فِي أَيِّ أَوْدِيَتِهَا هَلَكَ ‘যে ব্যক্তি নিজের সমস্ত চিন্তাকে এককেন্দ্রিক তথা শুধুমাত্র আখেরাতের জন্য করে নেবে, আল্লাহ তার দুনিয়ার যাবতীয় মাক্বছাদ পূরণ করে দিবেন। অপরদিকে যাকে দুনিয়ার নানা দিক ব্যতিব্যস্ত করে রাখবে, তার জন্য আল্লাহর কোনো পরওয়াই নেই, চাই সে কোনো জঙ্গলে (যে কোন অবস্থায়) ধ্বংস হোক না কেন।’ (ইবনু মাজাহ ২৫৭, মিশকাত ২৬৩)
২. বেশি বেশি নেক আমল করা
মানুষের প্রকৃত সম্পদ তার আমল। দুনিয়ার সবকিছু একদিন ছেড়ে যেতে হবে—থেকে যাবে শুধু নেক কাজ। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে, আল্লাহ বলেন— يَا ابْنَ آدَمَ تَفَرَّغْ لِعِبَادَتِي، أَمْلَأْ صَدْرَكَ غِنًى، وَأَسُدَّ فَقْرَكَ، وَإِنْ لَمْ تَفْعَلْ، مَلَأْتُ صَدْرَكَ شُغْلًا، وَلَمْ أَسُدَّ فَقْرَكَ ‘হে আদম সন্তান! আমার ইবাদতের জন্য সময় বের কর। আমি তোমার অন্তরকে ঐশ্বর্যমন্ডিত করব এবং তোমার দরিদ্রতা দূর করে দেব। যদি তুমি তা না কর, তাহলে আমি তোমার অন্তরকে ব্যস্ততা দিয়ে ভরে দেব এবং তোমার দরিদ্রতা দূর করব না’। (তিরিমিজি ২৪৬৬, ইবনু মাজাহ ৪১০৭, ইবনে হিববান ৩৯৩)
হজরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন— يَتْبَعُ الْمَيِّتَ ثَلاَثَةٌ، فَيَرْجِعُ اثْنَانِ وَيَبْقَى مَعَهُ وَاحِدٌ، يَتْبَعُهُ أَهْلُهُ وَمَالُهُ وَعَمَلُهُ، فَيَرْجِعُ أَهْلُهُ وَمَالُهُ، وَيَبْقَى عَمَلُهُ ‘মৃত ব্যক্তিকে অনুসরণ করে (তার কবর পর্যন্ত যায়) তিনটি বস্ত্ত। দুটি ফিরে আসে, আর একটি তার সঙ্গে থেকে যায়। তাকে অনুসরণ করে তার পরিবার, তার সম্পদ ও তার আমল। অতঃপর (দাফন কার্য শেষে) তার পরিবার ও মাল-সম্পদ ফিরে চলে আসে। শুধু আমল তার সঙ্গে থেকে যায়।’ (বুখারি ৬৫১৪, মুসলিম ২৯৬০, মিশকাত ৫২৬৭)
এই হাদিস থেকে সুস্পষ্ট হলো যে, দুনিয়ার সহায়-সম্পদ পরিবার-পরিজন অর্থকরি পরকালে কোন কাজেই আসবে না। কেবল আমল ব্যতীত। সুতরাং আমাদেরকে আমলের খাতা সমৃদ্ধ করতে হবে। মহান আল্লাহর ইবাদতে বেশি বেশি মনোনিবেশ করতে হবে। দুনিয়াবী কোন বিষয়ে নয় প্রতিযোগিতা করতে হবে নেকির কাজে। সত্য, সুন্দর ও কল্যাণকর কাজে।
৩. মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করা
মৃত্যু এমন এক সত্য, যা থেকে পালানোর কোনো সুযোগ নেই। এটি স্মরণ করলে দুনিয়ার অহংকার ভেঙে যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন— كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ‘প্রত্যেক আত্মাই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে।’ (সুরা আল-ইমরান: ১৮৫)। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন— أَيْنَمَا تَكُونُوا يُدْرِكْكُمُ الْمَوْتُ وَلَوْ كُنْتُمْ فِي بُرُوجٍ مُشَيَّدَةٍ ‘তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, মৃত্যু তোমাদের গ্রাস করবেই, যদিও তোমরা কোনো সুরক্ষিত দুর্গে অবস্থান করো।’ (সুরা নিসা: আয়াত ৭৮)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন— أَكْثِرُوا ذِكْرَ هَاذِمِ اللَّذَّاتِ ‘তোমরা বেশি বেশি দুনিয়ার স্বাদ বিনষ্টকারী মৃত্যুকে স্মরণ কর।’ (তিরমিজি, নাসাঈ, ইবনু মাজাহ, মিশকাত ১৬০৭)
