আমি যদি আরেকটি ক্যান্ডি না পাই, তাহলে আমি কাঁদব। আমি কত জোরে কাঁদতে পারি, তা দেখলে আপনি অবাক হয়ে যাবেন। মা কিন্তু সেটা মোটেও পছন্দ করবেন না। ধন্যবাদ। ক্যান্ডি আমার ভীষণ প্রিয়। বয়সের তুলনায় আমি বেশ ভদ্র—সবাই এমনটাই বলে। এভাবে আমি আরও বেশি ক্যান্ডি আদায় করতে পারি। বয়স্ক নারীরাই এ ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো। আমি খুব বুদ্ধিমতী একটা মেয়েও বটে। তবে আমার ধারণা, আপনাদের পরীক্ষাগুলো থেকে সেটা আপনি ইতিমধ্যে বুঝে গেছেন। তারাও আমাকে ঠিক এ ধরনেরই কিছু পরীক্ষা করতে দিয়েছিল, কিন্তু তারা আমাকে কোনো ক্যান্ডি দেয়নি। তাই আমি দুষ্টুমি করেছি। কোনো কিছুরই সঠিক উত্তর দিইনি।
ক্যান্ডির বিনিময়ে সত্যি কথা
আপনাকে ধন্যবাদ। এবার আমি দুটি নেব। আপনার কাছে কি শক্ত কোনো ক্যান্ডি আছে? গরমে এই চকলেটগুলো একটু গলে গেছে। বাবা বলেছেন, আপনার কাছ থেকে আমি যেন যতটা সম্ভব আদায় করে নিই। কারণ, আপনারা ভিয়েনিজ মাথা পাগলেরা সবাই হাতুড়ে। বাবা বলেছেন, আপনারা গাদা গাদা টাকা নেন। তিনি বলেন, একমাত্র বুড়ো ভণ্ডদেরই ছাগলের মতো এমন দাড়ি থাকে। তিনি বলেন, আপনি কি রেগে যাচ্ছেন? ঠিক আছে, তাহলে আমাকে আরেকটা ক্যান্ডি দিলে আপনাকে সব কথা খুলে বলব। মার্সি। এটা ফরাসি শব্দ, জানেন তো।
মহাকাশযান ও পিঁপড়ের খেলা
মহাকাশযানটা যখন নামল, তখন আমি আর আমার ভাই জনি পেছনের উঠোনে পিঁপড়ে পিষে মারছিলাম। পিঁপড়ে দেখতে মাঝেমধ্যে বেশ মজা লাগে। ওরা মুখে ছোট ছোট ডালপালা আর টুকিটাকি জিনিস নিয়ে নিজেদের কাজে কত আশা নিয়ে এদিক-ওদিক ছুটে বেড়ায়। যতক্ষণ না আপনার পা ওদের প্রায় ছুঁয়ে ফেলছে, ততক্ষণ ওরা বুঝতেই পারে না যে আপনি ওখানে আছেন। তারপর পিষে যাওয়ার ঠিক আগে শুঁড় নেড়ে ওরা পালাতে চেষ্টা করে। তবে বড় লাল পিঁপড়েগুলোই সবচেয়ে মজার। আপনি চাইলে সটান ওদের ওপর লাফিয়ে পড়তে পারেন, ওরা যেন সেটা টেরই পায় না। আমার মনে হয়, ওরা মাটির একটু ভেতরে দেবে যায়। কারণ, দুটি পাথরের মাঝখানে রেখে ছেঁচলে ওরা কোনো ঝামেলা ছাড়াই পিষে যায়। ওদের স্বাদটা বেশ অদ্ভুত। একবার জনি একটা লাল পিঁপড়েকে কালো পিঁপড়ের সঙ্গে মারামারি করতে দেখেছিল। ওরা অনেকক্ষণ মারামারি চালিয়েই যাচ্ছিল। জনি ওর আতশি কাচ দিয়ে দুটিকেই পুড়িয়ে না মারা পর্যন্ত ওরা মারামারি চালিয়ে গেল।
