ভক্তের সঙ্গে গঞ্জালো হিগুয়েইন। এক্সপরনে সাদা ট্যাংক টপ, ঢিলেঢালা নীল শর্টস আর পায়ে পর্যটকদের চিরচেনা ধাঁচের স্যান্ডেল। মাথায় পাতলা চুল আর মুখে দীর্ঘ ঘন দাঁড়ি মিলিয়ে চেহারায় বয়স্কের ছাপ। ক্রীড়াসামগ্রীর দোকানের ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে কেউ হয়তো চিনতেই পারেননি। আবার চিনলেও খুব একটা পাত্তা দেননি।
ছবি ভাইরাল
তবে এগিয়ে গেলেন এক তরুণ, তুললেন ছবি। সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট হতেই ‘ভাইরাল’। অনেকেই বিস্মিত, কেউ বলছেন ‘এতটা বদলে গেলেন!’। কেউ আবার অবাক তাঁর সাধারণ, একেবারে অগোছালো পোশাক দেখে। কেউ কেউ স্মরণ করলেন তাঁর অতীতের দুর্দান্ত কোনো গোল দিয়ে, কেউ আবার স্মরণ করলেন তাঁর আলোচিত গোল মিসও! মানুষটির নাম গঞ্জালো হিগুয়েইন।
অবসর পরবর্তী জীবন
২০২২ সালে ফুটবল থেকে অবসরের পর এই আর্জেন্টাইন একরকম নীরব, আড়ালের জীবন বেছে নিয়েছেন। না, লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যাননি, ফুটবলও ছেড়ে দেননি; বরং এ সময়ে সবচেয়ে আলোচিত ক্লাবগুলোর একটি ইন্টার মায়ামিতে কাজ করেন। লিওনেল মেসি তাঁর ক্যারিয়ারের বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িয়ে থাকা কয়েকজনকে মায়ামিতে নিয়ে গেছেন। কিন্তু হিগুয়েইন সেই কাতারের নন। ২০২২ সালে ডেভিড বেকহামদের ক্লাবটি থেকে ফুটবলের বুটজোড়া তুলে রাখার ঘোষণা দিয়েছিলেন। এখন আছেন দলটির নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের গড়ে তোলার দায়িত্বে, পদবি ‘প্লেয়ার ডেভেলপমেন্ট কোচ’।
গণমাধ্যমে অনুপস্থিতি
তবে মায়ামির মতো ক্লাবে কাজ চালিয়ে গেলেও তাঁকে জনসমক্ষে খুব একটা দেখা যায় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব নন, ২০১৯ সালের পর ভেরিফায়েড এক্স হ্যান্ডলে পোস্টই নেই। খবরের শিরোনাম হয়—এমন কোনো কার্যক্রমেও নেই। অথচ রিয়াল মাদ্রিদ, নাপোলি, জুভেন্টাস, এসি মিলান আর চেলসির বড় বড় ক্লাবে খেলে একসময় ইউরোপের সবচেয়ে আলোচিত মুখগুলোর একটি ছিলেন।
বর্ণাঢ্য ক্লাব ক্যারিয়ার
আর্জেন্টাইন ক্লাব রিভারপ্লেট থেকে ২০০৭ সালে রিয়াল মাদ্রিদে নাম লেখানো হিগুয়েইন পরবর্তী এক দশক ছিলেন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় স্ট্রাইকার। রিয়ালে সাত বছরের ক্যারিয়ারে ১২১, নাপোলিতে তিন বছরে ৯১ আর জুভেন্টাসে তিন বছরে ৬৬ গোলের পথে জিতেছিলেন মোট ছয়টি লিগ শিরোপা।
জাতীয় দলের ভিলেন
তবে ৩৩৫ গোলের বর্ণাঢ্য ক্লাব ক্যারিয়ার থাকলেও আর্জেন্টিনায় এবং বিশ্বজুড়ে থাকা আর্জেন্টাইন সমর্থকদের চোখে তিনি একটি গোল করতে না পারার কারণে রীতিমতো ‘ভিলেন’। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে আর্জেন্টিনার গোলের সবচেয়ে ভালো সুযোগটি পেয়েছিলেন হিগুয়েইন। সেই সুযোগ নষ্ট করার দায়ে এখনো অনেকে তাঁকে শাপশাপান্ত করেন। ২০১৯ সালের মার্চে মাত্র ৩১ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর সময় হিগুয়েইনের কণ্ঠে ছিল অভিমানের সুর, ‘এখন আমি বাইরে থেকে দলের খেলা দেখব। আমি নিশ্চিত, এটা অনেক মানুষকে খুশি করবে। তাই এখন থেকে আমি দলে আছি কি নেই, তা নিয়ে আর দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন নেই।’
অধরা ট্রফি
শুধু ২০১৪ বিশ্বকাপই নয়, হিগুয়েইন ছিলেন আর্জেন্টিনা দলের সেই দুর্ভাগাদের একজন, যাঁরা ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকাসহ টানা তিনটি ফাইনাল খেলে ট্রফি জিততে পারেননি। ক্যারিয়ার শেষ করতে হয়েছে জাতীয় দলের জার্সিতে কিছু জেতা ছাড়াই। ওই দলেরই সবচেয়ে বড় নাম লিওনেল মেসি অধরা বিশ্বকাপটি জেতেন ২০২২ সালের ডিসেম্বরে কাতারে।
অবসরের ভাষ্য
মেসিদের বিশ্বকাপে যাওয়ার আগের মাসে অবসরের ঘোষণা দেন হিগুয়েইন। মায়ামিতে আবেগাপ্লুত হিগুয়েইন লিগ ছাড়া, অন্য কোনো বড় ট্রফি ছাড়া ক্যারিয়ারের ইতি টানা প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিরোপা, গোল বা সামগ্রিক ক্যারিয়ার নয়। মানুষের সঙ্গে মিশে যে মূল্যবোধগুলো আমি শিখেছি, সেটাই আমার প্রাপ্তি। স্ট্রাইকার হিসেবে নয়, আমি চাই মানুষ হিসেবে স্মরণীয় হতে।’
ভাইরাল হওয়া একটি ছবি আবার মনে করিয়ে দিল—আলো থেকে সরে গেলেও হিগুয়েইনের মতো নামগুলো কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায় না।



