পৃথিবী মানুষের বসবাসের অযোগ্য! বাতাসে অক্সিজেনের বদলে ভরে গেছে অ্যামোনিয়াসহ নানা বিষাক্ত গ্যাসে। বাঁচার তাগিদে পুরো মানবজাতি পৃথিবী ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছে বৃহস্পতির আইও উপগ্রহে। পৃথিবী পড়ে আছে বিষাক্ত ও পরিত্যক্ত হয়ে। ঠিক এ রকমই এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের গল্প নিয়ে তৈরি হয়েছে সায়েন্স ফিকশন মুভি 'আইও'।
গল্পের শুরু
গল্পের শুরু হয় তরুণ বিজ্ঞানী স্যাম ওয়ালডেনকে ঘিরে। পুরো মানবজাতি যখন পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে, তখনো স্যাম রয়ে গেছেন পৃথিবীতে। অনেক উঁচু এক পাহাড়ের চূড়ায়, যেখানে বাতাস এখনো কিছুটা বিশুদ্ধ, সেখানে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজের এক ছোট্ট গবেষণাগার। স্যাম বিশ্বাস করেন, পৃথিবী এখনো পুরোপুরি মরে যায়নি। প্রকৃতি ঠিকই এই বিষাক্ত পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে। সেই আশায় তিনি মৌমাছি পালন করেন, চেষ্টা করেন এমন এক প্রজাতির মৌমাছি তৈরি করতে, যারা এই বিষাক্ত বাতাসেও বেঁচে থাকতে পারে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা যায় অভিযোজন।
নতুন মোড়
গল্পে নতুন মোড় আসে যখন হঠাৎ একদিন একটি হিলিয়াম বেলুনে চড়ে স্যামের ডেরায় এসে হাজির হন মিকাহ। মিকাহর লক্ষ্য, স্যামের বাবার তৈরি করা লঞ্চপ্যাড ব্যবহার করে আইওগামী শেষ স্পেস শাটলটি ধরা। এখান থেকেই শুরু হয় দুজনের আদর্শিক লড়াই। মিকাহ বিশ্বাস করেন, পৃথিবীর আর কোনো আশা নেই, মানবজাতির ভবিষ্যৎ এখন মহাকাশেই। অন্যদিকে স্যাম আঁকড়ে ধরে আছেন পৃথিবীকে সারিয়ে তোলার ক্ষীণ আশা।
সিনেমাটোগ্রাফি ও পরিবেশ
মুভিটির সবচেয়ে বড় শক্তি এর সিনেমাটোগ্রাফি এবং পরিবেশের বর্ণনা। পরিত্যক্ত পৃথিবীর নিঃসঙ্গতা, বিষণ্ণতা ও শূন্যতা খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে পর্দায়। সায়েন্স ফিকশন হলেও এটি মূলত একটি স্লো-বার্ন ড্রামা। পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে মানবজাতির অস্তিত্ব যে কতটা হুমকির মুখে পড়তে পারে, তার একটি দার্শনিক ও মনস্তাত্ত্বিক রূপ দেখানো হয়েছে এখানে। পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য স্যামের সেই টিকে থাকার লড়াই এবং গবেষণার অংশটুকু বিজ্ঞানপ্রেমীদের ভালো লাগবে।
দুর্বলতা ও সমালোচনা
তবে 'দ্য মার্শিয়ান' বা 'ইন্টারস্টেলার'-এর মতো শ্বাসরুদ্ধকর থ্রিল বা বৈজ্ঞানিক প্রবলেম সলভিংয়ের উত্তেজনা আপনি এই মুভিতে পাবেন না। এর গল্প এগিয়েছে খুবই ধীরগতিতে। মুভিটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এর বৈজ্ঞানিক ত্রুটি এবং ক্লাইম্যাক্স। মুভির শেষে স্যাম হঠাৎ করেই মাস্ক খুলে ফেলেন এবং পৃথিবীর বিষাক্ত বাতাসে দিব্যি শ্বাস নিতে শুরু করেন, যা বৈজ্ঞানিকভাবে একদমই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। হাজার বছরের অভিযোজন রাতারাতি এক প্রজন্মের মধ্যে ঘটে যাওয়াটা বিজ্ঞানের যুক্তিতে ধোপে টেকে না। এ ছাড়া গল্পে বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর অসম্পূর্ণই থেকে গেছে।
অভিনয় ও চরিত্র
পুরো মুভিতে মূলত এই দুটি চরিত্রই পর্দায় ছিল। স্যাম চরিত্রে মার্গারেট কোয়ালির অভিনয় ছিল বেশ পরিমিত। একজন নিঃসঙ্গ বিজ্ঞানীর একাকিত্ব, জেদ এবং পৃথিবীর প্রতি তাঁর যে গভীর ভালোবাসা, তা তিনি খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। অন্যদিকে মিকাহ চরিত্রে অ্যান্থনি ম্যাকিও দারুণ ছিলেন, যিনি হতাশা ও বেঁচে থাকার তাড়নার মধ্যে আটকে থাকা একজন মানুষের রূপ দিয়েছেন নিখুঁতভাবে। তবে দুজনের মধ্যকার রসায়ন আরও একটু পরিণত হতে পারত।
সারসংক্ষেপ
অ্যাকশন বা থ্রিলার খুঁজলে এই মুভি হয়তো আপনার জন্য নয়। কিন্তু আপনি যদি পরিবেশ, বিজ্ঞান এবং মানুষের অস্তিত্ব নিয়ে ধীরলয়ের কোনো মনস্তাত্ত্বিক ড্রামা পছন্দ করেন, তবে অবসরে 'আইও' দেখে নিতে পারেন।
একনজরে 'আইও'
- পরিচালক: জোনাথন হেলপার্ট
- ধরন: সায়েন্স ফিকশন, ড্রামা
- অভিনয়: মার্গারেট কোয়ালি, অ্যান্থনি ম্যাকি
- মুক্তি: ২০১৯
- ব্যাপ্তি: ১ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট



