মৃণাল সেন-এর জন্মবার্ষিকীতে তাকে নতুনভাবে স্মরণ করলেন চঞ্চল চৌধুরী। তবে এই স্মরণ কেবল একজন দর্শক বা ভক্তের নয়; এটি এমন একজন অভিনেতার অনুভব, যিনি পর্দায় মৃণাল সেন হয়ে ওঠার বিরল অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তার জীবন ও দর্শনকে কাছ থেকে স্পর্শ করেছেন। আনন্দবাজারে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে চঞ্চল জানিয়েছেন, মৃণাল সেনকে তিনি প্রথমে চিনেছিলেন চলচ্চিত্রের মাধ্যমে, কিন্তু জীবনীচিত্র পদাতিক-এ অভিনয় করতে গিয়ে চিনেছেন মানুষটিকেও।
শৈশব ও মৃণাল সেনের সঙ্গে প্রথম পরিচয়
চঞ্চলের শৈশব কেটেছে এমন এক গ্রামে, যেখানে বিদ্যুৎও ছিল না। ফলে সিনেমার সঙ্গে তার পরিচয় হয় অনেক পরে। ক্লাস টেনে পড়ার সময় প্রথম সিনেমা দেখা শুরু, এরপর কলেজে ওঠার আগেই ভিসিআরে নানা চলচ্চিত্র দেখতেন। সেই সময়ই প্রথম দেখেন মৃণাল সেনের কাজ। বয়স, সময় ও অভিজ্ঞতা বদলের সঙ্গে সঙ্গে মৃণালের ছবির অর্থও তার কাছে বদলে গেছে। একেক সময় একেক ছবি তাকে নতুন করে ভাবিয়েছে। নব্বই দশকেই তিনি মৃণালের ভক্ত হয়ে ওঠেন। তার কাছে উপমহাদেশের চলচ্চিত্র মানে সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন এবং ঋত্বিক ঘটক—এই তিন মহীরুহের উত্তরাধিকার।
চরিত্রটি গ্রহণের দ্বিধা
মৃণাল সেনের চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব যখন আসে, তখন চঞ্চল প্রথমে রাজি হননি। পরিচালক সৃজিত মুখার্জীর কাছ থেকে প্রস্তাব পেয়ে তিনি বিস্মিত হন। তার মনে হয়েছিল, এমন একজন কিংবদন্তির চরিত্র ধারণ করা প্রায় অসম্ভব। চেহারার মিল তৈরি করা হয়তো সম্ভব, কিন্তু একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব, চোখের ভাষা, চলাফেরা, জীবনদর্শন—এসব ধারণ করাই আসল চ্যালেঞ্জ। চঞ্চল ভেবেছিলেন, তিনি হয়তো সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারবেন না।
প্রস্তুতি ও মৃণাল সেনের জগতে ডুব
এই চরিত্রের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে তিনি নিজেকে ডুবিয়ে দেন মৃণাল সেনের জগতে। পড়েন নানা বই, দেখেন সাক্ষাৎকার, পুরোনো ভিডিও, আবার নতুন করে দেখেন তার নির্মিত প্রায় সব চলচ্চিত্র। চঞ্চলের মতে, বই পড়ে যতটা না মৃণালকে জানা যায়, তার চেয়ে অনেক বেশি জানা যায় তার সিনেমা দেখে। কারণ মৃণাল সেন তার জীবন, বিশ্বাস, সংগ্রাম—সবই রেখে গেছেন নিজের ছবির ভেতরে। শ্রমজীবী মানুষ, অবহেলিত শ্রেণি, শহর-গ্রামের দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক বাস্তবতা—এসব তার ছবির মূল সুর, যা চঞ্চলকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
মৃণাল সেনের দৃঢ়তা ও আদর্শ
