গল্পটা ২০১৯ সালের। আমার মেয়ের বয়স তখন ৪ বছর। কোরবানির ঈদে দাদাবাড়ি গিয়ে এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে নানা রঙের গরু দেখে আচমকা তার প্রশ্ন: ‘বাবা, কোথাও কেন পিংক কালারের গরু নাই?’ গরুর রঙ যে পিংক বা গোলাপি হয় না, সেটা হেরার ওই প্রশ্নের আগে আমিও খেয়াল করিনি বা সত্যিই গোলাপি রঙের গরু কেন নেই, এই ঔৎসুক্যটা মনে জাগেনি।
এর ৭ বছর পরে এবারের কোরবানির পশুর হাটে গোলাপি না হলেও কাছাকাছি রঙের একটা মহিষ নিয়ে দেশে তো বটেই, আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়ও খবর হয়েছে। তবে গায়ের রঙ কিংবা সাইজের কারণে নয়, মহিষটি আলোচনায় এসেছে তার নামের কারণে। তার নাম পৃথিবীর ‘সবচেয়ে শক্তিধর’ রাষ্ট্রপ্রধান ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামে। আর এই নামই তাকে খ্যাতিমান করে তুলেছে। তবে শুধু ট্রাম্প নয়, মধ্যপ্রাচ্যে তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নামেও নামকরণ করা হয়েছে আরেকটি মহিষের নাম।
নারায়ণগঞ্জের ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু
গণমাধ্যমের খবর বলছে, নারায়ণগঞ্জে জিয়াউদ্দিন মৃধা নামে একজন খামারি তার সাতশো কেজি ওজনের বিশাল একটি আলবিনো (বিশেষ জেনেটিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন) মহিষের নাম রেখেছেন ট্রাম্প। কেননা, তার চুল ও চামড়ার রঙের সাথে ট্রাম্পের মিল রয়েছে। উপরন্তু, আমেরিকার প্রেসিডেন্টের মতোই তার সাদা চুল সুন্দর করে আঁচড়ে রাখা হয়। গায়ের রঙও আর ১০টা মহিষের মতো ধূসর নয়। বরং ফ্যাকাসে। অনেকটা গোলাপি আভার। নেতানিয়াহু নামের মহিষের সাইজ আরও বড়। স্বভাব শান্ত হলেও সাড়ে সাতশো কেজির যুদ্ধংদেহী নেতানিয়াহুর স্বভাবই এই নামকরণের পেছনে কারণ বলে জানাচ্ছেন বিক্রেতা।
তবে নারায়ণগঞ্জের এই ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু শুধুমাত্র বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যম বা সংবাদমাধ্যমে সীমাবদ্ধ নেই। তারা এখন বিশ্ব মিডিয়ার সংবাদ। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স, ব্রিটেনের সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট, পাকিস্তানের সংবাদপত্র ডন, ফ্রান্স টোয়েন্টিফোর, ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভিসহ বিশ্বের বহু দেশের শীর্ষ গণমাধ্যমের খবরে উঠে এসেছে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু। মহিষ দুটি দেখতে দূর দূরান্ত থেকে ছুটে আসা মানুষ, সেলফি তোলা আর সামাজিকমাধ্যমে এই নিয়ে আলোচনা— এসব খবর তুলে ধরছে গণমাধ্যমগুলো। ‘ইরান ইন রাশিয়া’ নামে একটি এক্স অ্যাকাউন্টে রসিকতা করে লেখা হয়েছে: The animal had lost its appetite after being compared to the American leader. অর্থাৎ অ্যামেরিকান নেতার সঙ্গে তুলনা করার পর প্রাণীটি তার খাওয়ার রুচি হারিয়ে ফেলেছে।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী নামের গরু
এবার ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর বাইরে পশুর নামের কারণে আলোচনায় আছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। গত রবিবার একটি জাতীয় দৈনিকের খবরের শিরোনাম: ‘বেশি চিল্লায় আর খায়, নাম তার নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী’। খবরে বলা হয়, পশুর হাটে উৎসুক মানুষের আকর্ষণ বাড়াতে এক খামারি তার কোরবানির গরুর নাম রেখেছেন ‘নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী’। গরুটি অনেক বেশি চিৎকার করে এবং প্রচুর খাবার খায়। এই স্বভাবের কারণেই মালিক শখ করে গরুটির এমন নাম রেখেছেন। গরুটি ও তার মালিকের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এ নিয়ে রসিকতা করেন নেটিজেনরা।
মামা-ভাগ্নে ও বাংলার ডন
এ বছর পশুর হাটে মামা-ভাগ্নেও আলোচনায় আসে। বাগেরহাটে দুটি ষাঁড়ের নাম রাখা হয়েছে মামা ও ভাগ্নে। মামার দাম ৮ লাখ টাকা হাঁকা হলেও, ভাগ্নের দাম আরও বেশি। বিক্রেতা তার দাম হাঁকছেন ১০ লাখ টাকা। এবার শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার কাপাশিয়া পশ্চিমপাড়া এলাকার একটি খামারে ‘বাংলার ডন’ নামে একটি বিশালাকৃতির ষাঁড় নিয়েও মানুষের মনে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। গোপালগঞ্জে আলোচনায় আছে ইরফান।
পূর্ববর্তী বছরগুলোর নাম
অবশ্য মানুষের নামে কোরবানির পশুর নামকরণ এবারই প্রথম নয়। প্রতি বছরই বেশ কিছু নাম আলোচনায় আসে। যেমন ২০২১ সালে কোরবানির পশুর হাটে আলোচনায় ছিলো শাকিব খান, ডিপজল ও মানিক নামে বিশালাকৃতির কয়েকটি গরু। ওই বছরের কোরবানির ঈদের সময় কয়েকটি সংবাদ শিরোনাম ছিল এরকম: ১. হিরো আলমের ওজন ৩১ মণ, ২. গরুর নাম ‘রাজবাড়ীর রাজা-১’, দাম ২৫ লাখ, ৩. গরুর নাম ‘হামাস’ রাখলো কিশোরী, ৪. জনসিনার দাম উঠেছিলো ১০ লাখ, বিক্রি ৫ লাখে এবং ৫. শেরখান ও বাহাদুরকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় খামারি।
কেন মানুষের নামে পশুর নাম?
