'ঝরা বকুল' নাটক: নিম্নবিত্ত পরিবারের বড় মেয়ের আত্মত্যাগের গল্প দর্শক হৃদয় ছুঁয়ে গেছে
'ঝরা বকুল' নাটক: বড় মেয়ের আত্মত্যাগের গল্প দর্শক হৃদয় ছুঁয়েছে

সংসারের নির্মম টানাপোড়েন, নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে নিম্নবিত্ত পরিবারের হাল ধরা এক বড় মেয়ের নিঃশব্দ আত্মত্যাগ—এমনই এক চেনা জীবনের পরম বাস্তবতা নিয়ে পর্দায় হাজির হয়েছে নির্মাতা রাফাত মজুমদার রিংকুর বিশেষ নাটক ‘ঝরা বকুল’। ঈদ উল আযহার সপ্তম দিন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আইতে প্রথম প্রচারিত হয় নাটকটি। পরবর্তীতে ‘রঙ্গন এন্টারটেইনমেন্ট’-এর ইউটিউব চ্যানেলে এটি অবমুক্ত করা হয়। আর প্রকাশের পরপরই নাটকটি নিয়ে দর্শক মহলে তুমুল আলোড়ন তৈরি হয়েছে, যা ইতিমধ্যেই কোটি মানুষের চোখে জল এনেছে, ছুঁয়ে গেছে তাদের হৃদয়।

দর্শক কেন এত পছন্দ করছেন?

মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের চেনা সুখ-দুঃখ আর সম্পর্কের ভেতরের নীরব ক্রাইসিসগুলো পর্দায় নিখুঁতভাবে ফুটে ওঠায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মিলছে বিপুল সাড়া। বিশেষ করে নাটকটিতে নিম্নবিত্ত পরিবারের বড় মেয়ে ‘মনিরা’ চরিত্রে সুনেরাহ বিনতে কামালের অনবদ্য ও প্রাণবন্ত অভিনয় চারদিকে দারুণ প্রশংসা কুড়াচ্ছে।

নাটকটি কেন সাধারণ মানুষের মাঝে এত বড় আলোড়ন তৈরি করল, তা নিয়ে বাংলা ট্রিবিউন এর কাছে নির্মাতা রাফাত মজুমদার রিংকু জানালেন দার ব্যাখ্যা। তার মতে, দুই পরিবারের ভেতরের ছোট ছোট ক্রাইসিস ও সামাজিক দায়বদ্ধতাই নাটকটিকে দর্শকদের এত কাছে নিয়ে গেছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাফাত মজুমদার রিংকু বলেন, “‘ঝরা বকুল’ নাটকটি দর্শক এত পছন্দ করার মূল কারণ হচ্ছে গল্পটার প্রতি দুই পরিবারের যে সামাজিক দায়বদ্ধতা। দুটি পরিবারের ভেতরের নানা সংকটের (ইনার ক্রাইসিস) ছোট্ট ছোট্ট মোমেন্টগুলো মানুষ দারুণভাবে গ্রহণ করেছে। এই ঘটনাগুলো আসলে আমাদের সমাজের কোনো না কোনো পরিবারে প্রতিনিয়ত ঘটছে। দর্শকেরা পর্দায় এই ঘটনাগুলোর সাথে নিজেদের জীবনকে মেলাতে পেরেছেন, রিলেট করতে পেরেছেন। আর এই কারণেই আমার মনে হয় অডিয়েন্স নাটকটি এত পছন্দ করেছে।”

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পরিবার ও বাস্তবতার প্রতিফলন

তিনি আরও যোগ করেন, “সাধারণ মানুষ সবসময়ই পর্দায় ফ্যামিলি ড্রামা দেখতে চায়। ভিজ্যুয়ালি যখন তারা নিজেদের জীবনের সাথে মিলে যাওয়া কোনো গল্প দেখে, তখন তাদের মনে হয়—এটাতো ঠিক আমার মতোই বা এই ধরণের সমস্যায় তো আমিও কখনো না কখনো পড়েছি। এই আত্মিক সংযোগের কারণেই ‘ঝরা বকুল’ ও তার কাজ দর্শকদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।”

নাটকের পাত্র-পাত্রী নির্বাচন এবং তাদের অভিনয় নিয়ে দারুণ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন নির্মাতা। রিংকু বলেন, “আমি চরিত্রগুলো যেভাবে সিলেকশন করেছি, প্রত্যেকে যে যার জায়গা থেকে একদম পারফেক্ট অভিনয় করেছে। বিশেষ করে সুনেরাহ তার চরিত্রে শতভাগ দেওয়ার চেষ্টা করেছে এবং চরিত্রের সাথে ও একদম মিশে গেছে। ইয়াশ রোহানও ওর চরিত্রে দুর্দান্ত ছিল। আর গোলাম ফরিদা ছন্দা আপুর কথা না বললেই নয়, উনি উনার চরিত্রের সাথে ১০০% পারফেক্ট ছিলেন। এছাড়া রোজী আপু খুব ভালো করেছেন এবং ডলি জহুর আন্টি তো খুবই ন্যাচারাল অভিনয় করেছেন। প্রত্যেকটা চরিত্রই যে যার জায়গা থেকে এত ভালো করার কারণেই দর্শক এই কাজটিকে এত বেশি গ্রহণ করেছে ও পছন্দ করেছে।”

