কোক স্টুডিওর 'রুমঝুম' গান: বিতর্ক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
কোক স্টুডিওর 'রুমঝুম' গান: বিতর্ক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

সম্প্রতি কোক ষ্টুডিও বাংলা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি গান ‘রুমঝুম ঝুমঝুম রুমঝুম ঝুম’ সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেছে। কবির ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এই গানটির সাথে তুর্কি গান “উসকে দারা গিদার একিন” যুক্ত করা হয়েছে, যা সামাজিক মাধ্যমে প্রশংসার পাশাপাশি কিছুটা বিতর্কও সৃষ্টি করেছে। কোকস্টুডিওর ভাষ্য অনুযায়ী, কবি এই তুর্কি গানের সুর দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে রুমঝুম গানটি লিখেছিলেন। গান দুটির সংগীতায়োজন নিঃসন্দেহে চমৎকার এবং শ্রোতাদের মাঝে বিপুল সাড়া পেয়েছে।

বিতর্কের উৎস

কিন্তু সমালোচকদের বক্তব্য হলো, রুমঝুম গানটি তুর্কি সুরের নয় বরং আরব্য সুরের। উসকে দারা গানটি থেকে নজরুল যে দুটি গান লিখেছিলেন তা যথাক্রমে “ত্রিভুবনে প্রিয় মুহাম্মদ” এবং “শুকনো পাতার নূপুর পায়ে”। ফলে সমালোচকদের দাবি অনুযায়ী কোক ষ্টুডিওর বক্তব্য তথ্যের অসঙ্গতি তৈরি করেছে। তবে কবি কোন আরব্যগানের সুর দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে রুমঝুম গানটি লিখেছিলেন তার সূত্র জানা যায় না। গানটি অবশ্য “চৌরঙ্গী” সিনেমায় গীত হয়েছিল বলে উল্লেখ রয়েছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

কবি নজরুল যেহেতু আরবি, ফারসি, তুর্কি ভাষার সাথে অল্পবিস্তর পরিচিত ছিলেন, সেইসব দেশের সুরের অনুপ্রেরণাও বিশেষ করে ইসলামী গানগুলোতে ব্যবহার করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের এই সুরগুলো মূলত মেলোডিক মাইনর স্কেল, ছন্দ তাল এবং আবহ একই ধরনের এবং নৃত্যের মাধ্যমে বহুল ব্যবহৃত। মধ্যপ্রাচ্যের সংগীত ঐতিহ্য নিজেই বহু শতাব্দী ধরে পারস্য, আরব, আনাতোলিয়া বা তুরস্ক, লেভান্ট, মেসোপটেমিয়া অর্থাৎ মধ্য এশিয়ার একে অপরের সাথে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের সুগভীর ঐতিহ্য রয়েছে। ফলে একটি সুরের ভেতর আরবি মাকাম, তুর্কি মেলোডিক মোড এবং পারস্যীয় অলঙ্করণের মিল পাওয়া খুব স্বাভাবিক!

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

“রুমঝুম ঝুমঝুম রুমঝুম ঝুম” গানটির ভেতর মধ্যপ্রাচ্যীয় আবহ থাকা অস্বাভাবিক নয়। কোক স্টুডিও এই আয়োজনে যখন তুর্কি গানের সুররেখা ও বাদ্যযন্ত্রের আবহ ব্যবহার করেছে, তখন নজরুলের গানটি বিদেশি হয়ে যায়নি; বরং তার অন্তর্নিহিত মধ্যপ্রাচ্যীয় রঙটি আরও স্পষ্ট হয়েছে এবং গানটি যেন তার ঐতিহাসিক উৎসের দিকে ফিরে গেছে বলে অনুভূত হয়েছে।

