জীবনানন্দ দাশের জীবন ও মৃত্যুর রহস্য
‘বনলতা সেন’ চলচ্চিত্রটি জীবনানন্দ দাশের জীবনের ওপর আলো ফেলার পাশাপাশি তার মৃত্যুর সলুকসন্ধান করেছে। কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, সেটাও বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে। মাসুদ হাসান উজ্জ্বল সুনিপুণ দক্ষতায় নির্মাণ করেছেন এই চলচ্চিত্র।
চলচ্চিত্রের মূল চরিত্র ও চিত্রায়ণ
চলচ্চিত্রের মূল চরিত্র জীবনানন্দ এবং তাঁর অমর সৃষ্টি বনলতা সেন। যার গল্প মোটামুটি সবারই জানা। তবু প্রায় আড়াই ঘণ্টা আপনি সবকিছু ভুলে আটকে থাকবেন পর্দায়। অসাধারণ চিত্রায়ণ, মনে কাঁপন ধরানো আবহসংগীত, নিখুঁত অভিনয়, জিজ্ঞাসু সংলাপ, সর্বোপরি চোখজুড়ানো সব দৃশ্যের নির্মাণ।
সময়ের সাথে ফিরে যাওয়া
সেই সময়টাকে এতটাই জীবন্ত করে তোলা হয়েছে, যেন আপনার মনে হবে আপনি সত্যি সত্যিই ওই সময়ে ফিরে গেছেন। জীবনানন্দ দাশের জীবনের চড়াই–উতরাইগুলোয় আপনিও যেন চাইবেন কবিকে সামান্য হলেও একটু সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে।
জীবনানন্দের সংসার জীবন ও বাবা হিসেবে পরিচয়
আমরা সবাই জানি, জীবনানন্দ দাশ সংসার জীবনে সুখী ছিলেন না। তাই যখন জীবনানন্দ দাশের জীবনে লাবণ্য দাশের আগমন হতে যাচ্ছে, মহীনের সঙ্গে সঙ্গে আমরাও যেন কবিকে বলছি, আপনি বিয়ের দিকে এগোবেন না। সংসার জীবনে সুখী না থাকলেও লাবণ্য দাশের লেখা থেকে জানা যায়, বাবা হিসেবে ছিলেন আর্দ্র হৃদয়ের অধিকারী।
জীবনানন্দের কবিতা ও সাহিত্যকর্ম
জীবনানন্দ দাশের কোনো কবিতা আমাদের কোনো পাঠ্যবইয়ে ছিল কি না, তা স্মরণ নেই। অনেক বড় বয়সে এসে কবির সঙ্গে পরিচয় হলো প্রিয় লেখক শাহাদুজ্জামানের লেখা ‘একজন কমলালেবু’ পড়ে। এরপর ‘বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আকবর আলী খানের লেখা ‘চাবিকাঠির খোঁজে’ পড়লাম। এরপর জীবনানন্দ দাশের স্ত্রী লাবণ্য দাশের লেখা ‘মানুষ জীবনানন্দ’ পড়লাম। অনলাইনে–অফলাইনে আরও অনেক লেখা পড়লাম তাঁকে নিয়ে।
জীবনানন্দের লেখালেখি ও ভাষার বৈশিষ্ট্য
লেখালেখিটা ছিল যেন তাঁর একমাত্র জায়গা, যেখানে তিনি একটু সময়ের জন্য হলেও বুক ভরে শ্বাস নিতেন। বাংলাদেশে এমন একটা কথা প্রচলিত আছে: ব্যর্থ প্রেমিকেরাই দিন শেষে কবি হন। সেদিক দিয়ে কথাটা জীবনানন্দের ক্ষেত্রেও হয়তোবা সত্য। তবে আমাকে মুগ্ধ করে জীবনানন্দের কবিতার ভাষা ও শব্দ। কত রকমের রূপক যে লুকিয়ে আছে প্রতিটা শব্দে, প্রতিটা লাইনে।
সমসাময়িক সাহিত্যিকদের মনোভাব
সমসাময়িক সাহিত্যিকেরা জীবনানন্দের কবিতাকে হেয়ালি বলেই চালিয়ে দিতে চেয়েছেন। কিন্তু জীবনানন্দের কবিতার ভাষা ছিল সময়ের তুলনায় অনেক আগানো; কারণ, তাঁর পড়াশোনা ছিল অনেক। উপমহাদেশের সমসাময়িক সব সাহিত্যের বাইরেও পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তের সাহিত্যের খবর রাখতেন। আর জীবনের কশাঘাতগুলো তাঁর ভাষাকে করেছিল আরও শাণিত।
মৃত্যুর পর স্বীকৃতি
জীবনানন্দের মৃত্যুর পর যেন আমরা একটা ভান্ডারের সন্ধান পেলাম। আর জীবনানন্দের বয়স আটকে গেল সেই পঞ্চান্নতেই। জীবনানন্দের মৃত্যুর দীর্ঘ বাহাত্তর বছর পর মাসুদ হাসান উজ্জ্বল তাঁকে নিয়ে ‘বনলতা সেন’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করে তাঁর প্রতি আমাদের করা অন্যায়ের যেন কিছুটা হলেও দায় শোধ করলেন।
অভিনয় ও অন্যান্য দিক
ছবির পাত্র–পাত্রী সবাই দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন। খায়রুল বাসার, নাবিলা, সোহেল মন্ডল পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন। আর বাকি চরিত্রগুলোও ছিল সাবলীল। বাপ্পা মজুমদারের গানটা যেন মনের বীণায় বেজে উঠেছিল। বিভিন্ন কবিতার অংশ পাঠ ছিল বাড়তি পাওনা। ক্যামেরার কাজগুলোও দুর্দান্ত। কিছু কিছু ফ্রেম তো মনে গেঁথে আছে।
ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা
মাসুদ হাসান উজ্জ্বলকে ধন্যবাদ, আমাদের হয়ে দায়টা কাঁধে নিয়ে এমন একটা ছবি নির্মাণের ঝুঁকি নেওয়ার জন্য। পথ প্রোডাকশনকে ধন্যবাদ, ছবিটা অস্ট্রেলিয়ার দর্শকদের দেখার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।



