দুঃস্বপ্ন ও ভয় থেকে বাঁচতে নবীজির শেখানো দোয়া
মানুষের জীবনে এমন অনেক মুহূর্ত আসে, যখন নির্জনতা তাকে অস্থির করে তোলে, রাতের অন্ধকারে অজানা ভয় হৃদয়কে গ্রাস করে কিংবা ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন তাকে আতঙ্কিত করে তোলে। কখনো আবার অকারণ উদ্বেগ, অশান্তি ও নেতিবাচক চিন্তা মনকে ভারাক্রান্ত করে রাখে। এমন পরিস্থিতিতে একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হলো আল্লাহ তাআলা।
ইসলাম শুধু ইবাদতের শিক্ষা দেয়নি; বরং মানুষের ভয়, দুশ্চিন্তা, মানসিক অস্থিরতা এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আত্মরক্ষার পথও শিখিয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তার সাহাবিদের এমন একটি দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন, যা ভয়, দুঃস্বপ্ন এবং অশুভ প্রভাব থেকে সুরক্ষা লাভের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম।
নির্জনতা ও ভয়ের মুহূর্তে নবীজির শেখানো শক্তিশালী দোয়া
হজরত আয়েশা (রা.) এবং হজরত আমর ইবনে শুয়াইব (রহ.) তার পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের নির্জনতা, একাকিত্ব কিংবা ঘুমের মধ্যে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে এই দোয়া পাঠ করতে শিক্ষা দিতেন—
أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ غَضَبِهِ وَعِقَابِهِ وَشَرِّ عِبَادِهِ وَمِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ وَأَنْ يَحْضُرُونِ
উচ্চারণ: ‘আ‘উজু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন গাদাবিহি ওয়া ‘ইকাবিহি ওয়া শাররি ‘ইবাদিহি, ওয়া মিন হামাযাতিশ শাইয়াত্বিনি ওয়া আই-ইয়াহদুরূন।’
অর্থ: ‘আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালিমাসমূহের মাধ্যমে আশ্রয় প্রার্থনা করছি তার ক্রোধ ও শাস্তি থেকে, তার বান্দাদের অনিষ্ট থেকে এবং শয়তানদের কুমন্ত্রণা ও তাদের উপস্থিতি থেকে।’ (আবু দাউদ ৩৮৯৩, তিরমিজি ৩৫২৮)
কেন এই দোয়া এত গুরুত্বপূর্ণ?
এই সংক্ষিপ্ত অথচ অর্থবহ দোয়াটির মধ্যে একজন মুমিনের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো একত্রিত হয়েছে। এখানে আল্লাহর ক্রোধ ও শাস্তি থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে, কারণ বান্দার সবচেয়ে বড় ভয় হওয়া উচিত আল্লাহর অসন্তুষ্টি। পাশাপাশি মানুষের অনিষ্ট, শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং অদৃশ্য ক্ষতিকর প্রভাব থেকেও রক্ষা কামনা করা হয়েছে। বিশেষ করে রাতের ভয়, দুঃস্বপ্ন, একাকিত্বের আতঙ্ক কিংবা হৃদয়ের অস্থিরতার সময় এই দোয়া পাঠ করলে অন্তরে প্রশান্তি ও আল্লাহর প্রতি নির্ভরতার অনুভূতি বৃদ্ধি পায়।
মুমিনের প্রকৃত নিরাপত্তা কোথায়?
পৃথিবীর কোনো শক্তিই মানুষকে পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে পারে না। প্রকৃত নিরাপত্তা একমাত্র আল্লাহর কাছেই রয়েছে। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) সব ধরনের ভয় ও বিপদের মুহূর্তে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনার শিক্ষা দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَقُلْ رَبِّ أَعُوذُ بِكَ مِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ وَأَعُوذُ بِكَ رَبِّ أَنْ يَحْضُرُونِ
‘আর বলুন, হে আমার রব! আমি আপনার আশ্রয় চাই শয়তানদের কুমন্ত্রণা থেকে। এবং হে আমার রব! আমি আপনার আশ্রয় চাই, তারা যেন আমার কাছে উপস্থিত না হয়।’ (সুরা আল-মুমিনুন: আয়াত ৯৭-৯৮)
এই আয়াতের শিক্ষার সঙ্গেও নবীজির শেখানো দোয়াটির গভীর সামঞ্জস্য রয়েছে।
জীবনের প্রতিটি ভয়, দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তার মুহূর্তে একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আল্লাহর ওপর ভরসা এবং তার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো এই দোয়া শুধু একটি আমল নয়; বরং এটি অন্তরের প্রশান্তি, আত্মিক নিরাপত্তা এবং শয়তানের অনিষ্ট থেকে সুরক্ষা লাভের একটি মহামূল্যবান উপহার।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) এই দোয়াটির প্রতি এতটাই গুরুত্ব দিতেন যে তিনি তার সাবালক সন্তানদের এটি মুখস্থ করাতেন এবং যারা নাবালক (ছোট শিশু, যারা পড়তে পারে না) তাদের জন্য এটি লিখে গলায় ঝুলিয়ে দিতেন।’ (তিরমিজি ৩৫২৮, আবু দাউদ: ৩৮৯৩)
তাই নির্জনতা, ভয়, দুঃস্বপ্ন কিংবা অস্থিরতার মুহূর্তে এই দোয়াটি নিয়মিত পাঠ করার অভ্যাস গড়ে তুলি। কারণ যে ব্যক্তি আল্লাহর আশ্রয়ে থাকে, তার জন্য ভয়ও দুর্বল হয়ে যায়, আর অন্ধকারের মধ্যেও প্রশান্তির আলো জ্বলে ওঠে।



