বাংলাদেশের কথাসাহিত্য বা উপন্যাস সাহিত্য নিয়ে প্রচলিত ধারণা মিশ্র। কেউ কেউ মনে করেন আমাদের উপন্যাস এখনও শিশু, পরিপুষ্টি লাভ করেনি। আবার অনেকে স্বাধীনতা-পরবর্তী উপন্যাস নিয়ে আশাবাদী। নোবেল পুরস্কার একমাত্র মানদণ্ড নয়, তবু প্রশ্ন থাকে—আমাদের উপন্যাস বিশ্বসাহিত্যে কোথায় দাঁড়িয়ে? উপন্যাস যেভাবে সাহিত্যের শক্তিশালী শাখা হিসেবে এগিয়েছে, সে তুলনায় আমাদের উপন্যাস খুব প্রসারিত নয়। তবে দেশকাল, সমাজ, ইতিহাস ও ব্যক্তিমানুষের নানা টানাপোড়েন নিয়ে যে রচনা আমরা পেয়েছি, তার মূল্য আছে। অনেক সস্তা জনপ্রিয় উপন্যাসের বাইরে মূল চরিত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা উপন্যাসও আমাদের রয়েছে, তবে সংখ্যায় সামান্য। স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশক পরে গুণমানের দিকে নজর দেওয়ার সময় এসেছে।
আহমদ ছফা: স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষক
যারা সত্যিকার পথ নির্মাণ করেছেন, তাদের আমরা কখনো মূল্যায়নে ভুল করেছি, তাদের আলো নিয়ে প্রদীপ জ্বালাতে পারিনি। এক বেপথু পাঠকগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। পঞ্চাশ, ষাট বা সত্তরের মহান লেখকদের মধ্যে আহমদ ছফা অন্যতম। তিনি অনেক শাখায় লিখেছেন, কিন্তু কথাসাহিত্য তাকে বিশিষ্টতা দিয়েছে। তিনি কখনো প্রচল ছকে উপন্যাস লেখেননি। তার মেধা, মনন, যুক্তি ও প্রজ্ঞা—যা তার প্রবন্ধের শক্তি—সেই উপাদান তিনি উপন্যাসে ব্যবহার করেছেন। স্বাধীনতা ও তৎপরবর্তী বাংলাদেশের পরিবর্তন তিনি তীক্ষ্ণভাবে পর্যবেক্ষণ ও উপলব্ধি করেছিলেন। কিছুটা বিমর্ষ, হতাশ ও রাগি আহমদ ছফা উপন্যাসে তার মানবিক প্রত্যয়ের ছবি তৈরি করেছেন। তিনি সাহসী ছিলেন; যেসব কথা কেউ তার সময়ে বলতে পারেননি, তা অকপটে বলেছেন।
তাকে শক্তিমান ঔপন্যাসিক বলতে কুণ্ঠাবোধ হয় না। তার নিজস্ব চিন্তাচেতনা, পঠনপাঠন ও সামাজিক পর্যবেক্ষণ তার উপন্যাসকে স্বতন্ত্র করেছে। তিনি বাংলা ভাষায় ইউরোপীয় উপন্যাস লিখতে চাননি; ঘটনার বাড়াবাড়ি সেখানে দেখা যায় না। আহমদ ছফার লেখক সত্তার সাথে তার সাধারণ জীবনযাপনের পার্থক্য নেই। তিনি নিজেকে মুসলমান বাঙালি ভাবতে ভালোবাসতেন। কৃষক পরিবারের সন্তান হয়ে তার মধ্যে মহৎ মানবের গুণাবলি লক্ষ্য করা যায়। বিস্তর পঠনপাঠন তাকে লেখক করে তুলেছে—এটা বলা ঠিক হবে না; বরং দেশের প্রতি, সাধারণ মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা ও দায়বোধ থেকেই তিনি লেখক হয়ে উঠেছেন।
সলিমুল্লাহ খানের দৃষ্টিতে আহমদ ছফা