দর্শক প্রতিক্রিয়া ও আক্ষেপ

ইউটিউবে নাটকটির নিচে ইতিমধ্যেই প্রায় সাড়ে এগারো হাজার মন্তব্য পড়েছে। কমেন্টবক্সজুড়ে বাংলা নাটকের বদলে যাওয়া ও এই ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে দর্শকদের মাঝে এক ধরণের গর্ব অনুভব করতে দেখা গেছে। অসংখ্য দর্শক সুনেরাহ বিনতে কামালের অভিনয়ের প্রতি তাদের মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন। সেই সাথে নির্মাতার প্রতি ভালোবাসা জানানোর পাশাপাশি তাদের একটিই মধুর আক্ষেপ—কেন নাটকটির দৈর্ঘ্য আরেকটু বেশি বা আরও ১০-১৫ মিনিট বড় হলো না!

দর্শকদের এই আক্ষেপ ও প্রতিক্রিয়া নিয়ে রিংকু বলেন, “দর্শকের রেসপন্স দেখে আমার আসলেই খুব ভালো লেগেছে। নাটকটি আরও বড় কেন করলাম না—এই আক্ষেপটা মূলত এসেছে দর্শকদের ভালো লেগেছে বলেই। তারা হয়তো গল্পটা আরও দেখতে চেয়েছেন। তবে আমার মনে হয়েছে, আমি গল্পটা ঠিক যে জায়গায় এন্ডিং করেছি, আমার জায়গা থেকে সেটা একদম ঠিকঠাক ছিল। দর্শকদের এই ভালোবাসা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে এবং নেক্সট টাইম আমি চেষ্টা করব আরও ভালোভাবে, ঠিকঠাকভাবে গল্প উপস্থাপন করার, যেন দর্শকদের এই আক্ষেপটা আর না থাকে।”

গল্পের মূল চরিত্র মনিরা

‘ঝরা বকুল’-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র মনিরা। একটি নিম্নবিত্ত পরিবারের বড় মেয়ে সে। সংসারের হাল ধরতে গিয়ে নিজের জীবন, স্বপ্ন, এমনকি বিয়ের বিষয়টিও বারবার পিছিয়ে যায় তার। পরিবারের সব দায়িত্ব তার কাঁধে। এমনকি মেয়েটি বিয়ে করে অন্য সংসারে চলে গেলে পরিবার কীভাবে চলবে—সেই ভাবনায় তার মা-ও তাকে বিয়ের কথা বলেন না। এদিকে কবির (ইয়াশ রোহান) মনিরাকে ভালোবাসে। এই তীব্র টানাপোড়েনের মধ্য দিয়েই এগিয়ে যায় নাটকের গল্প।

নাটকের মন্তব্যঘরে সুনেহরাকে নিয়ে একজন দর্শক লিখেছেন, “জানিনা মানুষ সুনেরাহকে নিয়ে এত খারাপ মন্তব্য কেন করে। ওর কণ্ঠ, ওর চেহারা সবই অন্য রকম। আর কেন জানি সব ধরনের অভিনয়ে মানিয়ে যায়। বড়লোকের মেয়ে, গরিবের বাড়ির মেয়ে, অহংকারী, নিরহংকারী—সব চরিত্রে।”

নির্মাতার কৃতজ্ঞতা

একটি সুন্দর কাজ উপহার দিতে পারার পুরো কৃতিত্ব নিজের টিমকে দিয়েছেন নির্মাতা। তিনি বলেন, “সর্বোপরি ‘ঝরা বকুল’-এর রাইটার নাসির খান, আমার টিম এবং কলাকুশলী—প্রত্যেকটা মানুষের পরিশ্রমের ফলেই আমরা দর্শকদের একটি সুন্দর কাজ উপহার দিতে পেরেছি। এটাই আমাদের আনন্দ।” পাশাপাশি রঙ্গন মিউজিকের প্রযোজক জামাল হোসেনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, “জামাল ভাই সবসময় ভালো গল্পের পাশে থাকেন, ভালো গল্প নিয়ে কাজ করার অনুপ্রেরণা দেন, এটা আমার খুব ভালো লাগার একটি জায়গা। উনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ সবাইকে।”

নাটকটির প্রযোজক জামাল হোসেন বলেন, “রম্য, রোমান্টিক, অতি আর্ট দেখতে দেখতে দর্শক হয়রান। এসব গল্পে বাস্তবতার অভাব থাকে। হাঁপিয়ে ওঠা দর্শক এখন একটি পরিবারের সুখ-দুঃখ, সংগ্রাম ও সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে বাস্তবতা খুঁজে পান।”

পারিবারিক গল্পকে সবসময় প্রাধান্য দেওয়া নির্মাতা রাফাত মজুমদার রিংকু মনে করেন, মানুষ যখন নাটকের চরিত্রে নিজেদের খুঁজে পায়, তখন সেটি সহজেই গ্রহণ করে।

উল্লেখ্য, ‘ঝরা বকুল’ নাটকটিতে সুনেরাহ ও ইয়াশ রোহান ছাড়াও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে আরও অভিনয় করেছেন ডলি জহুর, রোজী সিদ্দিকী, গোলাম ফরিদা ছন্দাসহ আরও অনেকে।