৪. কবরের বাস্তবতা কল্পনা করা
কবর হচ্ছে আখেরাতের প্রথম ধাপ। এখানে সফলতা মানেই পরবর্তী পথ সহজ। তাই কল্পনা করুন কবরের বিভীষিকাময় পরিস্থিতির কথা। হজরত ওসমান (রা.) যখন কবরের পাশে যেতেন তখন অঝোর নয়নে কাঁদতেন। সাঙ্গীরা জিজ্ঞাসা করল, আপনি জান্নাত-জাহান্নামের কথা শুনে কাঁদেন না, অথচ কবরের পাশে দাঁড়িয়ে এভাবে কাঁদেন কেন? তিনি বললেন, দেখো! রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— إِنَّ الْقَبْرَ أَوَّلُ مَنَازِلِ الْآخِرَةِ، فَإِنْ نَجَا مِنْهُ، فَمَا بَعْدَهُ أَيْسَرُ مِنْهُ، وَإِنْ لَمْ يَنْجُ مِنْهُ، فَمَا بَعْدَهُ أَشَدُّ مِنْهُ ‘কবর হচ্ছে পরকালের প্রথম মনজিল বা ঘাঁটি। কেউ যদি এখান থেকে মুক্তি পায়, তাহলে পরবর্তী ঘাঁটিগুলো তার জন্য সহজ হবে। আর যদি কেউ কবরে মুক্তি না পায়, তাহলে পরবর্তী ঘাঁটিগুলো তার জন্য কঠিন হয়ে যাবে’। (ইবনু মাজাহ ৪২৬৭, আহমাদ ৪৫৪)
৫. হাশরের ময়দানের ভয়াবহতা স্মরণ করা
সেদিন কেউ কারো উপকারে আসবে না—সবাই ব্যস্ত থাকবে নিজের হিসাব নিয়ে। আমাদের নবী মুহাম্মাদ (সা.) ব্যতীত অন্যান্য নবী-রাসূলগণও যেদিন ‘রাব্বি নাফসি, রাব্বি নাফসি’ ‘প্রভু আমাকে বাঁচাও, প্রভু আমাকে বাঁচাও’ বলে প্রার্থনা করতে থাকবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন— يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ إِلَّا مَنْ أَتَى اللهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ ‘সেদিন ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি কোন কাজে আসবে না। সেদিন ভাগ্যবান হবে কেবল সে, যে আল্লাহর কাছে আসবে বিশুদ্ধ আত্মা নিয়ে।’ (সুরা শু‘আরা: আয়াত ৮৮-৮৯) অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন— يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ، وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ، وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ، لِكُلِّ امْرِئٍ مِنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنٌ يُغْنِيهِ ‘সেদিন মানুষ পালাবে তার ভাই থেকে, তার মা ও বাপ থেকে এবং তার স্ত্রী ও সন্তান থেকে। প্রত্যেক মানুষের সেদিন এমন অবস্থা হবে যে, সে নিজেকে নিয়েই বিভোর থাকবে।’ (সুরা আবাসা: আয়াত ৩৪-৩৭) এই কঠিন বিপদ মুহূর্তে মুক্তির কথা চিন্তা করলে দুনিয়ার মহববত ত্যাগ করা সম্ভব হবে ইনশাআল্লাহ।
৬. জবাবদিহিতার কথা মনে রাখা
কিয়ামতের দিন প্রতিটি কাজের হিসাব দিতে হবে—কিছুই গোপন থাকবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন— الْيَوْمَ نَخْتِمُ عَلَى أَفْوَاهِهِمْ وَتُكَلِّمُنَا أَيْدِيهِمْ وَتَشْهَدُ أَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ ‘আজ আমরা তাদের মুখে মোহর মেরে দেব। আমাদের সঙ্গে কথা বলবে তাদের হাত ও সাক্ষ্য দিবে তাদের পা, তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে।’ (সুরা ইয়াসিন: আয়াত৬৫) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন— لَا تَزُولُ قَدَمُ ابْنِ آدَمَ يَوْمَ القِيَامَةِ مِنْ عِنْدِ رَبِّهِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ خَمْسٍ، عَنْ عُمُرِهِ فِيمَ أَفْنَاهُ، وَعَنْ شَبَابِهِ فِيمَ أَبْلَاهُ، وَمَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ وَفِيمَ أَنْفَقَهُ، وَمَاذَا عَمِلَ فِيمَا عَلِمَ ‘কিয়ামতের দিন স্বীয় প্রতিপালকের সামনে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কোন আদম সন্তান তার পা নড়াতে পারবে না। ১. জীবন কীভাবে অতিবাহিত করেছ? ২. যৌবন কীভাবে নিঃশেষ করেছ? ৩. ধন-সম্পদ কীভাবে উপার্জন করেছ? ৪. কোন পথে সম্পদ ব্যয় করেছ? ৫. ইলম অনুযায়ী আমল করেছ কি-না?’ (তিরমিজি ২৪১৬, মিশকাত ৫১৯৭) সুতরাং প্রত্যেকটি কর্মের হিসাব সেদিন দিতে হবে। কোন কিছুই গোপন করা যাবে না। দুনিয়াতে মিথ্যা বলে পার পাওয়া যায়। কিন্তু সেখানে জবান বন্ধ করে দিয়ে হাত, পা, চামড়ার সাক্ষ্য নেওয়া হবে। এতএব এই জবাবদিহীতার কথা মাথায় থাকলে কোন মুমিন বান্দাকে দুনিয়ার মোহ আল্লাহর ইবাদত থেকে গাফেল রাখতে পারবে না।
৭. অবিশ্বাসীদের জৌলুস দেখে প্রতারিত না হওয়া
দুনিয়ার বাহ্যিক চাকচিক্য অনেক সময় মানুষকে বিভ্রান্ত করে। আল্লাহ স্বীয় রাসুলকে (সা.) বলেন— لَا يَغُرَّنَّكَ تَقَلُّبُ الَّذِينَ كَفَرُوا فِي الْبِلَادِ، مَتَاعٌ قَلِيلٌ ثُمَّ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَبِئْسَ الْمِهَادُ ‘দেশ-বিদেশে অবিশ্বাসীদের অবাধ বিচরণ যেন তোমাকে ধোঁকায় না ফেলে। এগুলি যৎসামান্য ভোগ্যবস্ত্ত মাত্র। এরপর ওদের ঠিকানা হলো জাহান্নাম। আর কতইনা নিকৃষ্ট সেই ঠিকানা।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৯৬-১৯৭)
দুনিয়া আমাদের জন্য পরীক্ষার স্থান— এখানে আমরা অতিথি মাত্র। এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের মোহে পড়ে যদি আমরা চিরস্থায়ী আখেরাতকে ভুলে যাই, তবে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় ক্ষতি। কিন্তু সুখবর হলো— আল্লাহ আমাদের পথ দেখিয়েছেন, আমাদের সতর্ক করেছেন, আমাদের জন্য সহজ পথ রেখেছেন। আসুন, আমরা নিজেদের হৃদয়কে প্রশ্ন করি— আমাদের ভালোবাসা কোথায়? আমাদের লক্ষ্য কী? যদি আমরা আজ থেকেই দুনিয়ার মোহ কমিয়ে আখেরাতের পথে হাঁটা শুরু করি, তবে ইনশাআল্লাহ একদিন সেই চিরশান্তির ঠিকানায় পৌঁছাতে পারব। আল্লাহ আমাদের সবাইকে দুনিয়ার মোহ থেকে হেফাজত করুন এবং আখেরাতমুখী জীবন দান করুন— আমিন।