আমি আপনাকে সেই গল্প বললে, আপনি কি আমাকে একটা আতশি কাচ কিনে দেবেন? আমার একটা আতশি কাচ খুব দরকার। বাজি ধরে বলতে পারি, পিঁপড়েটা ভাবে, সূর্যটা বুঝি আকাশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। বাজি ধরে বলতে পারি, ও ভাবে পুরো পৃথিবীটাই বুঝি পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। নিশ্চয়ই খুব লাগে তখন। বাজি রেখে বলতে পারি, জনির চেয়ে আমি এক বছরের ছোট হলেও ওর চেয়ে আমিই বেশি পিঁপড়ে পুড়িয়ে মারতে পারব। ওর বয়স ১০। প্লিজ, আমাকে একটা আতশি কাচ দেবেন? প্লিজ? প্লিজ? দেবেন তো? দেবেন? নইলে কিন্তু আমি কাঁদব। কখন পাব আমি ওটা? ধন্যবাদ।
পিঁপড়ার ঢিবি আর মহাকাশযানের শব্দ
সেদিন ওর জন্মদিন ছিল। তাই আমি ওকে পিঁপড়ের ঢিবির কাছেরগুলো মারতে দিয়েছিলাম। আমি মাঝেমধ্যে সত্যি খুব উদার। আপনি ওদের গর্তের প্রায় ভেতর পর্যন্ত যেতে দেবেন, তারপর তার ওপর লাফিয়ে পড়বেন। ওতেই সবচেয়ে বেশি মজা। আমি একটা পিঁপড়ের পা ছিঁড়ে ফেলেছিলাম। তাকিয়ে দেখছিলাম, অন্য পিঁপড়েগুলো এসে ওকে খায় কি না। ঠিক তখনই জনি আমাকে তাড়াতাড়ি যাওয়ার জন্য চিৎকার করে উঠল। আমি সঙ্গে সঙ্গে সেখানে ছুটে গেলাম। ও আমাকে দেখাল, একটা পিঁপড়ে আরেকটা পিঁপড়েকে পিঠে করে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা পিষে ফেলার আগেই সেটাকে ঢিবির ভেতর নামিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। আমরা ঠিক যখন ওর ছোট্ট মাথার ওপর পা দিয়ে পিষে ফেলতে যাব, তখনই আকাশে শব্দটা শুনতে পেলাম। স্কুলে ব্ল্যাকবোর্ডে নখ ঘষলে যে রকম একটা খসখসে শব্দ হয়, শব্দটা ছিল অনেকটা সে রকম। বুড়ি মিস কুপারকে ভয় দেখানোর জন্য আমি এ রকম শব্দ করি। মিস কুপারকে দুই চোখে দেখতে পারি না। তিনি আমাকে কোনো ক্যান্ডি দেন না—ধন্যবাদ। সে জন্যই তো আমি কখনোই তার কোনো প্রশ্নের উত্তর দিই না।
শব্দ শুনে আমরা ওপরের দিকে তাকালাম। দেখলাম, রকেটশিপটা বনের ভেতর নামছে। আমার কাছে ওটাকে কোনো স্পেসশিপ বলে মনে হয়নি। তবে জনি বলল, ওটা নাকি তা-ই। আমার কাছে ওটাকে একটা পেল্লায় আকারের ওয়াশিং মেশিনের মতো লাগছিল। বাবা বলেন, ওটা নাকি হ্যালুসিনেশন। আমি এমন বড় বড় কঠিন শব্দ পছন্দ করি। কিন্তু তিনি তো ওটা দেখেনইনি, তাহলে তিনি কীভাবে জানবেন? মাঝেমধ্যে আমি বাবাকে খুব ঘৃণা করি। আপনি কি ওটা লিখে নিচ্ছেন? ও কথাটা কি বলা ঠিক হলো? আমি কি আরও কয়েকটা ক্যান্ডি পেতে পারি? ধন্যবাদ।
এলিয়েনদের সাথে সাক্ষাৎ
এটা গলে গেলেও খেতে বেশ দারুণ। আমি তো ভাবতাম, আপনার অফিসটাকে অন্তত এয়ারকন্ডিশন্ড করার মতো সামর্থ্য আপনার আছে। তাহলে ক্যান্ডিগুলো আর এমন গলে যেত না। আপনি চালাক হলে এসব নিয়ে ভাবতেন। তারপর কী হলো? আমি বারবার সবাইকে বলেছি, কিন্তু কেউই আমার কথা বিশ্বাস করে না। দুঃখজনক না বিষয়টা? আমার মনে হয় না, আমি আর কাউকে এ ব্যাপারে কিছু বলব। পুরো বাক্সটা? আমার জন্য? আপনাকে ধন্যবাদ। চকলেট আমার ভীষণ, ভীষণ প্রিয়। আপনার দাড়িটা আসলে ছাগলের দাড়ির মতো ততটা খারাপ নয়।
আমরা ওটাকে বনের ভেতর নামতে দেখলাম আর দৌড়ে সেই জায়গাটার দিকে গেলাম। ওখানে আর কেউ ছিল না। ঘাস আর ঝোপঝাড় একটু একটু জ্বলছিল। তবে ওরা আগুনটা নিভিয়ে ফেলছিল। আমাদের দেখে ওরা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে অদ্ভুত সব শব্দ করতে লাগল। আমি হাত তুলে বললাম, ‘আমি এখানকার রানি। তোমাদের সবাইকে আমার সামনে মাথা নোয়াতে হবে।’ জনিও হাত তুলে বলল, ‘আমি রাজা।’ ও নিজের থেকে কিছুই ভাবতে পারে না। আমি ওদের ঘৃণা করি। ওরা আমার সামনে মাথা নোয়ায়নি। ওরা নামার সময় একটা কাঠবিড়ালির গায়ে সামান্য ছ্যাঁকা লেগেছিল। ওদের একজন সেটাকে কোলে তুলে আদর করছিল আর পোড়া জায়গাটাতে কী যেন লাগিয়ে দিচ্ছিল। আমার দিকে একটুও ফিরে তাকাল না। আমার ওর ওপরই সবচেয়ে বেশি রাগ হলো। তাই আমি এগিয়ে গিয়ে ওকে একটা লাথি কষলাম। ও জনির চেয়ে ছোট ছিল, তাই জনিও ওকে লাথি মারল। তবে আমিই ওকে আগে লাথি মেরেছিলাম। ও ছিল ঠিক আমার সমান।
মহাকাশযানের ভেতরে পরীক্ষা
ওদের দেখতে কেমন ছিল? ওদের দেখতে মোটেও খুদে বুড়ো ছাগলের মতো ছিল না। ওরা আমাদের ওদের মহাকাশযানের ভেতরে নিয়ে গেল। আপনি যেমন পরীক্ষা নিয়েছেন, সে রকম কিছু পরীক্ষা নিতে শুরু করল। পরীক্ষাগুলো খুব সহজ ছিল। কিন্তু আমার ওসব ভালো লাগেনি। তাই আমি সব কটির ভুল উত্তর দিলাম। জনিও সব ভুল উত্তর দিল। কারণ, আমি ওকে বলেছিলাম, ভুল উত্তর না দিলে আমি আঁচড়ে ওর চোখ উপড়ে নেব। আমার এর মধ্যে কয়েকটা মনে আছে। ওরা ছোট ছোট ত্রিভুজ আঁকল, যার দুই পাশে বাক্স ছিল। তারপর আমাকে কলমটা দিয়ে আমি কী করি, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। আমি ওদের বোকা বানিয়ে দিলাম। আমি কলমটা নিয়ে ওদের সবার গায়ে কালি ছিটিয়ে দিলাম। ওটা ঠিক কলম ছিল না, তবে কলমের মতোই দেখতে। তারপর ওরা একটা ছোট্ট ব্লক উঁচিয়ে ধরল, এরপর দুটি, তারপর তিনটি, এরপর চারটি। ওরা এমনটা কয়েকবার করল। তারপর একটা ব্লক উঁচিয়ে ধরল, এরপর দুটি। তারপর ওরা অপেক্ষা করতে লাগল, আমি কখন ৩ নম্বরটা তুলি। আমি সব কটি ব্লক হাতে তুলে নিলাম। তারপর সেগুলো দিয়ে ওদের মাথায় আঘাত করলাম। আমার খুব মজা লেগেছিল। আমি খুব দুষ্টু ছিলাম।
