মেসির কান্না: হারতে হারতে জয়ের আবেগে ভেঙে পড়া
মেসির কান্না: হারতে হারতে জয়ের আবেগ

ম্যাচ শেষে কেঁদেছেন লিওনেল মেসি। কান্নার অনেক রং! যার অন্তত দুটি রং গত তিন দিনে দেখেছে বিশ্বকাপ ফুটবল। তিন দিনে ফুটবল ইতিহাসের তিনজন ফুটবলার কাঁদলেন। নেইমার ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর গতকাল কাঁদলেন লিওনেল মেসিও। নেইমার ও রোনালদোর কান্না ছিল হৃদয় ভাঙার, আর মেসি কাঁদলেন ঘুরে দাঁড়ানোর আনন্দে। খাদের কিনারা থেকে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের পর মেসির দুচোখ যেন বাঁধ ভেঙেছে। শেষ কবে মেসিকে এভাবে কাঁদতে দেখেছিল কেউ!

নেইমার ও রোনালদোর কান্না

তিন দিন আগে নরওয়ের বিপক্ষে ২–১ গোলে হেরে বিদায় নেয় ব্রাজিল। ম্যাচের শেষ গোলটি করেন নেইমার। কিন্তু একটু পর শেষ বাঁশি বেজে উঠতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড। মাঠে বসে অঝোরে কাঁদছিলেন ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের যুবরাজ। সতীর্থরা এগিয়ে এলেন সান্ত্বনা দিতে। কিন্তু এমন সময়ে কি আর সান্ত্বনা হয়! কাঁদতে কাঁদতে বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্নকে পেছনে ফেলে আড়ালে চলে গেলেন নেইমার।

সিরিয়াল কান্নার দৃশ্যে পরশু যোগ দেন ফুটবলের আরেক মহাতারকা রোনালদোও। স্পেনের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে গোল খেয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হয়ে যায় পর্তুগালের। বিদায় নিশ্চিত হওয়ার পর শুরুতে রোনালদো চেষ্টা করেন কান্না চেপে রাখতে। কিন্তু ভাঙা বুকের হাহাকারকে চোখ আর কতক্ষণ ঠেকিয়ে রাখতে পারে! পারেনি এবারও। একটু পর চোখ থেকে কান্না ছড়িয়ে পড়ল রোনালদোর মুখের অভিব্যক্তিতে। সেই কান্না মুছতে মুছতে আবারও টানেল ধরে হেঁটে চলে গেলেন ‘সিআর সেভেন’ও।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সেনেগালের লামিনে কামারার কান্না

মেসির কান্নার গল্পে যাওয়ার আগে স্মরণ করা যায় সেনেগালের লামিনে কামারাকেও। সেদিন শেষ ৩২–এ বেলজিয়ামের বিপক্ষে ২–০ গোলে ৮৫ মিনিট পর্যন্ত এগিয়ে থাকা সেনেগাল শেষ পর্যন্ত হেরে যায় ৩–২ গোলে। ম্যাচ শেষে সেনেগালের ডিফেন্ডার লামিন কামারার কান্না যেন হারের বেদনায় আরও গভীর এক ক্ষত এঁকে দিয়েছিল। শেষ মুহূর্তের পেনাল্টিটা তাঁর ফাউলের কারণেই পেয়েছিল বেলজিয়াম। এই দায়টাই ম্যাচ শেষ হতেই যেন চেপে বসেছিল তাঁর কাঁধে। কান্না তাই থামছিল না! সতীর্থ থেকে প্রতিপক্ষ—সবাই এগিয়ে এসেও শান্ত করতে পারেনি কামারাকে।

মেসির কান্না: জয়ের আনন্দে

গতকাল রাতে তেমনই এক পরিস্থিতিতে কেঁদেছেন মেসিও। তবে মেসির এই কান্না একেবারে আলাদা। অন্যরা কেঁদেছিলেন পরাজয়ের বেদনায়, মেসির কান্না ঘুরে দাঁড়ানো জয়ের আনন্দে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কেন? চার বছর আগে কাতারে যে মানুষটি ফুটবলের সঙ্গে সব লেনদেন মিটিয়ে ফেলেছিলেন, তিনি কেন শেষ ষোলোর একটি ম্যাচ জিতে এভাবে কাঁদছেন? তবে কি এখনো শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘কিছু মায়া রয়ে গেলো’ কবিতায় বলা—‘জ্বালাহীন হৃদয়ের একান্ত নিভৃতে/ কিছু মায়া রয়ে গেলো দিনান্তের’ কথাগুলোর মতো সত্যিই কিছু মায়া রয়ে গেল?

মেসি এই বিশ্বকাপে আগেও কেঁদেছেন। বিশ্বকাপে আলজেরিয়ার বিপক্ষে প্রথম গোলের পর মেসিকে কাঁদতে দেখে অবাক হয়েছিল অনেকেই। পরে জানা গিয়েছিল বাবার অসুস্থতার কারণেই তাঁর এমন কান্না। গতকাল রাতের কান্নার পেছনেও থাকতে পারে অন্য কোনো কারণ। কিন্তু কান্নাটা যে মিসরের বিপক্ষে হারতে হারতে পাওয়া জয়ের আবেগ থেকে উৎসারিত, তা তো আর মিথ্যা নয়।

মেসির কান্নার অর্থ

৭৯ মিনিট পর্যন্ত ২–০ গোলে পিছিয়ে থাকা দলটি শেষ পর্যন্ত ৩–২ গোলে না জিতলে মেসি নিশ্চয় এভাবে কেঁদে মাটি হতেন না। ফলে এটুকু বলা যায়, ফুটবল এখনো মেসিকে কাঁদাতে পারে। মুখে যতই ‘নির্বাণ’ লাভের কথা বলা হোক, সত্যি কথা হচ্ছে মেসির জীবনে এখনো ফুটবল চার বছর আগের মতো প্রাসঙ্গিক। আর তাই তো ম্যাচ শেষে সতীর্থরা মেসিকে শূন্যে ছুড়ে মাতলেন উদ্‌যাপনের আনন্দে।

পিছিয়ে পড়ার পর আর্জেন্টিনার ঘুরে দাঁড়ানোর চেয়েও বেশি অপ্রত্যাশিত ছিল মেসির কান্নার দৃশ্য। বিশেষত এই কান্নার ধরন তেমন পরিচিত নয়। বিশ্বকাপ জিতেও মেসিকে এভাবে কাঁদতে দেখা যায়নি। ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকায় চোট নিয়ে মাঠ ছাড়ার পর বেঞ্চে বসে মুখে হাত দিয়ে কেঁদেছিলেন মেসি। কিন্তু সেটি ছিল মহাদেশীয় প্রতিযোগিতার ফাইনাল। এর আগে ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে হেরে মেসিকে দেখা গিয়েছিল ফুঁপিয়ে কাঁদতে। সেসব কান্নার মুহূর্ত গতকাল ফিরেছিল মিসরের বিপক্ষে ম্যাচের পর। এই কান্নায় কি তবে বিদায়ের ডাক শুনতে পাওয়ার আতঙ্কও লুকোনো ছিল?

থাকতেই পারে। ম্যাচটা হারলে হয়তো এই হারেই থেমে যেত মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবলের যাত্রাও। তবে স্বস্তির বিষয় হচ্ছে, মেসির বিশ্বকাপ এখনো শেষ হয়নি। শেষ হয়নি ফুটবলের প্রতি মেসির মায়াও। মেসি কাঁদুক আরও অনেক আনন্দের কান্না।