প্রয়াত অভিনেতা ও নির্দেশক আতাউর রহমানের স্মরণসভায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট অভিনেতা আবুল হায়াত। গত শনিবার রাজধানীর বাংলাদেশ মহিলা সমিতির নীলিমা ইব্রাহিম মিলনায়তনে আয়োজিত এই স্মরণসভায় তিনি বলেন, ‘আতাউর রহমান শেষ সময়ে ভালো ছিলেন না, ভয়ে থাকতেন, ডিপ্রেশনে থাকতেন। তিনি মনে করতেন, এই বুঝি কেউ ধরবে, মারবে। এই বুঝি আমি মরে গেলাম। নানা চিন্তায় ডিপ্রেশন চরম পর্যায়ে চলে গিয়েছিল।’
মনঃক্ষুণ্ন হয়ে আবুল হায়াত আরও বলেন, ‘এখানেই আমার সবচেয়ে বড় আপত্তি। শিল্পকর্ম আমাদের পাপ, এটা কি অন্যায়, শিল্পচর্চা করে কি আমরা অপরাধী? ভয় ও শঙ্কার মধ্যে থাকতে হবে, এই বুঝি আমায় ধরল, মারল।’
১২ মে মারা যাওয়া এই নাট্যব্যক্তিত্বকে স্মরণ করতে শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় জড়ো হন তাঁর সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও প্রিয়জনেরা। প্রায় দুই ঘণ্টার স্মরণসভায় উঠে আসে তাঁর দীর্ঘ নাট্যজীবনের নানা অধ্যায়, সাংগঠনিক নেতৃত্ব, শিল্পভাবনা ও ব্যক্তিজীবনের অজানা স্মৃতি।
কৈশোরের স্মৃতি ও নাট্যচর্চা
সমাপনী বক্তব্যে আবুল হায়াতের কথায় উঠে আসে, কৈশোর থেকে আতাউর রহমানের সঙ্গে চট্টগ্রামে পড়াশোনার সময়ে পরিচয় ও একসঙ্গে নাট্যচর্চার কথা। তাঁরা সব সময় একসঙ্গে দেশের নাটককে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। আবুল হায়াত আতাউর রহমানের কাছে অভিনয়ের অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। একসঙ্গে পথ চলতে গিয়ে দুজনের মান–অভিমান হলেও পরে আবার তাঁরা একসঙ্গে কাজ করেছেন। আবুল হায়াত জানান, অভিমান হলেও তাঁকে পরে ঠিকই ডেকে কাছে টেনে নিতেন আতাউর রহমান। নাট্যাঙ্গনের বিকাশে অগ্রণী ভূমিকা ছিল প্রয়াত অভিনেতা আতাউর রহমানের।
ব্যক্তিজীবনের সাধারণতা
আবুল হায়াত বলেন, ‘ব্যক্তিগত জীবনে তিনি খুবই সাধারণ মানুষ ছিলেন। বাজার করতে পছন্দ করতেন। শান্তি নগর বাজারে বহুবার দেখা হয়েছে। বিদেশে গিয়েও তিনি কেনাকাটা করতে পছন্দ করতেন। হাসিমুখে সবার জন্য কিনতেন। আমরা সঙ্গে থাকলে নিয়ে যেতেন। প্রতিযোগিতা নিয়ে আমরা কেনাকাটা করতাম। আবার সেই মানুষটাই রবীন্দ্রনাথ, শেক্সপিয়রের বই নিয়ে মেতে থাকতেন। শেখাতেন, নাটককে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সেটা ভাবতেন। এমন একটি মানুষের এই সময়ে চলে যাওয়াটা বড় কষ্টের ব্যাপার। এখনো তো তাঁর আরও ভালো কিছু দেওয়ার ছিল। সেই আশাতেই ছিলাম আমরা।’
সমাপনী বক্তব্যে আবুল হায়াত
সমাপনী বক্তা হিসেবে আবুল হায়াত বলেন, ‘আমাকে বলা হয়েছে, সমাপনী বক্তব্য দিতে, সমাপনী কী? আতা সম্পর্কে কিছু বলে শেষ করা যায়? অসম্ভব ব্যাপার। এ কথা যুগ যুগ ধরে চলবে। কত আলোচনা, কত গবেষণা হবে। ন্যায় ও নিষ্ঠার সঙ্গে আতা ভাই নাট্যচর্চা করে গিয়েছেন। আতা ভাইকে আমরা চিরকাল মাথায় করে রাখব। নাট্যপ্রেমী মানুষের প্রাণের মধ্যে আপনি থাকবেন। আপনি অনেক ওপরে, আপনাকে কেউ সেখান থেকে নামাতে পারবে না। বাংলা ভাষাভাষী প্রতিটি বাঙালি, নাট্যপ্রেমীরা আপনাকে মাথায় তুলে রাখবে। চিরকাল আপনাকে আমরা মাথায় তুলে রাখব। নাট্যপ্রেমীরা আপনাকে মাথায় তুলে রাখবে। নাটকের কথা বললে প্রাণের স্পন্দন একটি কথাই বলবে, আতাউর, আপনাকে স্যালুট।’