সলিমুল্লাহ খান আহমদ ছফাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তার একটি মন্তব্য: "নিজের জাতিকে এমন গরিমার সহিত ভালোবাসেন আহমদ ছফার তেমন সমান বা দ্বিতীয় কোনো লেখক আজও আমার এই অল্প জীবনের সজ্ঞার মধ্যে পড়ে নাই। তার সকল লেখার গোড়ায় ভালোবাসা। এই ভালোবাসার জোরেই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের সশস্ত্র সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধে শরিক হয়েছিলেন। তিনি আশা করেছিলেন, স্বাধীনতা বাংলাদেশের হাজার বছরের পুরনো সমাজে নতুন জীবন গড়ার সুযোগ নিয়ে আসবে। সে আশা পূরণ হয় নাই। বাংলাদেশের সমাজ তবু থেমে থাকে নাই। আহমদ ছফার প্রায় সকল কাহিনি এই ভালোবাসার, এই নিরাশা আর কষাঘাতের সাক্ষী।"
ধারণা করা যায়, হতাশার কারণে তিনি খানিকটা খেপে গিয়েছিলেন এবং প্রবন্ধে যেমন সরাসরি অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন, উপন্যাসে সেটা করতে পারেননি; তাই শ্লেষাত্মক ভঙ্গি ব্যবহার করেছেন অনেক সময়। ছফা ‘সূর্য তুমি সাথী’-কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। সলিমুল্লাহ খান নিজে একথার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি মনে করেন, ‘সূর্য তুমি সাথী’ তার একমাত্র প্রথম এবং শেষ উপন্যাস। প্রশ্ন উঠতে পারে: ছফা এটিকে তার সেরা উপন্যাস বললেও বাকিগুলো খারিজ করেননি; তাহলে সলিমুল্লাহ খান কোন যুক্তিতে বাকি উপন্যাস খারিজ করলেন? দ্বিতীয় প্রশ্ন: ছফার অন্য উপন্যাসগুলোকে কী নামে অভিহিত করব? ‘ওঙ্কার’ বা ‘অলাতচক্র’-কে আমরা উপন্যাস বলতে চাই। উপন্যাসের ফর্মের বাঁধাধরা নিয়ম না থাকলেও পৃথিবীর সেরা উপন্যাসকে ভিত্তি ধরে একটা ফর্ম দাঁড়িয়ে গেছে; ছফা সেটা জানতেন না বলব না, তিনি সেটা হয়তো মানতে চাননি।
‘পুষ্প বৃক্ষ ও বিহঙ্গ পুরাণ’: প্রকৃতির আখ্যানে মানবিক সত্য
আহমদ ছফার ‘পুষ্প বৃক্ষ ও বিহঙ্গ পুরাণ’ একটি ছোট কলেবরের কম আলোচিত রচনা। আপাতভাবে মনে হতে পারে ফুল, বৃক্ষ ও পাখি নিয়ে তিনি দুটো গল্প উপস্থাপন করেছেন। এটা ঠিক যে দুটো আখ্যানের মধ্যে সাযুজ্য থাকলেও একটি উপন্যাসের জন্য এরকম দুটো প্রসঙ্গ একসাথে রাখার তেমন উপন্যাসোচিত যুক্তি নেই। তবে আমরা যদি ধরেই নিই যে তিনি প্রচল ধারার উপন্যাসের ফর্ম মানেন না, তাহলে বলতে হবে এটি বিশেষ ধরনের উপন্যাস। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সামূহিক মানবিক বিপর্যয়ের অবর্ণনীয় ছবি আহমদ ছফাকে অসম্ভব উত্তেজিত করে তুলেছিল। শিক্ষিত-অশিক্ষিত সব ধরনের মানুষের অধঃপতন থেকে মুক্তি পাবার জন্য ফুল, বৃক্ষ ও পাখির প্রতি তিনি ঝুঁকে পড়েছেন বা এদের আশ্রয় করে তার প্রতিবাদ জারি রেখেছেন।
এই রচনাকে সমালোচকেরা সঠিক অর্থে উপন্যাস বলবেন না। তাতে খুব বেশি কিছু আসে যায় না। এটিতে ছফা পুষ্প, বৃক্ষ ও বিহঙ্গ নিয়ে কোনো বৃত্তান্ত লেখেননি; বরং এটি তার বাস্তব অভিজ্ঞতার ফসল। তিনি যেভাবে বলেছেন, যে নাম ব্যবহার করেছেন, প্রায় ক্ষেত্রে তা বাস্তব। বাস্তবতা ও শিল্পের মধ্যে যে ব্যবধান লেখকেরা মানেন, ছফা তা মানেনি। তিনি দু-একটি ছোটখাটো পরিবর্তন (স্মৃতি বিস্মরণজনিত