প্রশ্ন হলো, ঠিক কী কারণে মানুষের নামে পশুর নাম রাখা হয়? একজন সাধারণ মানুষ রসিকতা করে কিংবা হয়তো ভালোবেসেই তার প্রিয় গরুটির নাম তার প্রিয় কোনো মানুষ বা তারকার নামে রাখলেও মূলধারার গণমাধ্যম কি সেভাবেই পশুগুলোকে দর্শক-পাঠকের সামনে হাজির করবে? বস্তুত হালের বিতর্কিত বা আলোচিত ব্যক্তিদের নামে পশুর নাম রাখার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে বেশ কয়েক বছর ধরে। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় যাদের নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক বেশি হয়।
একবার অ্যামেরিকার অভিযানে নিহত আল কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন, লিবিয়ার নিহত প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফি, ইরাকের নিহত প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের নামেও বাংলাদেশের বাজারে গরু উঠেছে। বাদ যাননি রেসলিং তারকা রক ও আন্ডারটেকারও। রক ও আন্ডারটেকার নামওয়ালা গরু দুটির মালিক তখন যুক্তি দেখিয়েছিলে, গরু দুটি দেখতে ও শক্তিতে রেসলিং তারকার মতো। তাই এই নাম।
বিদেশেও এই প্রবণতা
মানুষের নামে গরুর নাম রাখার এই প্রবণতা শুধু বাংলাদেশেই নয়, বরং বিদেশেও আছে। কিম কার্দাশিয়ান নামে একজন মডেল-অভিনেত্রী ও রিয়েলিটি তারকার নামে একটি গরুর নাম রেখেছিল পিপল ফর দি এথিক্যাল ট্রিটমেন্ট অফ অ্যানিম্যালস (পিইটিএ) সংস্থা। এমন একজন তারকার নামে গরুর নামকরণের ব্যাখ্যায় সংস্থাটি বলেছে, দুধ বর্জিত প্ল্যান্ট বেসড ডায়েট নিয়ে মানুষকে অনুপ্রাণিত করার জন্যই কিম কার্দাশিয়ানকে ধন্যবাদ জানিয়েছে পিইটিএ। তার এই উদ্যোগকে সম্মান জানাতেই তারা গরুর নাম রেখেছেন তারকার সঙ্গে নাম মিলিয়ে।
গরুর নামকরণের কারণ
কোরবানির হাটে আসা গরু বা ষাঁড়দের ক্ষেত্রে মানুষের নাম লক্ষ্য করা যায় তুলনামূলকভাবে বড় গরুদের। যাতে করে ক্রেতারা নাম দেখেই আকৃষ্ট হয়। কখনও খামারে অনেক গরুর ভেতরে যখন দুয়েকটি খুব ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্যের হয়ে ওঠে, বা তুলনামূলকভাবে বড় ও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে, তখনও অনেক সময় খামারের মালিক আদর করে বা অন্য গরুদের সঙ্গে আলাদা করার জন্য তাদের নাম দেন। সেই নাম দেয়ার ক্ষেত্রে প্রথমেই তার মাথায় আসে তারকাদের কথা। কখনও তার প্রিয় তারকার নাম, আবার কখনও বিতর্কিত বা সমালোচিত কিংবা আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত কারো নাম। অনেক সময় খামার মালিকের পরিচিত অন্য কেউও হয়তো রসিকতা করে কোনো একটি গরুর নাম বলেন; দেখা যায় সেই নাম বলতে বলতে গরুটি সেই নামেই পরিচিত হয়ে ওঠে।
সম্মানের প্রশ্ন
কিন্তু যুক্তি যাই থাকুক না কেন, ‘সৃষ্টির সেরা জীব’ বলা হয় যে মানুষকে, সেই মানুষের নামে কোনো পশুর নাম রাখা মানুষের জন্য সম্মানজনক কি না—সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। পক্ষান্তরে সমাজ ও রাষ্ট্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নামে গরুর নাম রাখা হলেও গণমাধ্যম সেই খবর কীভাবে পরিবেশন করবে; হিরো আলমের ওজন ৩১ মণ; বিক্রি হয়নি শাকিব খান ও ডিপজল— এ জাতীয় সংবাদ শিরোনাম করবে কিনা; এখানে গণমাধ্যমের সম্পাদকীয় নীতি কী হওয়া উচিত— সেটিও বিবেচনা করা উচিত। কারণ মানুষের নামে গরুর নাম রাখার এই বিষয়টিকে গণমাধ্যম যদি অব্যাহতভাবে সমর্থন দিয়ে যায়, তাহলে একসময় হয়তো জাতীয়ভাবে সম্মানিত কোনো ব্যক্তির নামেও গরুর নাম রাখা শুরু হবে— যে খবর প্রকাশ করতে গিয়ে গণমাধ্যম বিব্রত হবে।
লেখক: সাংবাদিক ও লেখক