সহকর্মীদের স্মৃতিচারণায় বারবার ফিরে আসে একজন প্রাণবন্ত, রসিক ও দায়িত্ববান মানুষের মুখ; যাঁর কাছে মঞ্চ ছিল আত্মার জায়গা, আর নাটক ছিল মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরির এক আজীবন সাধনা। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেকেই তাঁর মৃত্যুতে এক ‘বটগাছ’ হারানোর বেদনার কথাও তুলে ধরেন।
স্মরণসভার আয়োজন
সন্ধ্যা সাতটার দিকে শুরু হয় এই স্মরণসভা। অন্ধকার মঞ্চে আতাউর রহমানের ধারণকৃত কবিতার অংশ দিয়ে শুরু হয় স্মরণোৎসব। পরে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেন ফারহিন খান জয়িতা। এরপরই এক মিনিট নীরবতার মাধ্যমে শুরু হয় মূল স্মরণসভা। এই স্মরণসভায় শংসাবচন পাঠ করেন নাসির উদ্দীন ইউসুফ। শংসাপত্র পাঠের পর প্রদর্শিত হয় তথ্যচিত্র, যাতে তুলে ধরা হয় আতাউর রহমানের জীবন ও কর্ম, তথা দীর্ঘ প্রায় ছয় দশকের ক্যারিয়ারের নানা ঘটনা। স্মরণসভায় উপস্থিত ছিলেন আতাউর রহমানের স্ত্রী শাহিদা রহমান, স্মৃতিচারণা করেন রামেন্দু মজুমদার, মামুনুর রশীদ, সারা যাকের, কবিতার মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন লাকী ইনাম।
আরও বক্তব্য দেন নাট্যব্যক্তিত্ব মফিদুল হক, আবদুস সেলিম, কেরামত মাওলা, দেবপ্রসাদ দেবনাথ, কামাল বায়োজিদ, আতাউর রহমানের মেয়ে শর্মিষ্ঠা রহমান। এ ছাড়া পাঠাভিনয় করেন তারিক আনাম খান, কবিতা আবৃত্তি করেন গোলাম সারোয়ার, নায়লা তারান্নুন চৌধুরী, ত্রপা মজুমদার। স্মরণোৎসবে নাচের মধ্য দিয়ে এই মঞ্চসারথিকে স্মরণ করেন তামান্না রহমান। স্মরণসভায় ‘নূরুলদীনের সারাজীবন’, ‘দেওয়ান গাজীর কিস্সা’, ‘রক্তকরবী’ নাটকের কিছু অংশের ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করা হয়।
আতাউর রহমানের নাট্যজীবন
আতাউর রহমান সত্তরের দশকে ব্যস্ত হয়ে যান সাংস্কৃতিক চর্চায়। সেই সময় থেকেই তিনি একাধিক নাটকে অভিনয় করেন। তিনি নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৭২ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটকটির মাধ্যমে নাট্যনির্দেশক হিসেবে আবির্ভূত হন তিনি।
নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের এই প্রতিষ্ঠাতা ‘গডোর প্রতীক্ষায়’, ‘গ্যালিলিও’, ‘ঈর্ষা’, ‘রক্তকরবী’, ‘এখন দুঃসময়’, ‘অপেক্ষমাণ’-এর মতো নাটকগুলোও নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি সব সময়ই বলতেন, ‘অভিনয় খুবই কঠিন। তবু আমি সাহস করে এগিয়েছি। জীবনের প্রতিটি স্তরে শিখেছি।’
অভিনেতা ও নির্দেশক আতাউর রহমানের জন্ম নোয়াখালীতে। তিনি স্ত্রী, এক মেয়ে ও এক ছেলে রেখে গেছেন। ‘মঞ্চসারথি আতাউর রহমান স্মরণ অনুষ্ঠান’ শীর্ষক আলোচনাটি হয় বাংলাদেশ মহিলা সমিতির নীলিমা ইব্রাহিম মিলনায়তনে। এটি আয়োজন করে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন ও ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন নাসিরুল হক।



