‘গোয়া’ বললেই সাধারণ পর্যটকদের চোখে ভেসে ওঠে সমুদ্রসৈকত, নৈশপার্টি আর সূর্যাস্তের চেনা দৃশ্য। তবে এর বাইরে দক্ষিণ গোয়ার চ্যান্সেলিম গ্রামের কাছে কুয়েলিম পাহাড়ের চূড়ায় লুকিয়ে আছে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এক ইতিহাস। সেখানে অবস্থিত ৪২৭ বছরের পুরোনো ‘থ্রি কিংস চ্যাপেল’ একদিকে যেমন অলৌকিক ও ভুতুড়ে গল্পের জন্য বিখ্যাত, তেমনি প্রতিবছর সেখানে অনুষ্ঠিত হয় গোয়ার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও বর্ণিল এক উৎসব।
ইতিহাস ও স্থাপত্য
পর্তুগিজ শাসনামলে ১৫৯৯ সালে ফাদার গনকালো কারভালহো ক্লাসিক পর্তুগিজ বারোক স্থাপত্যশৈলীতে এই গির্জাটি নির্মাণ করেন। পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত হওয়ায় এখান থেকে আরব সাগর এবং চারপাশের সবুজ গ্রামের মনোরম দৃশ্য দেখা যায়। দিনের বেলা এই স্থানটি ভীষণ শান্ত ও আধ্যাত্মিক মনে হলেও, সন্ধ্যা নামতেই এখানে এক রহস্যময় পরিবেশ তৈরি হয়; যা একে গোয়ার ‘ভুতুড়ে গির্জা’ হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে।
লোককাহিনী ও ভূতের গল্প
স্থানীয়দের মধ্যে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে প্রচলিত একটি লোককাহিনী অনুসারে, বহু বছর আগে তিন পর্তুগিজ রাজা এই অঞ্চল শাসন করতেন। তারা ক্ষমতাবান হলেও নিজেদের মধ্যে একক আধিপত্য নিয়ে সবসময় দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকতেন। একদিন বড় রাজা অন্য দুই রাজাকে এই গির্জায় খাবারের আমন্ত্রণ জানান এবং খাবারে বিষ মিশিয়ে তাদের হত্যা করেন। কিন্তু পরে নিজের কৃতকর্মের অনুশোচনা এবং স্থানীয় জনগণের শাস্তির ভয়ে তিনি নিজেও অবশিষ্ট বিষ পান করে আত্মহত্যা করেন।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, সেই তিন রাজার আত্মা আজও এই পাহাড়ে ঘুরে বেড়ায়। অনেকেই সেখানে জনমানুষহীন পরিবেশে পায়ের আওয়াজ শুনতে পান কিংবা দেয়ালে অদ্ভুত ছায়া দেখতে পান। এই ভয়ে রাতে কেউ সেখানে না গেলেও, রহস্যপ্রিয় পর্যটকদের কাছে এটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় এক স্থান।
বার্ষিক উৎসব: ফিস্ট অব দ্য থ্রি কিংস
বছরের বেশির ভাগ সময় গির্জাটি শান্ত থাকলেও প্রতিবছর ৬ জানুয়ারি এখানে বিখ্যাত ফিস্ট অব দ্য থ্রি কিংস বা তিন রাজার ভোজ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। যিশুখ্রিস্টের জন্মের পর তিন জ্ঞানী ব্যক্তির (ম্যাজাই) তাকে দেখতে যাওয়ার বাইবেলীয় কাহিনীকে স্মরণ করে এই উৎসবের আয়োজন করা হয়।
উৎসবের মূল আকর্ষণ হলো রাজকীয় শোভাযাত্রা, যেখানে স্থানীয় গ্রামগুলো থেকে ৮ থেকে ১২ বছর বয়সী তিনটি ছেলেকে রাজা সাজানো হয়। তারা রাজকীয় পোশাক ও মুকুট পরে বাদ্যযন্ত্র ও গ্রামবাসীদের উল্লাসের মধ্য দিয়ে পাহাড়ের ভিন্ন ভিন্ন পথ ধরে গির্জার দিকে এগিয়ে যায়। সেখানে বিশেষ প্রার্থনা শেষে তারা সেন্ট থমাস চার্চে যায় আশীর্বাদ নিতে।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্থানীয় ভাংগড নামের কিছু পরিবার এই উৎসবের আয়োজন করে আসছে, যাদের পূর্বপুরুষেরা এই গির্জা প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেছিলেন। ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতা, লোককাহিনী আর প্রকৃতির এক অদ্ভুত মেলবন্ধন দেখতে এবং চমৎকার সূর্যাস্তের ছবি তুলতে প্রতিবছর অসংখ্য পর্যটক এই প্রাচীন ও রহস্যময় গির্জায় ভিড় করেন।