কারণেও) করেছেন। এই উপন্যাসের প্রধান শক্তি হলো ঔপন্যাসিকের নিজস্ব মনোপ্রতিন্যাস। আপাতভাবে খ্যাপাটে রাগী আহমদ ছফা এখানে প্রকৃতি, কীটপতঙ্গ বা বিহঙ্গের প্রতি যে অনুরাগ দেখিয়েছেন বা তাদের মধ্য দিয়ে মানবজীবনের গভীর সত্যকে উপলব্ধি করেছেন; এই উপলব্ধিজাত অনুভবকে তার দার্শনিক সজ্ঞা বলা যেতে পারে। তিনি আবিষ্কার করেছেন এক গভীর অনুধ্যানের জগৎ, যা মানবজীবনের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। এই চেতনা খুব নতুন নয়; কারণ ঔপনিষদিক চিন্তাভাবনার সাথে এর মিল পাওয়া যাবে।
গাছের প্রাণ বা পাখিদের সাথে মানবের সংলাপ বা তাদের আঁতের কথা বের করে আনার কাজ তাৎপর্যপূর্ণ। ধারণা করা অন্যায় হবে না যে, তিনি মানবপ্রজাতির অবিরাম অমানবিক ও অসামাজিক কাজের প্রতিবাদ করতেই প্রকৃতির মুক মুখে ভাষা খুঁজে পেয়েছিলেন। ফুল, বৃক্ষ ও পাখিদের সংস্পর্শে তিনি এসেছিলেন স্বাভাবিকভাবে, এবং তাদের মধ্যে এই সব সত্য আবিষ্কার করার পরে তা বিন্যস্ত করার চেষ্টা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকায় তিনি সত্যি সত্যি সবজি চাষ করেছিলেন। বীজ সংগ্রহ, মাটি তৈরি, সার সংগ্রহ এবং ধীরে ধীরে নিবিড় যত্নে যেভাবে ফুল বা সবজি তৈরি করেছিলেন, তার যাবতীয় খুঁটিনাটি তিনি বর্ণনা করেছেন। যাদের কাছে ফুল ফোটানো বা গাছ বড় হয়ে ওঠার ব্যাপার আনন্দময় ঘটনা নয়, তাদের কাছে বিষয়টি বাহুল্য বা ক্লিশে মনে হতে পারে। কিন্তু মানবচৈতন্যে আনন্দযোগের নানা রকম হেতু থাকে; আমাদের আকাঙ্ক্ষার বৈচিত্র্যপূর্ণ বাতাবরণের প্রমাণ এই জাতীয় আখ্যান। বড় দাগের বা স্থূল বিষয়ের বাইরে আমাদের সূক্ষ্ম বোধ নিয়ে আখ্যান রচিত হতে পারে এবং তা মানুষকে পুলকিত করতে পারে—সেটা এই রচনায় লক্ষ্য করা যাবে। এই বোধ শুদ্ধবোধ এবং নান্দনিক বোধ। এরই আশ্লেষে আমরা মানবজীবনের গভীর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বুঝে উঠতে পারি।
উপন্যাসের শেষ দর্শন: মুক্তি ও ঐক্য
উপন্যাসের শেষের দিকে আমরা লক্ষ্য করি, ইত্তেফাকের সাংবাদিক মোস্তান বস্তিবাসী ছেলেমেয়েদের জন্য একটি বিদ্যালয় চালু করেন। মোস্তান নিজের সন্তানদেরও বস্তির ছেলেমেয়েদের সাথে বসিয়ে দেন। তার ধারণা, এদের সাথে না মিশলে তার ছেলেমেয়ে মানুষ হয়ে উঠতে পারবে না। অনেক কষ্টে সেখানে একটি ঘর তিনি বানাতে পারেন। নিজের লাগানো ক্ষেতের সবজি দিয়ে বস্তিবাসী সবাইকে নিয়ে খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করেন লেখক। উদ্দেশ্য: এই মূল্যবান সবজি প্রথম এই অসহায় ছেলেমেয়েদের খাওয়ানো উচিত।