চঞ্চল বলেন, মৃণাল সেন কখনও পরিচিতি বা খ্যাতির জন্য আপস করেননি। ট্রেন্ডের পেছনে ছোটেননি। বরং নিজের বিশ্বাসের জায়গা থেকে কাজ করেছেন। জীবনে আর্থিক সংকট এসেছে, নানা লাঞ্ছনা ও বাধার মুখে পড়েছেন, তবু নীতি থেকে সরে যাননি। এই দৃঢ়তা চঞ্চলের কাছে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। তার মতে, যেসব তরুণ কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাদের জন্য মৃণাল সেন বড় উদাহরণ।
ব্যক্তিগত শোক ও চরিত্রে মিশে যাওয়া
এই কাজের সময় চঞ্চলের ব্যক্তিজীবনে ঘটে যায় আরেক গভীর ঘটনা। শুটিংয়ের কিছুদিন আগে তার বাবা মারা যান। সেই শোক নিয়েই তাকে মৃণাল সেনের চরিত্রে অভিনয় করতে হয়। আশ্চর্যজনকভাবে, চঞ্চল জানান, তার বাবার যুবক বয়সের চেহারার সঙ্গে মৃণাল সেনের কিছুটা মিল ছিল। মেকআপে যখন তিনি মৃণাল হয়ে উঠতেন, আয়নায় নিজের মধ্যে বাবার মুখ দেখতে পেতেন। ফলে চরিত্রটি কেবল অভিনয় থাকেনি; তা এক ব্যক্তিগত স্মৃতি ও শোকের সঙ্গে মিশে যায়।
চঞ্চলের ভাষায়, মৃণাল সেন হয়ে ওঠার পর তিনি যেন কিছু সময়ের জন্য বাবার শোক ভুলে থাকতে পারতেন। কিন্তু মেকআপ তুলে ফেললেই আবার সেই শূন্যতা ফিরে আসত। এই আবেগ তাকে চরিত্রটির আরও গভীরে নিয়ে যায়। তিনি বিশ্বাস করেন, যেন নিয়তির লিখনেই এই চরিত্র তার জন্য অপেক্ষা করছিল।
কুণাল সেনের স্বীকৃতি
চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর মৃণাল সেনের ছেলে কুণাল সেনের সঙ্গে দেখা হয় চঞ্চলের। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, অভিনয়ে কোনও মুহূর্তে কি বাবার ছায়া খুঁজে পেয়েছেন? কুণাল সেনের উত্তর ছিল—একটি নয়, বেশ কয়েকটি মুহূর্তে মনে হয়েছে যেন তিনি নিজের বাবাকেই দেখছেন। এই স্বীকৃতিকেই চঞ্চল তার অভিনয়জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন।
মৃণাল সেনের প্রাসঙ্গিকতা আজকের সময়ে
চঞ্চল মনে করেন, আজকের সময়ে মৃণাল সেনের মতো রাজনৈতিকভাবে স্পষ্ট অবস্থান নিয়ে সিনেমা করা সহজ নয়। বর্তমান সময়ে নির্মাতারা অনেকেই রাজনৈতিক বক্তব্য এড়িয়ে চলেন। কারণ এমন বক্তব্য দিলে নানা জটিলতায় পড়তে হয়। অথচ মৃণাল সেন নিজের সময়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের অসঙ্গতি নির্ভয়ে তুলে ধরেছেন। তার চলচ্চিত্র ছিল বিনোদনের পাশাপাশি সামাজিক বিবেকেরও ভাষা।
শিল্পী হিসেবে নৈতিক অবস্থান
চঞ্চলের কাছে মৃণাল সেন শুধু একজন নির্মাতা নন; তিনি এক ধরনের নৈতিক অবস্থান। যদি কখনও তার সঙ্গে দেখা হতো, চঞ্চল বলতেন—আপনার চলচ্চিত্র যেমন অনুসরণীয়, আপনার ব্যক্তিজীবনও তেমনই। কারণ আপনার জীবনদর্শন প্রমাণ করে, শিল্পী কেবল পর্দার মানুষ নন; তিনি সমাজেরও এক দায়বদ্ধ কণ্ঠ।
এই কারণেই মৃণাল সেনকে অভিনয় করা চঞ্চলের কাছে শুধুই একটি চরিত্রে অভিনয় নয়। এটি ছিল এক শিল্পীর ভেতর দিয়ে আরেক শিল্পীকে আবিষ্কার করা—আর সেই আবিষ্কার তাকে নিজের জীবনকেও নতুন করে দেখতে শিখিয়েছে।



