ডেভিলস টাওয়ার: ভিনগ্রহীদের পাহাড়ের অদ্ভুত কাহিনি
ডেভিলস টাওয়ার: ভিনগ্রহীদের পাহাড়ের কাহিনি

সমতল ভূমি থেকে পাহাড়টি ৮৬৭ ফুট উঁচু। এই বিশাল পাথুরে পাহাড়টি দেখতে খুব অদ্ভুত। মনে হয় যেন একটা বিশাল গাছের গোড়া কেটে রাখা হয়েছে। ৫০ বছর আগে ভিনগ্রহীদের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ নিয়ে একটি মুভি বের হয়। নাম ‘ক্লোজ এনকাউন্টারস অব দ্য থার্ড কাইন্ড’। এটি বানিয়েছিলেন বিশ্বখ্যাত পরিচালক স্টিভেন স্পিলবার্গ। সেই মুভিতে একটি পাহাড় দেখানো হয়। পাহাড়টির নাম ডেভিলস টাওয়ার। এটি আমেরিকার ওয়াইওমিং অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত। মুভিতে দেখানো পাহাড়টি হয়ে ওঠে ভিনগ্রহীদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম।

মুভির প্রভাব

১৯৭৬ সালে এই পাহাড়ে মাত্র ১২ মিনিটের একটি দৃশ্য ধারণ করা হয়েছিল। এরপরের বছরই মুক্তি পায় বিশ্বখ্যাত সেই ছবি, যা বিশ্বজুড়ে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করে। তবে এর চেয়ে বড় প্রভাব পড়ে পাহাড়টির ওপর। মুভিটি মুক্তির পর হঠাৎ সেখানে পর্যটকদের ভিড় প্রায় ৭৬ শতাংশ বেড়ে যায়। আগে যেখানে বছরে দেড় লাখ মানুষ আসত, সেখানে দর্শনার্থীর সংখ্যা একলাফে পৌনে তিন লাখে গিয়ে ঠেকে।

ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব

মুভিটির বাইরেও এই পাহাড়ের গুরুত্ব অনেক পুরোনো। ১৯০৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট এটিকে আমেরিকার প্রথম জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ ঘোষণা করেন। তবে এরও কয়েক শ বছর আগে থেকে স্থানীয় আদিবাসীদের কাছে এটি অত্যন্ত পবিত্র স্থান। এখানকার গাছে ঝুলতে থাকা আদিবাসীদের প্রার্থনার কাপড়ে হাত দেওয়া বা ছবি তোলা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

লোককথা অনুযায়ী, এক বিশাল ভালুকের নখের আঁচড়েই পাহাড়ের গায়ে এমন লম্বা লম্বা খাঁজ তৈরি হয়েছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, ডেভিলস টাওয়ার নামটি আসলে একটি ভুল অনুবাদের কারণে হয়েছে। এ কারণে ইদানীং পাহাড়টির নাম বদলে আদিবাসীদের দেওয়া পুরোনো নামে ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি উঠেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভূতাত্ত্বিক গঠন

পাহাড়টি কীভাবে তৈরি হলো, তা নিয়ে ভূতত্ত্ববিদদের মধ্যে নানা মত রয়েছে। তবে সবাই একমত যে এর শুরুটা হয়েছিল ম্যাগমা দিয়ে। প্রায় পাঁচ কোটি বছর আগে এই ম্যাগমা ভূপৃষ্ঠের ওপর উঠে আসে ও ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে শক্ত হতে থাকে। ঠান্ডা হওয়ার সময় এতে বিশেষ ধরনের ফাটল ধরে, যা থেকে তৈরি হয় লম্বা লম্বা স্তম্ভের মতো আকৃতি। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় কলামনার জয়েন্টিং। এরপর কয়েক কোটি বছর ধরে বৃষ্টির পানি ও বাতাসের ক্ষয়প্রাপ্তিতে চারপাশের নরম মাটি সরে গিয়ে এই বিশাল আকৃতি নেয়।

এটি ফোনোলাইট পোরফাইরি নামক একটি বিরল আগ্নেয়শিলা দিয়ে গঠিত। এখানকার একেকটি ষড়্‌ভুজাকৃতির স্তম্ভ প্রায় ১০ ফুট পর্যন্ত চওড়া। এই বিচিত্র গঠনের কারণে পাহাড়টি পর্বতারোহীদের কাছে ভীষণ জনপ্রিয়। প্রতিবছর প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ এই পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করেন। তবে সবার জন্য এটি নিরাপদ নয়।

পর্যটকদের জন্য আকর্ষণ

যাঁরা পাহাড়ে চড়তে চান না, তাঁদের জন্য এখানে চমৎকার হাইকিং পথ রয়েছে। বিশেষ করে সূর্যাস্তের সময় জয়নার রিজ ট্রেইল থেকে পাহাড়ের দৃশ্য অসাধারণ। পার্কের গেটের কাছেই রয়েছে প্রেইরি ডগদের এক বিশাল এলাকা। কাঠবিড়ালির মতো দেখতে এই ছোট প্রাণীগুলো। ৬০০–এর বেশি প্রাণী মাটির নিচে গর্তের পর বাস করে এই এলাকায়। পর্যটকেরা গাড়ি থামিয়ে এদের দারুণ সব অঙ্গভঙ্গির দৃশ্য উপভোগ করেন।

মুভি শুটিং ও বর্তমান অবস্থা

মজার ব্যাপার হলো, ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিস মূল পার্কের ভেতরে শুটিং করার অনুমতি দেয় না ‘ক্লোজ এনকাউন্টারস অব দ্য থার্ড কাইন্ড’ মুভির জন্য। তাই পরিচালক স্পিলবার্গ ড্রিসকিল শুটিংয়ের জন্য স্থানীয় লোকজনের ভূমি ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেন। বর্তমানে সেখানে ১৫০টির বেশি থাকার জায়গা রয়েছে, যা পর্যটকদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়। এমনকি সত্তরের দশক থেকে আজ পর্যন্ত প্রতি গ্রীষ্মে সেখানে খোলা আকাশের নিচে সেই বিখ্যাত মুভিটি দেখানো হয়।

বর্তমানে সেখানকার কিছু পরিবার পাহাড়ের পাদদেশে কাউবয় ও এলিয়েন থিমের দোকান ও গলফ কোর্স চালায়। বাস্তবে এখানে কখনো ভিনগ্রহী বা ইউএফও দেখা যায় না। আর সেখানকার কেউ কখনো এলিয়েন দেখেননি। তবে প্রায় বিশাল উল্কা পড়তে দেখে যায়। মূলত পর্বতারোহণ ও শৈশবের মুভির দৃশ্য নিজ চোখে দেখতে হাজার হাজার মানুষ এখানে যান।