পাখি নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ এবং পর্যবেক্ষণজাত অভীক্ষা তাকে নিঃসন্দেহে একেকটি থিসিস হিসেবে বিবেচনা করা যায়। দুই পর্বের প্রসঙ্গের মধ্যে আপাতভাবে পার্থক্য থাকলেও ছফা সেটা থাকতে দেননি তার রচনার শক্তি দিয়ে। পাখি নিয়ে এই কাণ্ডকারখানা নতুন নয়। সব কবি ও কাহিনিকার এ নিয়ে নানা রচনা তৈরি করেছেন। ফরিদউদ্দীন আত্তার ‘কনফারেন্স অব দি বার্ড’ নামে মধ্যযুগে একটি রূপক কাব্য লিখেছিলেন। রূপকথায় পাখি নিয়ে তেলেসমাতি রয়েছে শত শত। পাখি নিয়ে ছফা যা করতে পেরেছেন, তা কম কিছু নয়। পাখিপুত্র হিসেবে তিনি একটি পাখিকে গ্রহণ করেছেন, যে হারিয়ে গিয়েছিল, আবার ফিরে আসে। কাক নিয়ে তার কথাবার্তা কতদূর অনুমোদনযোগ্য বা বিশ্বাস্য, তা নতুন ধরনের ব্যাখ্যা দাবি করে। বুলবুলি, ঘুঘু ও শালিক—নানাজাতের পাখির চরিত্র তিনি নির্মাণ করেছেন। পাখি সমাজের নানা স্বভাব-সংস্কৃতি তিনি আবিষ্কার করেছেন, এমনকি কখনো ভাষা আবিষ্কারও করে ফেলেছেন।
শেষের দিকে তিনি বলেছেন, মনুষ্যজাতির হিংস্রতা দেখে তিনি বৃক্ষ ও পাখি সমাজের আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানেও বিভেদ ও হানাহানি আবিষ্কার করলেন। তিনি মানুষ বলেই তাকে আবার মানুষের জগতে ফিরে আসতে হবে। তবে তার এই অভিজ্ঞতা অতুলনীয়; অন্য কোনোভাবে কোথাও থেকে এটা তিনি পেতেন না। তার বয়ান থেকে শোনা যাক: "এই পুষ্প, এই বৃক্ষ, এই তরুলতা, এই বিহঙ্গ আমার জীবন এমন কানায় কানায় ভরিয়ে তুলেছে, আমার মধ্যে কোনো একাকিত্ব, কোনো বিচ্ছিন্নতা আমি অনুভব করতে পারিনি। সকলে আমার মধ্যে আছে, আমি সকলের মধ্যে রয়েছি। আমি আমার পাখি পুত্রটির কাছে বিশেষভাবে ঋণী। আমার পাখিপুত্রটি আমাকে যা শিখিয়েছে, কোনো মহৎ গ্রন্থ, কোনো তত্ত্বকথা, কোনো গুরুবাণী আমাকে সে শিক্ষা দিতে পারেনি। একমাত্র অন্যকে মুক্ত করেই মানুষ নিজের মুক্তি অর্জন করতে পারে। আমার পাখিপুত্র মুক্ত, আমি মুক্ত, আমাদের সম্পর্ক থেকে প্রত্যহ অমৃত উৎপাদন হয়। এই আকাশের জীবনের সঙ্গে আমার জীবনের যে সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে, সেটা কি সমুদ্রে অবগাহন নয়?"
উপন্যাস শেষ পর্যন্ত একটি দর্শন দ্বারা শেষ হয়েছে। সেই দর্শনের যুক্তি কতটুকু পোক্ত, তা নিয়ে তর্ক হতে পারে। তবে এটি ঠিক যে, তিনি এই সব উদ্ভিদ ও প্রাণীদের মধ্যে জীবন যাপন করেছেন, সেই জীবনকে তিনি ভালোভাবে চেনেন; সেই জীবনের গভীর উপলব্ধিকে তিনি মূল্য দিয়েছেন। এই বোধ বা উপলব্ধি তার ব্যক্তিগত হলেও তা সমানভাবে আমাদের প্রভাবিত করে। আমাদের ভাবতে হবে যে এই বোধ মৌলিক। মানবজীবনের অনেক সত্য থাকে, তাকে আবিষ্কার করতে হয়। এই আবিষ্কারের চোখ সবার থাকে না। আমাদের চারপাশে কত গুরুত্বহীন জিনিসের মধ্যে মানবজীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে। এই উপন্যাস ব্যতিক্রমী—এ অর্থে এটি মানবজীবনের গভীর একটি সত্যকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। উপন্যাসের কাঠামোগত দুর্বলতা লক্ষ্য করা গেলেও নতুনত্বের জন্য, নতুন বিষয়বস্তুর জন্য উপন্যাসটি মহৎ হয়ে উঠেছে।



