আন-কমন শাড়ির দোকানে অদ্ভুত কেনাকাটার অভিজ্ঞতা
আন-কমন শাড়ির দোকানে অদ্ভুত কেনাকাটা

সিডনি থেকে ঢাকায় কয়েক দিনের সফরে এসে লেখক মাসুদ পারভেজ স্ত্রীর সঙ্গে অভিজাত এলাকার একটি শাড়ির দোকানে যান। দোকানের নাম ‘আন-কমন’। ভেতরে ‘ফিক্সড প্রাইস’ সাইন ও সুন্দর সাজসজ্জা দেখে নামের সার্থকতা খুঁজে পান। কেনাকাটা প্রায় শেষ হলে তিরিশের কাছাকাছি এক দম্পতি দোকানে ঢোকেন।

ক্রেতার অদ্ভুত প্রশ্ন

ভদ্রমহিলা বিক্রেতাকে বলেন, “আপনাদের এবারের লেটেস্ট কালেকশন দেখাবেন, প্লিজ?” বিক্রেতা জানতে চান কী ধরনের শাড়ি নেবেন—সুতি, সিল্ক, জামদানি, কাতান, বেনারসি নাকি কাঞ্জিবরণ। ভদ্রমহিলা কাঞ্জিবরণের নাম শুনে বলেন, “এই নাম তো কোনো দিন শুনিনি, নিশ্চয়ই দাদি-নানিদের সময়ের?” বিক্রেতা বলেন, “না, ম্যাডাম।”

ভদ্রমহিলা সুতির কাপড়ের ভেতর চিকচিক করে, মসলিনের মতো এমন শাড়ি চান। বিক্রেতা টাঙ্গাইল থেকে আনা নতুন শাড়ি দেখান। কিন্তু ভদ্রমহিলা বলেন, “এটা তো একেবারেই সাধারণ। আপনাদের দোকানের নাম আন-কমন আর আপনি দেখাচ্ছেন সবাই পরে এমন শাড়ি!”

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিক্রেতার ধৈর্য ও ক্রেতার অসন্তোষ

বিক্রেতা মাত্র ১০ পিস আনা একটি শাড়ি দেখান, যার মধ্যে দুই পিস বাকি। ভদ্রমহিলা প্রশ্ন করেন, “এটা কত পার্সেন্ট বিক্রি হয়েছে? আর সেটা কীভাবে আন-কমন হয়?” তিনি সিল্কের শাড়ি দেখতে চান। বিক্রেতা গত বছরের স্টক দেখিয়ে বলেন, “তেমন বিক্রি হয় না, মনে হয় আন-কমন হবে।” ভদ্রমহিলা রেগে বলেন, “আমার সঙ্গে ইয়ার্কি হচ্ছে?”

এরপর জামদানি দেখাতে বলেন। বিক্রেতা সোনারগাঁওয়ের জামদানিপল্লি থেকে আনা জুঁই ফুল, কনকতারা, নয়নবাহার, সজনী, কাজললতা নকশার শাড়ি দেখান। ভদ্রমহিলা বলেন, “এইগুলো তো মনে হচ্ছে গামছার নাম। জামদানি বাদ দিয়ে কাতান দেখাবেন, প্লিজ?”

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রঙের জটিলতা

কাতান শাড়ির জন্য ভদ্রমহিলা বলেন, “কম দামের মধ্যে কিন্তু দেখতে দামি মনে হবে এমন।” বিক্রেতা জানতে চান সিম্পল না গর্জিয়াস দেখাবেন। ভদ্রমহিলা বলেন, “সিম্পলের মধ্যে গর্জিয়াস দেখান।” তারপর রঙ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “অনেকটা অরেঞ্জ কালারের মধ্যে, যেমন ধরেন মাছের তরকারির ঝোলের মতো রং।” বিক্রেতা জিজ্ঞাসা করেন, “রুই, কাতলা নাকি অন্য কোনো মাছের ঝোলের রং?” ভদ্রমহিলা বলেন, “মুরগির মাংস ঝাল দিয়ে রাঁধলে যেমন রং হয় তেমন।” বিক্রেতা আবার জানতে চান, “দেশি মুরগি না ব্রয়লার মুরগি? আর ঝাল কতটুকু হবে?” ভদ্রমহিলা বিরক্ত হয়ে বলেন, “আচ্ছা, আপনি কি রং চেনেন না?”

বিক্রেতা পাকিস্তানি শাড়ি দেখান। ভদ্রমহিলা ভারতীয় কালেকশন চান। বিক্রেতা রঙের বর্ণনা চাইলে ভদ্রমহিলা বলেন, “চিরতার পাতা সারা রাত ঠান্ডা পানিতে ভিজিয়ে রেখে সকালে মার্কিন কাপড় দিয়ে ছেঁকে, কাচের গ্লাসে রাখলে যে রকম রং হয় ঠিক তেমন।” বিক্রেতা সেই রঙের শাড়ি দেখান। ভদ্রমহিলা বলেন, “বেশ হালকা লাগছে, আরেকটু গাঢ় কালারের দেখাবেন?”

বেনারসি শাড়ি ও শেষ পর্যায়

ভদ্রমহিলা বেনারসি শাড়ি দেখতে চান। বিক্রেতা ভারী না হালকা কাজ জানতে চাইলে ভদ্রমহিলা বলেন, “আমার মনে হয় আপনি খুব একটা মনোযোগী নন। একটু আগেই বলেছি সিম্পলের মধ্যে গর্জিয়াস।” বিক্রেতা আসমানি কালারের বেনারসি দেখান। ভদ্রমহিলা বলেন, “আমি ভাবছি আপনাকে কে এই দোকানে চাকরি দিয়েছে? লাল রং ছাড়া কি বেনারসি শাড়ি হয়?” বিক্রেতা লাল ও মেরুন শাড়ি দেখান। ভদ্রমহিলা বলেন, “গত সপ্তাহে পার্টিতে আরমিন ভাবি এক্সাটলি এই মেরুন বেনারসি শাড়িটা পরেছে। এটা কীভাবে আন-কমন হয়?”

ভদ্রমহিলা আরও অন্য রকম আন-কমন শাড়ি চান। বিক্রেতা ডিসপ্লেতে সাজানো কাঞ্জিবরণ শাড়ি দেখান। ভদ্রমহিলা বলেন, “ও তাই নাকি? আইডিয়াটা তো খারাপ না! কিন্তু ডিসপ্লেতে রয়েছে কত দিন?” বিক্রেতা বলেন, “গত এক সপ্তাহ।” ভদ্রমহিলা বলেন, “তাহলে আর কেমন করে আন-কমন হয়? আই এম টোটালি কনফিউজড।”

লেখক ও তার স্ত্রী মুচকি-চাপা হাসি নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে আসেন।

সিডনিতে আরেক আন-কমনের গল্প

লেখক সিডনিতে ট্রেনে বাংলা পত্রিকা পড়ছিলেন, যেখানে বাঙালির হারিয়ে যাওয়া রান্নার ৫ রেসিপি—পুঁটি মাছের শুঁটকিতে ঝাল কচুশাক, সিমের বিচির উম-ভাত, কচুপাতার খাটা, শজনে দিয়ে ছোলার ডাল, রুই মাছের মাথা দিয়ে কলার মোচা। পাশের সহযাত্রীর মোবাইলে বাংলা কথোপকথনে জানতে পারেন, কয়েক বন্ধু মিলে সিডনিতে অভিজাত বুটিক শপ খুলে ‘আন-কমন’ শাড়ির দোকান দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। লেখক তাদের সফল ব্যবসার জন্য শুভকামনা জানান।