মায়ের প্রতি অনুগত সন্তানের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন নবীজি
পৃথিবীতে সন্তানের জন্য সবচেয়ে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার নাম ‘মা’। সন্তানের মুখে এক চিলতে হাসি ফোটাতে তিনি নিজের সুখ বিসর্জন দেন, রাতের ঘুম হারাম করেন, জীবনের অসংখ্য কষ্ট নীরবে বরণ করে নেন। একজন মানুষ যখন পৃথিবীর আলো দেখে, তখন তার প্রথম আশ্রয় হয় মায়ের কোল; আর বড় হওয়ার প্রতিটি ধাপে মায়ের ভালোবাসা, ত্যাগ ও দোয়া তাকে আগলে রাখে।
এ কারণেই ইসলাম মা-বাবার প্রতি সদাচরণকে ইবাদতের পরেই সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে। বিশেষ করে মায়ের মর্যাদাকে এমন উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করা হয়েছে, যার তুলনা অন্য কোনো মানবিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে খুঁজে পাওয়া কঠিন। কুরআন ও হাদিসে মায়ের সম্মান, তার হক আদায় এবং তার প্রতি উত্তম আচরণের ব্যাপারে বারবার গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এমনকি রাসুলুল্লাহ (সা.) মায়ের প্রতি অনুগত ও শ্রদ্ধাশীল সন্তানের জন্য জান্নাতের সুসংবাদও দিয়েছেন।
মায়ের ত্যাগের স্বীকৃতি দিয়েছে পবিত্র কুরআন
মায়ের কষ্ট, ত্যাগ এবং সন্তানের প্রতি তার অবদানের কথা আল্লাহ তাআলা নিজেই কুরআনে উল্লেখ করেছেন। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ ۖ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَىٰ وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ
‘আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট সহ্য করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছে এবং তার দুধ ছাড়ানো হয়েছে দুই বছরে। অতএব আমার এবং তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।’ (সুরা লোকমান: আয়াত ১৪)
গর্ভধারণ, প্রসব বেদনা, দুগ্ধপান করানো এবং সন্তানের লালন-পালনের অসংখ্য কষ্ট একজন মা অক্লান্তভাবে সহ্য করেন। তাই ইসলামে তার মর্যাদাও অসাধারণ উচ্চতায় উন্নীত করা হয়েছে।
মায়ের কষ্টের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় আল্লাহর বাণী
মানুষ যেন তার মায়ের ত্যাগ কখনো ভুলে না যায়, সে জন্য কুরআনে আরও বলা হয়েছে—
حَمَلَتْهُ أُمُّهُ كُرْهًا وَوَضَعَتْهُ كُرْهًا
‘তার মা তাকে কষ্ট সহকারে গর্ভে ধারণ করেছে এবং কষ্ট সহকারে তাকে প্রসব করেছে।’ (সুরা আল-আহকাফ: আয়াত ১৫)
একই আয়াতে আল্লাহ তাআলা এমন এক দোয়া শিক্ষা দিয়েছেন, যা প্রতিটি সন্তানের হৃদয়ে ধারণ করা উচিত—
رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَىٰ وَالِدَيَّ
উচ্চারণ: রাব্বিক আইযি’নি আন আশকুরা নি’মাতাকাল্লাতি আনআ’মতা আলাইয়্যা ওয়া আলা ওয়ালিদাইয়্যা।
অর্থ: ‘হে আমার রব! আমাকে সামর্থ্য দিন, যাতে আমি আপনার সেই নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায় করতে পারি, যা আপনি আমার এবং আমার পিতা-মাতার প্রতি দান করেছেন।’ (সুরা আল-আহকাফ: আয়াত ১৫)
মা-বাবা: জান্নাত ও জাহান্নামের দরজা
রাসুলুল্লাহ (সা.) মা-বাবার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন—
الْوَالِدُ أَوْسَطُ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ
‘পিতা-মাতা তোমার জন্য জান্নাত ও জাহান্নামের মাধ্যম।’ (ইবনে মাজাহ ৪২১)
অর্থাৎ মা-বাবার সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে একজন মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে, আবার তাদের অসন্তুষ্টির কারণে ক্ষতিগ্রস্তও হতে পারে।
মমতার দৃষ্টিতেই হজের সওয়াব
মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা ও সম্মানের গুরুত্ব বোঝাতে হাদিসে অসাধারণ একটি সুসংবাদ এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
مَا مِنْ وَلَدٍ بَارٍّ يَنْظُرُ إِلَى وَالِدَيْهِ نَظْرَةَ رَحْمَةٍ إِلَّا كَانَ لَهُ بِكُلِّ نَظْرَةٍ حَجَّةٌ مَبْرُورَةٌ
‘কোনো অনুগত সন্তান যখন তার মা-বাবার দিকে স্নেহ ও অনুগ্রহের দৃষ্টিতে তাকায়, তখন প্রতিটি দৃষ্টির বিনিময়ে আল্লাহ তাকে একটি কবুল হজের সওয়াব দান করেন।’ (বায়হাকি ৭৯০৫)
ইসলামে মায়ের মর্যাদা কেন এত বেশি?
ইসলাম মায়ের মর্যাদাকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا ۖ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا
‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তার সঙ্গে কাউকে শরিক কর না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে উত্তম আচরণ কর।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ৩৬)
এ আয়াতে আল্লাহর ইবাদতের পরপরই পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা তাদের মর্যাদার গুরুত্ব স্পষ্ট করে।
‘তোমার মা, তোমার মা, তোমার মা’—নবীজির ঐতিহাসিক ঘোষণা
এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন—‘আমার উত্তম আচরণ পাওয়ার সবচেয়ে বেশি অধিকার কার?’
রাসুলুল্লাহ (সা.) উত্তর দিলেন—أُمُّكَ ‘তোমার মা।’
লোকটি আবার জিজ্ঞাসা করল, ‘তারপর কে?’ তিনি বললেন—أُمُّكَ ‘তোমার মা।’
সে তৃতীয়বার জিজ্ঞাসা করলে তিনি আবারও বললেন—أُمُّكَ ‘তোমার মা।’
চতুর্থবার প্রশ্ন করলে তিনি বললেন—ثُمَّ أَبُوكَ ‘এরপর তোমার পিতা।’ (বুখারি ৫৯৭১, মুসলিম ২৫৪৮)
এই হাদিস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, সন্তানের ওপর মায়ের অধিকার ও মর্যাদা কতটা মহান।
মায়ের প্রতি দায়িত্ব ও ভালোবাসা
মা শুধু একজন অভিভাবক নন; তিনি সন্তানের জীবনের প্রথম শিক্ষক, প্রথম বন্ধু এবং সবচেয়ে বড় দোয়ার ভাণ্ডার। তার ত্যাগ, ভালোবাসা ও মমতার প্রতিদান কোনো সন্তানই পূর্ণভাবে দিতে পারে না। তাই ইসলাম মায়ের সম্মান ও তার হক আদায়ের ব্যাপারে এত বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
যে সন্তান মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তার সেবা করে, তার মন জয় করতে সচেষ্ট থাকে এবং তার দোয়া অর্জনের চেষ্টা করে, সে প্রকৃত অর্থেই সৌভাগ্যবান। কারণ মায়ের সন্তুষ্টির মধ্যেই রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি, আর মায়ের দোয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার অমূল্য চাবিকাঠি।
তাই আসুন, যতদিন মা আমাদের মাঝে আছেন, ততদিন তার প্রতি ভালোবাসা, সম্মান ও দায়িত্ব পালনে কোনো অবহেলা না করি। আর যাদের মা পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন, তারা যেন তার জন্য নিয়মিত দোয়া, সদকা ও নেক আমলের মাধ্যমে ভালোবাসার ঋণ শোধ করার চেষ্টা করেন।



