মহানবী (সা.)-এর শান্তি প্রতিষ্ঠার ৪ উদ্যোগ: হিলফুল ফুজুল থেকে মক্কা বিজয়
মহানবী (সা.)-এর শান্তি প্রতিষ্ঠার ৪ উদ্যোগ

মহানবী (সা.)–এর আগমন-পূর্ব আরব সমাজে ছিল যুদ্ধবিগ্রহ, রক্তপাত ও বিশৃঙ্খলার জয়জয়কার। তাঁর প্রজ্ঞা, নৈতিকতা ও মহান আদর্শের ছোঁয়ায় সেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয় ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও সামাজিক সম্প্রীতি। তিনি সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বিশেষভাবে ৪টি উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।

প্রথম শান্তি সংঘ: হিলফুল ফুজুল

নবীজি (সা.) তরুণ বয়সে তিনি প্রত্যক্ষ করেন কোরাইশ ও হাওয়াজিন গোত্রের মধ্যে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, যা ইতিহাসে ‘হারবুল ফিজার’ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধ মক্কার সামাজিক স্থিতি ও নিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। যুদ্ধের পর সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও নির্যাতিত মানুষের অধিকার রক্ষার লক্ষ্যে মক্কার কয়েকজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি মিলে প্রতিষ্ঠা করেন ‘হিলফুল ফুজুল’ নামের একটি শান্তি সংঘ। তরুণ মুহাম্মদ (সা.) এই মহৎ উদ্যোগে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। এ সংগঠনের মূল লক্ষ্য ছিল অত্যাচারিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, দুর্বলদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং সমাজে শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।

পরবর্তীকালে নবীজি (সা.) এ চুক্তির গুরুত্ব স্মরণ করে বলেন, যদি ইসলামের যুগেও এমন কোনো মহৎ চুক্তির আহ্বান জানানো হতো, তবে তিনি তাতেও সাড়া দিতেন। (ইদরিস কান্ধলবি, সিরাতে মুস্তফা, ১/৯৩-৯৫, আলতাফ অ্যান্ড সন্স, করাচি, পাকিস্তান)

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রাচীনতম লিখিত সংবিধান: মদিনা সনদ

৬২২ খ্রিষ্টাব্দে নবীজি (সা.) মদিনায় হিজরত করেন। তখন শহরটি দীর্ঘদিনের গোত্রগত দ্বন্দ্ব, সামাজিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় জর্জরিত ছিল। সেখানে শান্তি ও সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি প্রণয়ন করেন একটি চুক্তিপত্র, যা পরে ‘মদিনা সনদ’ নামে খ্যাত হয়। এটি মানবসভ্যতার অন্যতম প্রাচীন লিখিত সাংবিধানিক দলিল এবং ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রথম লিখিত সংবিধান হিসেবে বিশেষভাবে স্বীকৃত।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এই সনদে মুসলিম, ইহুদি এবং মদিনার অন্যান্য গোত্রের পারস্পরিক অধিকার নির্ধারিত হয়। এতে ধর্মীয় স্বাধীনতা, জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা, অপরাধের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা, পারস্পরিক সহযোগিতা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা অন্তর্ভুক্ত ছিল। উদ্দেশ্য ছিল সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে একটি শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল সমাজ গঠন করা। ফলে এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপিত হয়, যেখানে ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন জাতি ও ভিন্ন গোত্রের মানুষ পারস্পরিক সম্মান ও সহাবস্থানের নীতিতে একসঙ্গে বসবাস করতে পারত। (সিরাতে ইবনে হিশাম: ২/১৪৩, দারুল কিতাব আল-আরবি, বৈরুত, ১৯৯০)

শত্রুর সঙ্গে শান্তিচুক্তি: হোদাইবিয়ার সন্ধি

৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে মক্কার শত্রুপক্ষের সঙ্গে মদিনাবাসীর যে শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয়, ইতিহাসে যা ‘হোদাইবিয়ার সন্ধি’ নামে পরিচিত। তিনি প্রায় ১ হাজার ৪০০ সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে ওমরা পালনের উদ্দেশ্যে মক্কার পথে রওনা করেছিলেন। কিন্তু মক্কার কোরাইশরা মুসলমানদের বাধা দেয়। পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দেয়। এমন সংকটময় মুহূর্তে নবীজি (সা.) সংঘাতের পরিবর্তে শান্তি ও সমঝোতার পথ বেছে নেন। হোদাইবিয়া নামক কূপের পাশে কোরাইশদের সঙ্গে ১০ বছর মেয়াদি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। (ইবনে হাজার আসকালানি, আল-উজাব ফি বায়ানিল আসবাব, ১/৪৬৫-৪৬৬, দার ইবনুল জাওজি, সৌদি আরব, ১৯৯৭)

আপাতদৃষ্টিতে চুক্তির কয়েকটি শর্ত মুসলমানদের জন্য প্রতিকূল বলে মনে হয়েছিল। অনেক সাহাবি এতে মর্মাহতও ছিলেন। কিন্তু নবীজি (সা.) সুদূরপ্রসারী কল্যাণের কথা বিবেচনা করেছেন। পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয়, এই সন্ধিই ইসলামের ব্যাপক প্রসার, আরব উপদ্বীপে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং মক্কা বিজয়ের পথ সুগম করেছে। এ কারণেই আল্লাহ-তাআলা এ সন্ধিকে ‘সুস্পষ্ট বিজয়’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। (সুরা ফাতহ, আয়াত: ১)

বিজয়ের পরে সাধারণ ক্ষমা

হোদাইবিয়ার সন্ধির প্রায় দুই বছরের মধ্যেই কোরাইশরা চুক্তি লঙ্ঘন করে। ফলে নবীজি (সা.) প্রায় ১০ হাজার সাহাবিকে সঙ্গে নিয়ে মক্কা অভিযানে রওনা দেন। প্রায় রক্তপাতহীনভাবে মক্কা বিজিত হয়। যাঁরা একসময় নবীজিকে অকথ্য নির্যাতন করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছেন, তাঁকে জন্মভূমি থেকে নির্বাসিত করেছেন, তাদের সামনে তিনি আজ বিজয়ী। প্রতিশোধ নেওয়ার সব সুযোগ তাঁর ছিল। কিন্তু তিনি সবার প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। তাঁর এই মহানুভবতা অসংখ্য মানুষের হৃদয় জয় করে নেয় এবং মক্কার ইতিহাসে শান্তি ও সম্প্রীতির নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। (সিরাতে ইবনে হিশাম: ৪/৫৪-৫৫, দারুল কিতাব আল-আরবি, বৈরুত, ১৯৯০)

ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা