ভারতের লোনাভালার কাছে অবস্থিত ঐতিহাসিক লোহাগড় দুর্গে সম্প্রতি এক দর্শনার্থীর মৃত্যুর ঘটনা দুর্গটিকে আবারও আলোচনায় নিয়ে এসেছে। প্রাথমিকভাবে এটিকে দুর্ঘটনাবশত পড়ে গিয়ে মৃত্যু বলে ধরে নেওয়া হলেও পরে পুলিশ অন্যান্য দিক খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করে। এই ঘটনার সঙ্গে অলৌকিক কোনও বিষয়ের যোগসূত্র না থাকলেও, এর ফলে লোহাগড় দুর্গকে ঘিরে থাকা বহু পুরোনো রহস্যময় গল্পগুলো নতুন করে সামনে এসেছে।
লোহাগড় দুর্গের অবস্থান ও জনপ্রিয়তা
সাহিয়াদ্রি পর্বতমালায় অবস্থিত লোহাগড় বা লোহার দুর্গ মূলত ট্রেকিংয়ের জন্য বেশ জনপ্রিয়। তবে এর অপরূপ বর্ষাকালীন সৌন্দর্য আর মারাঠা ইতিহাসের আড়ালে লুকিয়ে আছে শতাব্দী প্রাচীন কিছু উপাখ্যান ও ভুতুড়ে গল্প, যা যুগ যুগ ধরে স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের মুখে মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
গণেশ দরজার রহস্যময় গল্প
দুর্গের ২ হাজার বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত গল্পটি জড়িয়ে আছে এর প্রথম প্রধান ফটক ‘গণেশ দরজা’র সঙ্গে। লোককথা অনুযায়ী, মারাঠা আমলের এক দুর্গ প্রশাসক স্বপ্নে দেখেন যে এই ফটকের ভিত্তিটি অভিশপ্ত ও নড়বড়ে। কাঠামোটি শক্তিশালী করতে সেখানে এক পুরুষ ও এক নারীকে জীবন্ত সমাহিত করে নরবলি দেওয়া হয়েছিল। এই দাবির পক্ষে কোনও ঐতিহাসিক প্রমাণ না থাকলেও, ট্রাভেল ইনফ্লুয়েন্সার লিয়াম রিচার্ডসসহ অনেক কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও স্থানীয় গাইডের বদৌলতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গল্পটি এখনও বেশ জনপ্রিয়। ইতিহাসবিদেরা অবশ্য মনে করেন, এটি কেবলই লোককথা, কোনও নথিবদ্ধ ইতিহাস নয়।
রাতের বেলা রহস্যময় ছায়ামূর্তি ও শব্দ
ফটকের লোকগাথা ছাড়াও দুর্গের দেয়ালে শেষ রাতে রহস্যময় ছায়ামূর্তি হাঁটাচলা করতে দেখার দাবি করেন অনেক ট্রেকার। সবচেয়ে প্রচলিত গল্পটি হলো এক অদৃশ্য প্রহরীর। একা থাকা পর্যটকদের সামনে দূর থেকে ইশারা করে পরক্ষণেই সে হাওয়া হয়ে যায় বলে অনলাইনে অনেকে দাবি করেন। এর পাশাপাশি সূর্যাস্তের পর দুর্গের নির্জন অংশে শিস দেওয়া, পায়ের আওয়াজ বা অদ্ভুত সব শব্দ শোনার কথাও বলেন অনেকে। বিশেষ করে বর্ষাকালে যখন কুয়াশা আর তীব্র বাতাস দুর্গটিকে ঘিরে ধরে, তখন এই শব্দগুলো বেশি শোনা যায়। তবে সংশয়বাদীদের মতে, দুর্গের স্থাপত্যশৈলী আর পাহাড়ি বাতাসের মিথস্ক্রিয়াতেই এমন শব্দের সৃষ্টি হয়।
লোহাগড়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
সাতবাহন আমলে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হওয়া এই লোহাগড় দুর্গটি একসময় ছত্রপতি শিবাজীর শাসনামলে মারাঠাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ঘাঁটি, কোষাগার ও প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল। পরবর্তীতে এটি ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। দুর্গের ভেতরে এখনও বিশালাকার পাথরের তোরণ, প্রাচীন পানির চৌবাচ্চা এবং বিচ্ছুর লেজের মতো দেখতে দীর্ঘ শৈলশিরা বিঞ্চু কাটা টিকে রয়েছে। ভারতের অন্যান্য প্রাচীন দুর্গের মতো লোহাগড়কে নিয়েও গুপ্ত সুড়ঙ্গ ও লুকানো গুপ্তধনের গুঞ্জন রয়েছে। কোনও প্রমাণ না থাকলেও, প্রাচীন এই ধ্বংসাবশেষের ইতিহাস আর অলৌকিক আবহ পর্যটকদের কৌতূহলকে প্রতিনিয়ত বাড়িয়ে চলেছে।



