কে’নান নামে সবাই চিনলেও তাঁর আসল নাম কেইনান আবদি ওয়ারসামে। সোমালিয়ায় জন্ম নেওয়া এই শিল্পী বড় হয়েছেন গান আর কবিতার মধ্যে। তাঁর দাদা ছিলেন বিখ্যাত কবি, আর চাচি গাইতেন গান। জন্মের পরপরই বাবা পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে। ট্যাক্সি চালিয়ে যা আয় করতেন, তা দিয়ে চলত সংসার।
শৈশবের দুঃসহ স্মৃতি
১২ বছর বয়সেই শুরু হয় সোমালিয়ার গৃহযুদ্ধ। চোখের সামনে গুলিতে তিন বন্ধুর প্রাণ যেতে দেখেছেন কে’নান। স্কুলের মাঠে খেলতে গিয়ে একদিন ভুল করে গ্রেনেডও তুলে নিয়েছিলেন হাতে। ভাগ্যের জোরে সেদিন বেঁচে ফিরেছিলেন। এরপরই কে’নানের মা সিদ্ধান্ত নেন, পুরো পরিবার নিয়ে নিউইয়র্কে চলে যাবেন।
শরণার্থী জীবন
১৩ বছর বয়সে শরণার্থী হয়ে নিউইয়র্কে পাড়ি জমান কে’নান ও তাঁর পুরো পরিবার। এক বছর পর সেখান থেকে চলে যান কানাডার টরন্টোর অন্টারিওতে, যেখানে এখনো বাস করছেন তিনি। কানাডায় আসার পর থেকেই নিজে নিজে ইংরেজি রপ্ত করেন, ধীরে ধীরে যোগ দেন ব্যান্ডে। গানের সুরেই বলতে থাকেন সোমালিয়ানদের দুঃখ-কষ্টের গল্প। সেখান থেকেই সোমালিয়ার যুদ্ধবিরতির অন্যতম বড় মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। নিয়মিত জাতিসংঘের আয়োজনে পারফর্ম ও যুদ্ধবিরতির জন্য আহ্বান জানাতে দেখা যায় তাঁকে।
গানের জগতে যাত্রা
২০০২ সালে মুক্তি পায় তাঁর প্রথম অ্যালবাম। তবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে যান দ্বিতীয় অ্যালবাম দিয়ে, যা মুক্তি পায় ২০০৮ সালে। সেই অ্যালবামেরই একটি গান ছিল ‘ওয়েভিং ফ্ল্যাগ’। ২০১০ ফুটবল বিশ্বকাপে সবার মুখে মুখে ছিল এই গান। দেড় দশকের বেশি পার হয়ে গেলেও ফুটবলের গান বললে ‘ওয়েভিং ফ্ল্যাগ’ মাথায় বেজে ওঠে। অথচ গানটি ফুটবলের জন্য লেখা কোনো গানই ছিল না। বরং গানটি ছিল কে’নানের ‘ট্রুবাদো’ অ্যালবামের গান। ২০০৮ সালে মুক্তি পাওয়া গানটি কে’নান লিখেছিলেন জন্মভূমি সোমালিয়ার যুদ্ধ-বিগ্রহ ও সাধারণ মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে।
২০০৯ সালে সেই গান মনে ধরে কোকাকোলার। বিশ্বকাপ ঘিরে প্রতিবার কোকাকোলা নিজেদের একটি গান মুক্তি দেয়। কিন্তু কে’নানের গানটি এতই পছন্দ হয়েছিল যে নতুন গান তৈরি না করে বরং তাঁর সঙ্গেই হাত মেলায় কোকাকোলা। অবশেষে বিশ্বকাপের জন্য কিছুটা পরিবর্তন করে আবারও মুক্তি দেওয়া হয় গানটি। মূল কথা ঠিক রেখে গানের সুর ও কিছু পঙ্ক্তি যোগ করে বিশ্বকাপের আবহ তৈরি করে কোকাকোলা। কে’নানের গানের জনপ্রিয়তা পৌঁছে গিয়েছিল পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও ‘ওয়েভিং ফ্ল্যাগ’-এর সুরে মাতিয়েছেন সবাইকে।
বিশ্বকাপ–পরবর্তী সাফল্য
বিশ্বকাপের তুমুল জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়েছেন কে’নান। ২০১০ সালে জুনো অ্যাওয়ার্ডস, ২০১২ ও ২০১৭ সালে এমটিভি অ্যাওয়ার্ড ও ২০২৪ সালে গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। এমনকি ২০২৪ সালে ‘মাদার মাদার’ নামে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমাও পরিচালনা করেছেন তিনি। সেই সিনেমার জন্যও টরন্টো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু এরপরই কে’নানের জীবনে নেমে এসেছে ঝড়। যে ঝড় দানা বেঁধেছিল জনপ্রিয়তার শিখরে থাকার সময়।
যৌন হয়রানির অভিযোগ
২০২২ সালের শেষ দিকে কে’নানের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ আনেন এক নারী। ২০১০ সালের জুলাইয়ে কুইবেক শহরে একটি কনসার্টে ঘটে এ ঘটনা। সেই নারীও একজন সংগীতশিল্পী। ২০২২ সালে মন্ট্রিয়লে করা সেই অভিযোগ আমলে নিয়ে ২০২৪ সালে মামলা হয়। এর পর থেকে অনেকটা নির্বাসনে আছেন কে’নান। যদিও আদালতে কে’নান দাবি করেছেন, তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ। কিন্তু অভিযোগ আসার পর থেকে নিজেকে গানের দুনিয়া থেকে একরকম সরিয়ে রেখেছেন। এ কারণে গত দুই বছরে তাঁকে জনসমক্ষে একেবারেই দেখা যায়নি। সেই মামলা এখনো আদালতে বিচারাধীন।



