রাজশাহী মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক ও একটি হত্যা মামলার আসামি মীর তারেককে গ্রেপ্তারের জন্য গত শনিবার রাতে নগরের নিউমার্কেট এলাকায় একটি বাসা ঘিরে রাখে পুলিশ। প্রায় দুই ঘণ্টা অবস্থানের পর পুলিশ সরে গেলে মীর তারেক ও তাঁর সহযোগীরা মোটরসাইকেলে করে এলাকা ত্যাগ করেন।
পুলিশের ঘেরাও ও ফেসবুক লাইভ
গতকাল শনিবার রাত পৌনে ১১টা থেকে পৌনে ১টা পর্যন্ত রাজশাহী নগরের নিউমার্কেট এলাকার স্টেশন রোডের একটি বাসার সামনে পুলিশ অবস্থান করে। বাসাটি জেলা ছাত্রদলের নেতা আসাসের। পুলিশের উপস্থিতিতে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতারা ওই বাড়ির সামনে অবস্থান নিয়ে স্লোগান দেওয়া শুরু করলে এক পর্যায়ে পুলিশ সেখান থেকে সরতে শুরু করে। দিবাগত রাত ১টা ৪৯ মিনিটে মীর তারেকের মাথায় হেলমেট পরিয়ে দলের নেতা-কর্মীরা তাঁকে মোটরসাইকেলে তুলে ওই এলাকা ত্যাগ করেন। এ সময় সাংবাদিকেরা ছবি তুলতে চাইলে নেতা-কর্মীরা মারমুখী আচরণ করেন। কাউকে ক্যামেরা বা মুঠোফোন বের করতে দেননি।
মীর তারেকের বক্তব্য
ঘটনার সময় মীর তারেক ফেসবুক লাইভে আসেন। তিনি বলেন, 'যে ঘটনা আমরা ঘটাইনি, সে ঘটনায় দায়ী করে অন্যায়ভাবে ডিবি এসে আমাদের ধরার জন্য গোটা বাড়ি ঘিরে নিয়ে মব সৃষ্টি করেছে। আমার সঙ্গে ছোট ভাই আসাস আছে। নিচে নেতা-কর্মীরা জড়ো হয়েছে।' নিজের পরিচয় দিয়ে তিনি বলেন, 'আমি স্বেচ্ছাসেবক দলের রাজশাহী মহানগরের সভাপতি, আমার ডান পা ভেঙে গেছে। রাস্তায় আজকে যদি যেতে হয়, আমাদের লাশের ওপর দিয়ে থানায় যাব। আমার লাশ যাবে, না হয় জাতীয়তাবাদের সৈনিক যাবে—বাংলা কথা।'
মীর তারেক তাঁর পায়ের ছবিও দেখান। পাশ থেকে ছাত্রদল নেতা আসাস বলেন, 'আমরা যদি এ ঘটনা ঘটাই, আমরা কোথাও যাব না।' মীর তারেক বলেন, 'দেশের আইনকে শ্রদ্ধা করি, আমরা পালাইনি। কেন পালাব? আমি মানি না এসব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।'
গুলিবিদ্ধ যুবক ও অস্ত্র উদ্ধার
এর আগে ২১ জুন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নগরের শাহমখদুম থানার ছায়ানীড় আবাসিক এলাকার একটি পাঁচতলা বাসার অসম্পূর্ণ টপ ফ্লোরে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হন। পুলিশ বলছে, অপরাধমূলক কাজের জন্য বাসাটি ভাড়া নেওয়া হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে পিস্তল ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনার সময় ওই বাসায় মীর তারেকও উপস্থিত ছিলেন। গুলিবিদ্ধ ব্যক্তির নাম ফয়সাল বাঁধন (৩০)। তিনি রাজশাহী মহানগরের সাহেববাজার এলাকার বাসিন্দা। ফয়সাল বাঁধনকে ঘটনার পর রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁর পেটে গুলি লেগেছে।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ছায়ানীড় আবাসিক এলাকায় ওই বাড়ি থেকে বিভিন্ন আলামত জব্দ করেছে। বাড়িটি থেকে ম্যাগাজিন, গুলিসহ একটি পিস্তল, গুলির খোসা, একটি ককটেল সদৃশ বস্তু এবং কিছু বিস্ফোরক জব্দ করা হয়েছে। স্থানীয় ও দলীয় একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, পাঁচতলা বাড়িটির পঞ্চম তলা ভাড়া নিয়েছিলেন মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মীর তারেক। এই বাসার কাজ এখনো শেষ হয়নি। শুধু একটি কক্ষের কাজ শেষ হয়েছিল। সেখানেই তিনি গিয়ে বসতেন। বাঁধন গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময় মীর তারেকসহ আরও কয়েকজন ছিলেন। ঘটনার পর তাঁরা চলে যান।
হত্যা মামলায় আসামি
গত বছরের ১৩ মার্চ বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে গোলাম হোসেন নামের একজন রিকশাচালক নিহত হন। এ ঘটনায় তাঁর স্ত্রী পরিবানু বাদী হয়ে ছয়জনের নাম উল্লেখ করে নগরের বোয়ালিয়া থানায় একটি মামলা করেছিলেন। ওই মামলায় মীর তারেক একজন এজাহারভুক্ত আসামি হলেও এত দিন পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেনি।
