ফেরদৌসী রহমান: কিংবদন্তি শিল্পীর জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি
ফেরদৌসী রহমানের জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

১৯৪১ সালের ২৮ জুন, বাংলায় আষাঢ় মাস। লুৎফুন্নেসা আব্বাসের কোলজুড়ে এল এক ছোট্ট কন্যাশিশু। তাঁর নাম রাখা হলো ফেরদৌসী বেগম, যাঁকে আমরা ফেরদৌসী রহমান নামে চিনি। তিন ভাই— মোস্তাফা কামাল, মুস্তাফা জামাল ও মুস্তাফা জামানের পর তিনি ছিলেন প্রথম কন্যাসন্তান। আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠেছিল পুরো পরিবার। বিশেষ করে তাঁর বাবা, কিংবদন্তি শিল্পী ও সুরের জাদুকর আব্বাসউদ্দীন আহমদ।

শৈশব ও সংগীত শিক্ষা

সেই সময় সমগ্র বাংলায় খ্যাতির শীর্ষে তাঁর অবস্থান। কলকাতা থেকে ছুটে এসে তিনি নবজাতক কন্যাকে বুকে জড়িয়ে বারবার চুমু খেতেন, আদরে ভরিয়ে দিতেন। তাঁর বাবা জাফর আলী আহমেদ হেসে বলতেন, ‘ছেলেগুলোকে ছেড়ে আব্বাস মেয়েটাকেই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে। মনে হয় সমস্ত সম্পত্তি তাকেই লিখে দেবে।’ আক্ষরিক অর্থেই একদিন তিনি তাঁর সমস্ত ধনসম্পদ—অর্থাৎ তাঁর গান—এই ছোট্ট মেয়েটির কণ্ঠে তুলে দিয়েছিলেন। আদর করে রুশ দেশের মেয়েদের নাম অনুসারে তাঁর ডাকনাম রেখেছিলেন ‘মীরনা’। যেন তখন থেকেই কন্যার জীবনে আন্তর্জাতিকতার একটি মাত্রা যুক্ত করে দিয়েছিলেন।

অতি যত্নে বড় হয়ে উঠেছিলেন ফেরদৌসী রহমান। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় বাড়িতে বাজত বিদুষী দীপালি নাগের গান, ‘আঁখি–পাতা ঘুমে জড়ায়ে আসে’। তাঁর মা, বেগম আব্বাসউদ্দীন আহমদ গুনগুন করে গান শুনিয়ে তাঁকে ঘুম পাড়াতেন। কলকাতা থেকে আব্বাসউদ্দীন আহমদ বাড়িতে এলে তাঁর কোলে চড়ে ফেরদৌসী গান শোনাতেন। বাবা মনে মনে ভাবতেন, ‘ওর গলা খুব সুন্দর।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বেতার ও ডিস্ক রেকর্ড

ফেরদৌসী রহমান বেতারের ‘খেলাঘর’ আসরে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। ১৯৫৫ সালে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই বেতারে প্রচারিত হয় তাঁর প্রথম খেয়াল, রাগ টৌড়ি। ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম ডিস্ক রেকর্ড। তাতে ছিল দুটি গান, ‘আমায় ঘরছাড়া করিলি রে’ এবং ‘আমার প্রাণের ব্যথা কে বুঝবে সই’।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চলচ্চিত্র ও আধুনিক গান

এরপর ফেরদৌসী রহমান প্রায় ২০০ চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দেন। একই সময়ে তাঁর প্রথম আধুনিক বাংলা গানও রেকর্ড হয়। গীতিকার ছিলেন আবু হেনা মোস্তফা কামাল, সুরকার আবদুল আহাদ। ‘কেন যে আমার কৃষ্ণচূড়ার বনে/গানের লগন রঙের মাধুরী/ছড়াল আপন মনে।’

উর্দু চলচ্চিত্র—চান্দা, তালাশ, মিলান, বাহানা, চকোরী; বাংলা চলচ্চিত্র—সুতরাং, রাজধানীর বুকে। যে গানই ফেরদৌসী রহমান বেছে নিয়েছেন, সেটিই অনির্বচনীয় জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বাবার বিশ্বাস যেন একে একে সত্য হতে থাকে।

ইউনেসকো বৃত্তি ও টেলিভিশন

ইউনেসকোর বৃত্তি নিয়ে ফেরদৌসী রহমান মাকে সঙ্গে করে লন্ডনে যান। সেখানে ট্রিনিটি কলেজ অব মিউজিকে স্টাফ নোটেশন শেখেন এবং ছয় মাস পর দেশে ফিরে আসেন।

১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম টেলিভিশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হয় ফেরদৌসী রহমানের গান দিয়ে। তিনি গেয়েছিলেন আবু হেনা মোস্তফা কামালের লেখা আধুনিক গান—‘ঐ যে আকাশ নীল হলো আজ,/সে শুধু তোমার প্রেমে।/ঐ যে বাতাস বাঁশি হলো আজ,/সে শুধু তোমার প্রেমে।’

এরপর ফেরদৌসী রহমানকে শিশুদের জন্য একটি সংগীতশিক্ষা অনুষ্ঠান শুরু করার অনুরোধ জানানো হয়। তিনি শুরু করেন নতুন ধারার অনুষ্ঠান ‘এসো গান শিখি’। অনুষ্ঠানটি ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে প্রচারিত হয়েছে এবং বহু প্রজন্মকে সংগীতমুখী করেছে।

পুরস্কার ও সম্মাননা

১৯৬৫ সালে সর্বকনিষ্ঠ শিল্পী হিসেবে ফেরদৌসী রহমান Pride of Performance পুরস্কারে ভূষিত হন। ফেরদৌসী রহমান পৃথিবীর বহু দেশে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি হিসেবে গেছেন এবং ১৫-২০টি ভাষায় গান গেয়েছেন।

নতুনভাবে নিজেকে আবিষ্কার করেন সংগীত পরিচালক হিসেবেও। মেঘের অনেক রং চলচ্চিত্রে তিনি সংগীত পরিচালনা করেন এবং এর জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এ ছাড়া তিনি একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯৫) লাভ করেন।

সংগীত একাডেমি ও গ্রন্থ

১৯৯০ সালের দিকে ফেরদৌসী রহমান প্রতিষ্ঠা করেন আব্বাসউদ্দীন সংগীত একাডেমি। ফেরদৌসী রহমানের লেখা দুটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। একটি ‘গান গেয়ে এলাম চীনে’ এবং অন্যটি ‘Social Life as Reflected in the Ballad of Isha Khan’ (বাংলা একাডেমি, ২০১৫)।

উপসংহার

বাংলাদেশে এবং দেশের বাইরে ফেরদৌসী রহমান গান, জ্ঞান ও প্রশংসনীয় জীবনযাপনের মাধ্যমে সবার শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন। তিনি এক অনন্য ব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশের এক অজাতশত্রু, পূজনীয় নাম। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের অন্যতম এবং একজন অসাধারণ মানুষ ফেরদৌসী রহমান। তাঁর জন্মদিনে শতকোটি প্রণাম।

লেখক: ড. নাশিদ কামাল, শিল্পী ফেরদৌসী রহমানের ভ্রাতুষ্পুত্রী। তিনি পরিসংখ্যানের অধ্যাপক, সংগীতশিল্পী, লেখক ও অনুবাদক।