ছবি: এএফপি
মানুষ যদি নিজের মৃত্যুর সময় সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে জানতে পারত, তবে হয়তো অনেকেই ভাবত—এখন কিছুদিন পাপ করি, মৃত্যুর আগে তওবা করে নেব। আল্লাহ তো পরম দয়ালু, তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তওবা কবুল করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। জীবন অনিশ্চয়তায় ভরা। আজ আমরা যাদের সঙ্গে কথা বলছি, কাল হয়তো তাদের কেউ থাকবে না অথবা আমরা নিজেরাই থাকব না। তবে আমাদের জীবনের নিশ্চয়তা না থাকলেও একটি বিষয়ের নিশ্চয়তা আছে—দয়াময় আল্লাহ আমাদের জন্য তওবার এমন এক দরজা খোলা রেখেছেন, যা প্রাণ কণ্ঠে পৌঁছে যাওয়ার আগপর্যন্ত কখনো বন্ধ হয় না।
তওবা কী
তওবা শব্দের অর্থ ফিরে আসা। অর্থাৎ পাপ ও অবাধ্যতার পথ ছেড়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা। নিজের কৃতকর্মের জন্য আন্তরিকভাবে লজ্জিত হওয়া, ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে সেই পাপ আর না করার দৃঢ় সংকল্প করাই হলো প্রকৃত তওবা। আমরা আল্লাহর রহমত থেকে কখনো নিরাশ হব না। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি পাপ করে কিংবা নিজের প্রতি জুলুম করে, অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু পাবে।’ (সুরা আন-নিসা, আয়াত: ১১০) তিনি আরও বলেন, ‘বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা জুমার, আয়াত: ৫৩)
তওবা করেও কেন আমরা একই পাপে ফিরে যাই
০২ মে ২০২৬
তওবা কীভাবে করবেন
তওবা মানে আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা। প্রথমে পাপের জন্য অন্তরে সত্যিকারের অনুতাপ থাকতে হবে। তারপর সেই পাপ সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দিতে হবে। ভবিষ্যতে আর না করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এরপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে দোয়া করতে হবে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সুন্দরভাবে অজু করলে মানুষের শরীর থেকে পাপ ঝরে যায়, এমনকি নখের নিচ থেকেও।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৪৪) পাপ করার পর অজু করে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা মুস্তাহাব। হাদিসে এসেছে, ‘যদি কোনো বান্দা পাপ করে, অতঃপর সুন্দরভাবে পবিত্রতা অর্জন করে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, তবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৫২১)
তওবার দোয়া
আল্লাহ আমাদের ক্ষমা চাওয়ার ভাষাও শিখিয়ে দিয়েছেন।
কোরআনে বর্ণিত তওবার দোয়া
নবী আদম ও হাওয়ার দোয়া: ‘হে আমাদের রব, আমরা নিজেদের ওপর জুলুম করেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং দয়া না করেন, তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ২৩) ইউনুস (আ.)-এর দোয়া: ‘আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আপনি পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ৮৭) মুমিনদের দোয়া: ‘হে আমাদের রব! আমরা ইমান এনেছি। অতএব আমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করুন এবং আমাদের জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা করুন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬) অন্য আয়াতে আছে: ‘হে আমাদের রব, আমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করুন, আমাদের ত্রুটিগুলো দূর করুন এবং নেককারদের সঙ্গে আমাদের মৃত্যু দান করুন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯৩)
অজু শেষে তওবার জন্য দোয়া
‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু। আল্লাহুম্মাজ আলনি মিনাত তাওয়াবিনা ওয়াজ আলনি মিনাল মুতাতহ্হিরীন।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৫৫)
দোয়া কবুলের কিছু শর্ত ও আদব
২৩ ডিসেম্বর ২০২৫
হাদিসে বর্ণিত ইস্তিগফার
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিষ্পাপ হওয়া সত্ত্বেও প্রচুর তওবা করতেন। পাপ মাফের জন্য তিনি এই দোয়াটি পড়তে বলতেন: ‘আস্তাগফিরুল্লাহাল্লাযি লা ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুমু ওয়া আতুবু ইলাইহি।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৫১৭) ক্ষমা প্রার্থনার শ্রেষ্ঠ দোয়া হলো ‘সাইয়িদুল ইস্তিগফার’। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে সকালে বা রাতে এই দোয়া পড়বে এবং এরপর মৃত্যুবরণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩০৬)
নবীজির শেখানো দোয়া
হজরত আয়েশা (রা.)–কে নবীজি এই দোয়াটি শিখিয়েছিলেন, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি’ (হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করে দিন)। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫১৩)
তওবা কবুল হওয়ার লক্ষণ
তওবা কবুল হওয়ার জন্য তিনটি শর্ত জরুরি: পাপ বর্জন করা, অনুতপ্ত হওয়া এবং ভবিষ্যতে না করার সংকল্প করা। যদি মানুষের হক নষ্ট করা হয়, তবে তা আগে আদায় বা মিটিয়ে নিতে হবে। মূল লক্ষণ: অনেক আলিম বলেন, তওবা কবুল হওয়ার বড় লক্ষণ হলো জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসা—যেমন নেক আমল বৃদ্ধি পাওয়া এবং পাপের প্রতি অনীহা তৈরি হওয়া। আমরা দুর্বল বলে বারবার ভুল করি, কিন্তু আল্লাহ সেই বান্দাকেই ভালোবাসেন যে বারবার ফিরে আসে। আল্লাহ বলেন, ‘তবে যারা তওবা করে, ইমান আনে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের পাপসমূহকে নেকি দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন।’ (সুরা ফুরকান, আয়াত: ৭০) রাসুল (সা.) বলেছেন, মরুভূমিতে খাদ্য-পানীয়সহ উট হারিয়ে ফিরে পাওয়া ব্যক্তির চেয়েও আল্লাহ তাঁর বান্দার তওবায় বেশি আনন্দিত হন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৪৭)
শেষ কথা
তাই অবহেলায় সময় নষ্ট না করে আজই ফিরে আসি প্রতিপালকের দিকে। তিনি কেবল গফুর বা গফফার নন, তিনি ‘আফুউ’ (পরম ক্ষমাশীল)। তিনি চাইলে পাপ আমলনামা থেকেও মুছে দেন। ইসমত আরা : শিক্ষক ও লেখক
কেন আমরা ভুলে যাই? ইসলাম কী বলে
০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রথম আলোর খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