ঘটনার পরিণতি
রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত উপকমিশনার গাজিউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশ যে আসামিকে ধরার জন্য ওখানে অবস্থান নিয়েছিল, পরে জানা গেছে সেই আসামি ওখানে নেই। সে জন্য পুলিশ চলে আসে। লাইভে তো মীর তারেক বলেছে যে তাঁকে পুলিশ ধরতে গেছে—এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'ও ভুল বুঝেছিল। ওকে ধরতে গেলে পুলিশ তো তার বাড়িতে যেত।'
ঘটনার সময় নিচে অবস্থানরত স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা-কর্মীরা পুলিশের বিরুদ্ধেও নানা স্লোগান দিচ্ছিলেন। কিছুক্ষণ পর সেখানে লাঠি হাতে আসে রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) ক্রাইসিস রেসপন্স টিম (সিআরটি)। কিছুক্ষণের জন্য সেখানে থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয়। আশপাশে পুলিশের আটটি গাড়ি ছিল। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরই বদলে যেতে থাকে পরিস্থিতি। পুলিশ ধীরে ধীরে ভবনের সামনে থেকে দক্ষিণ দিকে অলোকার মোড়ের দিকে সরে যেতে থাকে। একপর্যায়ে গাড়িতে উঠে তারা চলে যায়। তখন রাত ১২টা ৫৫ মিনিট। একজন চিৎকার করে বলতে থাকেন, 'সিনেমা শেষ। সবাই চল। ভাই বের হয়ে গেছে।' পরে প্রায় অর্ধেক নেতা-কর্মী সরে যান। পুলিশ সরে যাওয়ার কিছুক্ষণ আগেই ফেসবুক লাইভ বন্ধ হয়ে যায় এবং ডিলিট করে দেওয়া হয়।
রাত ১টা ১২ মিনিটে অলোকার মোড়ের দিক থেকে একসঙ্গে হর্ন বাজাতে বাজাতে মোটরসাইকেলের একটি বহর আসে। ভবনটির সামনে তিনটি প্রাইভেট কারও এসে থামে। তারা মীর তারেককে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করে। কিন্তু যে ভবনের ছাদে তিনি লাফ দিয়ে পড়েছেন, সেটির কলাপসিবল ফটকের চাবি ছিল না। রাত ১টা ২১ মিনিটে একজন ছোট একটি হাতুড়ি আনেন। সেটির আঘাতে তালা না ভাঙায় দুই মিনিট পর আরেকজন আনেন শাবল। ভবনটির নিচতলায় দুটি সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল। একজন একটি সিসিটিভি ক্যামেরার সামনে সাদা কাপড় গুঁজে দেন। আরেকজন আরেকটি ক্যামেরার সামনে একটি হেলমেট ধরে থাকেন। অনেকক্ষণ হেলমেট ধরে থাকার পর ওই ক্যামেরার মুখটি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। কয়েক মিনিট পর তালা ভেঙে যায়।
মীর তারেক বের হলে সাংবাদিকেরা ছবি তুলতে যাচ্ছিলেন। তখন নেতা-কর্মীদের কয়েকজন সাংবাদিকদের কাছে গিয়ে ক্যামেরা চালু না করার জন্য বলেন। 'পেশাগত দায়িত্ব পালন করছি' বলে কয়েকজন সাংবাদিক প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলেন। তারপরও ফোন বের করলেই ভেঙে ফেলার হুমকি দিলেন। একজন সাংবাদিকদের গালি দিয়ে বললেন, 'পিটিয়ে তাড়িয়ে দে না।' ওই ব্যক্তি কিছুক্ষণ পর দুটি ইটের টুকরা এনে রাস্তায় ফেলে রাখলেন। ক্যামেরা চালু হলেই ইট ছোড়া হবে বলে ঘোষণা দিলেন।
রাত ১টা ৩৯ মিনিটে দুজনের কাঁধে ভর দিয়ে হেলমেট পরা অবস্থায় একজন বের হলেন। তাঁকে একটি মোটরসাইকেলে তুলে দ্রুত সেটি দক্ষিণ দিকে চলে গেল। এরপর দুজনের কাঁধে ভর দিয়ে হেলমেট পরে এলেন মীর তারেক। তাঁকেও একটি মোটরসাইকেলে তোলা হলো। তারপর একই মোটরসাইকেলে আরেকজন চড়লেন। তাঁর নাম সুমন সরদার। তিনিও রিকশাচালক গোলাম হোসেন হত্যা মামলার আসামি। দ্রুতই মোটরসাইকেলটি উত্তর দিকে চলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে নেতা-কর্মীরাও মোটরসাইকেল নিয়ে পিছু নিলেন। ভবনটি থেকে আহত অবস্থায় বের করা অন্যজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।