জনির অভিনয় আর পিঁপড়ে পিষে মারা
ওরা জনিকে এক কোণায় নিয়ে গেল, আর আপনি ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়ার আগেই ও ওদের বলতে শুরু করল, যুদ্ধে ও কত মানুষকে খুন করেছে। সে অবশ্য কোনো যুদ্ধেই যায়নি, কিন্তু ওর ভান করতে ভালো লাগে। যখন অনেক মানুষকে মেরে ফেলা হয়, তখন ওর টেলিভিশন দেখতে সবচেয়ে ভালো লাগে। আমার মনে হয় না, ও কী বলছিল ওরা তার বিন্দুবিসর্গও বুঝতে পারছিল। কিন্তু ওদের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছিল, যেন সব বুঝছে। ও খুব ভালো একজন অভিনেতা। আমার ধারণা, ওরা আমাদের প্রাপ্তবয়স্ক ভেবেছিল। ওরা আকার-আকৃতিতে বেশ খানিকটা আমাদের মতোই ছিল। যা-ই হোক, ওরা ওকে বেশ পাত্তা দিচ্ছিল। তাই আমি এগিয়ে গিয়ে ওকে দু-তিনটি ঘুষি মারলাম। আমার মনে হয়, আমরা ওদের মহাকাশযানের ভেতরের জিনিসপত্র একটু-আধটু ভেঙে ফেলেছিলাম। ওদের দেখে বেশ রাগান্বিত মনে হচ্ছিল। আমার মনে হয়, ওরা জনির ওপর ত্যক্তবিরক্ত হয়ে পড়েছিল। অনেকেই হয়। আমি সব সময় অপরিচিতদের ওপর ভালো ছাপ ফেলার চেষ্টা করি। এমনকি তারা আমাকে ক্যান্ডি না দিলেও। তাই আমি ওদের কয়েকজনকে বাইরে নিয়ে এলাম আর কীভাবে পিঁপড়ে পিষে মারতে হয়, তা দেখালাম। ব্যাপারটা খুব মজার ছিল। ওদের একজন সেটা দেখে অসুস্থ হয়ে পড়ল।
শেষ কথা
ওরা যখন উড়াল দিল, তখনো আমি আর জনি লাফিয়ে লাফিয়ে পিঁপড়ে পিষে মারছিলাম। আমি ওদের ঘৃণা করি। ওরা খুব বাজে ছিল। ওরা আমার সামনে মাথা নোয়ায়নি। এটুকুই। আর কিছুই হয়নি। বাবা বলেছেন, আপনার মহামূল্যবান সময় বেশি নষ্ট না করতে। তিনি বলেন, কোনো সৎ মানুষের পক্ষে অফিসের জন্য পেন্টহাউস কেনা সম্ভব নয়। আপনার এখান থেকে বাইরের দৃশ্যটা খুব সুন্দর দেখা যায়, তাই না? এখান থেকে আপনি পুরো শহর দেখতে পান। ওরে বাবা, কী গরম, তাই না? ইশ্, আমার ক্যান্ডিগুলো রাখার জন্য যদি একটা ফ্রিজ থাকত। ওই দিকে দেখুন। নদীর ওপারে কীভাবে আগুন জ্বলে উঠছে দেখুন। কী সুন্দর লাগছে না? দেখুন। দেখুন। আর এই দিকেও কিছুটা। আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলুন। বড্ড গরম লাগছে। সূর্যের দিকে তাকান। তাকান ওটার দিকে। ওটা আকাশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। ওটা পুরো শহরটাকে পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে। ছাগল-দাড়ি, আমাকে বাঁচান! আমাকে বাঁচান। আমাকে মাফ করে দিন, আমি খুব দুষ্টু ছিলাম।



