পল্লবীতে যুবদল নেতা হত্যার দুই শুটার গ্রেপ্তার: র্যাবের দাবি, বিদেশ পালানোর চেষ্টা ব্যর্থ
রাজধানীর পল্লবীতে থানা যুবদলের সদস্যসচিব গোলাম কিবরিয়াকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় জড়িত অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। র্যাবের দাবি, গ্রেপ্তারকৃতরা এই হত্যাকাণ্ডে শুটার হিসেবে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন এবং অবৈধ পথে পাশের দেশে পালিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়ে বৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
গ্রেপ্তারের বিস্তারিত বিবরণ
গতকাল বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে রাজধানীর পৃথক দুটি স্থান থেকে মো. রাশেদ ওরফে লোপন (৩৫) এবং মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে কাল্লু (৪০) নামের এই দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। র্যাব-৪-এর কোম্পানি কমান্ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহাবুদ্দিন কবির আজ শুক্রবার মিরপুরের পাইকপাড়ায় এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য নিশ্চিত করেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে রূপনগরের ইস্টার্ন হাউজিং এলাকায় অভিযান চালিয়ে রাশেদকে এবং উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের দিয়াবাড়ি এলাকা থেকে জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর রাশেদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর বাসা থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি বিদেশি রিভলবার ও তিনটি গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের পটভূমি ও পালানোর চেষ্টা
র্যাব কর্মকর্তা শাহাবুদ্দিন কবির বলেন, গোলাম কিবরিয়াকে হত্যার পর দুই শুটার রাশেদ ও জাহাঙ্গীর পালিয়ে যান। একপর্যায়ে র্যাব জানতে পারে, তাঁরা অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পর থেকে সীমান্তে কড়াকড়ি শুরু হলে তাঁরা অবৈধ পথে দেশ ছাড়তে ব্যর্থ হন।
নির্বাচন–পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে তাঁরা ঢাকায় ফিরে আসেন এবং বৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার জন্য পাসপোর্ট, ভিসাসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরির কাজ শুরু করেন। র্যাব এই খবর পেয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করে। জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত দুজন হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বলে র্যাব দাবি করেছে।
হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
র্যাবের দাবি অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডে ছয় থেকে সাতজন জড়িত ছিলেন। এর আগে জনি নামের একজন ধরা পড়েন এবং মাসুম নামের এক ব্যক্তি অস্ত্র সরবরাহ ও নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন। মো. মনির হোসেন (৩০) অস্ত্র সরবরাহ ও সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন, আর মো. সুজন (৩৫) নিহত কিবরিয়ার গতিবিধি নজরদারির দায়িত্বে ছিলেন।
হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে শাহাবুদ্দিন কবির বলেন, "রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।" আসামিদের স্বীকারোক্তি ও উদ্ধার করা ডিভাইস পরীক্ষা করে মিরপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী মশিউর রহমান ওরফে মশির সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে।
পল্লবী থানা যুবদলের সদস্যসচিব কিবরিয়া এলাকায় বেশ জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। অন্যদিকে, মশিউর রহমান ঝুট ব্যবসা, হাউজিং, আবাসন ব্যবসা ও ফুটপাতের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতেন। এসবের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন কিবরিয়া, তাই তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে র্যাব সূত্রে জানা গেছে।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ও তদন্তের অগ্রগতি
গত বছরের ১৭ নভেম্বর মিরপুর ১২ নম্বরের বি ব্লকের ‘বিক্রমপুর হার্ডওয়্যার অ্যান্ড স্যানিটারি’ নামের একটি দোকানে ঢুকে খুব কাছ থেকে গুলি করে গোলাম কিবরিয়াকে হত্যা করে মুখোশধারী তিন সন্ত্রাসী। পালানোর সময় সন্ত্রাসীরা গুলি চালালে এক রিকশাচালক গুরুতর আহত হন। সে সময় জনি নামের একজনকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেয় জনতা।
এ ঘটনায় নিহত কিবরিয়ার পরিবার পল্লবী থানায় হত্যা মামলা করে। পরে ১৮ নভেম্বর মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মনির হোসেন ও সুজনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। মামলাটি বর্তমানে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) তদন্ত করছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিবির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, কিবরিয়া হত্যার ঘটনায় এ পর্যন্ত মোট ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে ডিবি হেফাজতে থাকা অবস্থায় মোক্তার হোসেন (৪০) নামের এক আসামি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। যদিও পরিবারের অভিযোগ, ডিবি হেফাজতে নির্যাতনের কারণেই মোক্তারের মৃত্যু হয়েছে।
র্যাবের এই গ্রেপ্তার অপারেশনটি রাজনৈতিক অপরাধ ও সন্ত্রাস দমনে তাদের সক্রিয় ভূমিকারই প্রতিফলন বলে বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন। তবে মামলার বিস্তারিত তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া এখনও চলমান রয়েছে।



