প্যারিসসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে অ্যাওয়ার্ড ও সম্মাননা সংস্কৃতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা বেড়েই চলেছে। সমাজে অবদান রাখা ব্যক্তি ও সংগঠনকে স্বীকৃতি দেওয়ার যে সংস্কৃতি একসময় মর্যাদাপূর্ণ বলে বিবেচিত হতো, সেটির একটি অংশ এখন অনেকের চোখে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে।
বাণিজ্যিকীকরণের অভিযোগ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই চোখে পড়ে “ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড”, “ডায়াসপোরা এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড”, “গ্লোবাল রিকগনিশন” কিংবা “হিউম্যানিটারিয়ান অনার” শিরোনামে নানা আয়োজনের ঝলমলে প্রচারণা। বড় হলরুম, আকর্ষণীয় ব্যানার, আলোকসজ্জা ও অতিথি তালিকার মাধ্যমে অনুষ্ঠানগুলোকে জাঁকজমকপূর্ণভাবে উপস্থাপন করা হলেও, এর পেছনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই বাড়ছে।
কমিউনিটির একাধিক সূত্রের অভিযোগ, কিছু অনুষ্ঠানে স্পন্সর ফি, টেবিল চার্জ, ডোনেশন বা বিভিন্ন প্যাকেজের মাধ্যমে সম্মাননা নিশ্চিত করা হচ্ছে। ফলে প্রকৃত সামাজিক অবদান বা দীর্ঘদিনের কাজের মূল্যায়নের বদলে আর্থিক সামর্থ্যই অনেক ক্ষেত্রে হয়ে উঠছে মূল বিবেচ্য বিষয়।
শিক্ষার্থীর প্রতিক্রিয়া
এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সরবন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তামান্না জান্নাত বলেন, “সম্মাননা যদি টাকার বিনিময়ে নির্ধারিত হয়, তাহলে এটি আর স্বীকৃতি নয়; এটি কেবল সামাজিক মর্যাদা বিক্রির একটি কৌশল।”
অভিযোগ রয়েছে, ফ্রান্সের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে গড়ে ওঠা কিছু নামসর্বস্ব সংগঠন সারা বছর দৃশ্যমান কোনো সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা না করলেও বছরে একবার অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমেই নিজেদের সক্রিয় হিসেবে উপস্থাপন করে।
নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন
সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে সম্মাননা নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে। আন্তর্জাতিক মানের পুরস্কার প্রদানে সাধারণত নিরপেক্ষ জুরি বোর্ড, যাচাই-বাছাই, মনোনয়ন এবং মূল্যায়নের স্পষ্ট কাঠামো থাকে। কিন্তু সমালোচকদের দাবি, কিছু আয়োজনে এসবের কোনো দৃশ্যমান উপস্থিতি নেই। কে কোন অবদানের জন্য সম্মাননা পাচ্ছেন, তারও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকে না।
ফলে পুরো বিষয়টিকে অনেকে “স্টেজ সোয়াপ সংস্কৃতি” হিসেবে দেখছেন। যেখানে আয়োজকরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন, আর অংশগ্রহণকারীরা ছবি, প্রচারণা ও সামাজিক পরিচিতি অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন।
দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে প্রকৃত সমাজকর্মী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও মানবিক কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের অবদান ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যাবে। একই সঙ্গে কমিউনিটিতে সম্মাননা ও স্বীকৃতির প্রতি মানুষের আস্থাও কমে যাবে।
তবে সচেতন মহল বলছে, সব আয়োজনকে এক কাতারে ফেলা উচিত নয়। এখনও অনেক সংগঠন আন্তরিকভাবে কাজ করছে এবং প্রকৃত গুণীজনদের সম্মানিত করছে। কিন্তু কিছু প্রশ্নবিদ্ধ আয়োজন পুরো প্রবাসী কমিউনিটির সম্মাননা সংস্কৃতিকেই বিতর্কিত করে তুলছে।