সাংস্কৃতিক আত্মীকরণ

এদেশের সংগীতচর্চার যেহেতু গায়কী ও বাদ্য সঞ্চালনের নিজস্বতা রয়েছে, ফলে যেকোনো বিদেশি সুর এদেশীয় গীত স্বাতন্ত্রে মূল রূপ থেকে সরে যায়। কোক ষ্টুডিও আয়োজিত এই গানের মধ্যে আমরা দেখতে পেয়েছি যে তুর্কি বাদ্য বা এই জাতীয় সংগীত ব্যবহার করার কারণে ভিন্ন এমনকি প্রাচ্যীয় রং তৈরি হয়েছে। উসকে দেরা গানটি তুর্কি দুইজন কণ্ঠশিল্পীর কণ্ঠে এবং বাংলা গানটি বাঙালি দুইজনের কণ্ঠে গীত হবার কারণে রুমঝুম ঝুমঝুম গানটি শুনতে অন্যরকম লাগছে। এই ব্যাপারটিকে অনেক শ্রোতা বিকৃত মনে করছেন, কিন্তু আমার মনে হয়েছে সুরটি অনেকটা শিকড়ে ফিরে গেছে এবং দুইটি গানের সুরের সম্পর্কমূলক বা একিভূত হয়ে যাওয়া, সেই রূপটি কিন্তু দর্শক বা শ্রোতার কাছে বেশ আনন্দ বা আবেদন সৃষ্টি করেছে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে নজরুলের এই গানটি বর্তমান সময়ের সঙ্গীত বা শিল্পভাবনার সাথে যুক্ত হতে চায়, এমনকি বাঙালির গান সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি আমাদের দেশের সঙ্গীতানুসঙ্গে অভিজাত্যের ছোঁয়া বাণিজ্যিকীকরণের জন্য সক্ষমতার প্রশ্নে নতুন মাত্রা রেখেছে। নজরুল ইসলামের আগে আরও অনেকেই বিদেশি সুর অবলম্বনে বাংলা গান লিখেছেন। রোমান্টিকযুগের বহির্বিশ্ববাদ থেকে বিদেশি সুর আত্মীকরণ করে নিজের জাতির জন্য উপহার প্রদান করার মতবাদটি এসেছে। ফলে সুরটি নজরুলের মৌলিক হিসেবে যারা প্রমাণ করতে চান তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, বিদেশি সুর অনুকরণ উনিশ ও বিশ শতকের একটি আন্দোলন যার মধ্য দিয়ে জাতীয়তাবাদ ও বহির্বিশ্ববাদের বিকাশ ঘটেছিল। সারাবিশ্বেই এই ঘটনাটি ঘটেছে।

সুরের জাতীয় পরিচয়

এখানে একটি প্রশ্ন আসে, সুরের উৎস কি গানের জাতীয় পরিচয় নির্ধারণ করে? সম্ভবত না। কারণ শিল্পে আত্মীকরণ এবং পুনর্নির্মাণ সবসময়ই ঘটেছে। নজরুল মধ্যপ্রাচ্যের সুরভাষাকে বাংলা ভাষা ও আবেগের মধ্যে রূপান্তর করে বিশ্বসংস্কৃতিকে আত্মস্থ করে জাতীয় শিল্পে রূপ দিয়েছেন। তাই কোক স্টুডিওর এই প্রয়াসকে বিকৃতি না বলে বরং ঐতিহাসিক সুরস্মৃতির পুনর্শ্রবন বলা যেতে পারে। কারণ তারা মূল গানটিকে ধ্বংস করেনি; বরং এমন এক আন্তর্জাতিক শ্রোতা-পরিসরে নিয়ে গেছে, যেখানে একজন তুর্কি বা আরব শ্রোতাও গানটির ভেতর পরিচিত আবহ খুঁজে পেতে পারেন।

উপসংহার

দেশজ কণ্ঠ ও দেশজ গায়কি বিদেশি সুরকেও নতুন পরিচয় এনে দিতে পারে। কারণ সুর কখনোই কেবল স্বরের সমষ্টি নয়; বরং তা কণ্ঠ, ভাষা, উচ্চারণ, বাদ্য, সামাজিক স্মৃতি সব মিলিয়েই তার সাংস্কৃতিক পরিচয় গঠিত হয়। তাই একই সুর তুরস্কে একরকম, বাংলায় আরেকরকম আবেগ সৃষ্টি করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, রুমঝুম গানের নতুন উপস্থাপনাটি বিতর্কের চেয়ে বরং আন্তঃসাংস্কৃতিক সংগীত-সংলাপের একটি সুন্দর উদাহরণ মনে করা যেতে পারে।

লেখক পরিচিতি: ড. সাইম রানা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং পুরস্কার বিজয়ী গবেষক, সংগীত পরিচালক ও শিল্পী। জাপান ও কোরিয়ায় স্কলারশিপ নিয়ে সংগীত প্রশিক্ষণসহ ২০০৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর বিশেষ আগ্রহের বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে সংগীততত্ত্ব, গণসংগীত, চলচ্চিত্র ও নাট্যসংগীত, সৃজনশীল প্রবন্ধসহ কবিতা। তিনি ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল ফর ট্রাডিশন্স অব মিউজিক এন্ড ড্যান্স-এর সদস্য ও বাংলাদেশের লিয়াজোঁ অফিসার। তিনি শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালনার জন্য ২০১৪ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, ২০১০ সালে দৈনিক প্রথম আলো শ্রেষ্ঠ বই পুরস্কার এবং ২০২০ সালে স্প্রাউটিং সিড আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসব শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালকের পুরস্কার, এবং ২০২২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিনস অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থ ৯টি।