চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযান: নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, কিন্তু চ্যালেঞ্জ অব্যাহত
জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ অভিযান: নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, চ্যালেঞ্জ অব্যাহত

জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযান: নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সমাধান প্রয়োজন

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার খবরটি নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক। কেননা, চট্টগ্রাম মহানগরের অদূরেই অবস্থিত এই চিহ্নিত সন্ত্রাসী নিয়ন্ত্রিত ‘স্বশাসিত অঞ্চল’ রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকেই মারাত্মকভাবে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছিল। বিশেষ করে জানুয়ারি মাসে অস্ত্র উদ্ধারের অভিযানে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলায় র‍্যাব সদস্যের নিহত হওয়ার পর সেখানে একটি সমন্বিত ও ব্যাপক অভিযান অত্যাবশ্যকীয় হয়ে উঠেছিল।

৯ ঘণ্টার অভিযানে অংশ নেন ৩,২০০ সদস্য

প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার ভোর পাঁচটা থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‍্যাব এবং পুলিশ সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী প্রায় ৯ ঘণ্টা ব্যাপী একটি অভিযান পরিচালনা করে। এই অভিযানে প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্য অংশগ্রহণ করেন। অভিযানের ফলে চিহ্নিত কোনো সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়নি এবং দেশীয় কিছু অস্ত্র ছাড়া আধুনিক কোনো অস্ত্রও উদ্ধার করা যায়নি। তবে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

আমরা মনে করি, জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই অভিযানটি এককভাবে যথেষ্ট নয়। নিয়ন্ত্রণকারী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর চিহ্নিত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা এবং তাদের নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করাও অত্যন্ত জরুরি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চার দশক ধরে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে

প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর আয়তনের বিশাল জঙ্গল সলিমপুর প্রায় চার দশক ধরে কার্যত রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়ে গেছে। সেখানকার পাহাড় কেটে এবং বন উজাড় করে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো নিজেদের বসতি স্থাপন করেছে। যে দলই যখন ক্ষমতায় থেকেছে, সেই দলের পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার সুযোগ নিয়ে সন্ত্রাসীরা সেখানে নিজেদের একটি সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল।

পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল যে, সেখানে অন্য এলাকার কাউকে প্রবেশ করতে হলে সন্ত্রাসীদের অনুমতি লাগত। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযানে গিয়ে নানা সময়ে হামলার শিকার হয়েছে, যা রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছিল।

প্রথম আলোর প্রতিবেদনের পর অভিযান

জঙ্গল সলিমপুরের ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে প্রথম আলোয় গত বছরের অক্টোবর মাসে বিস্তারিত প্রতিবেদন ও সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়েছিল। এর প্রায় পাঁচ মাস পর এসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে সমন্বিত অভিযান চালাল। জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসীরা যাতে কোনোভাবেই আর ফিরতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। অঞ্চলটিকে একটি স্বাভাবিক এলাকায় পরিণত করতে হলে সরকার সেখানে যে উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়েছে, সেটা দ্রুত বাস্তবায়নের কথা বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তবে, এই ক্ষেত্রে সতর্ক থাকাটা অত্যন্ত জরুরি যে উন্নয়ন প্রকল্পের ভারে নতুন করে সলিমপুরের পাহাড় ও বন যেন হুমকির মুখে না পড়ে। কেননা, সামরিক-বেসামরিক, সরকারি-বেসরকারি এবং স্বায়ত্তশাসিত মোট ৪৮টি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে জঙ্গল সলিমপুরে স্থাপনা নির্মাণের আবেদন করেছে।

পাহাড় ও বন রক্ষার দায়িত্ব

জঙ্গল সলিমপুরের বন ও পাহাড় রক্ষা করাটা এখন সরকারের একটি বড় দায়িত্ব বলে আমরা দৃঢ়ভাবে মনে করি। সোমবারের অভিযানে অংশ নেওয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, জঙ্গল সলিমপুরে যেভাবে নির্বিচারে পাহাড় কাটা হচ্ছে, তা বন্ধ করা না হলে অচিরেই এলাকাটি পাহাড়শূন্য হয়ে পড়বে।

সলিমপুর সন্ত্রাসীদের একটি নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হওয়ার বড় কারণ হলো পাহাড় ও বন উজাড় করে গড়ে তোলা বেআইনি প্লট-বাণিজ্য। সেখানকার মোট জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা বলে অনুমান করা হয়, যা এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক মাত্রাকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সাধারণ মানুষের ভাগ্য

সন্ত্রাসী গোষ্ঠী শুধু জঙ্গল সলিমপুরের পাহাড় ও বন ধ্বংসই করেনি, বরং কয়েক হাজার পরিবারের কাছে জমিও অবৈধভাবে বিক্রি করেছে। কয়েক দশকের মধ্যে সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষের লোকালয় গড়ে উঠেছে। সন্ত্রাসীদের কাছে এই পরিবারগুলো শুধু প্রতারিত হয়নি, তাদের জিম্মি করে রাখাও হয়েছিল।

আমরা মনে করি, জঙ্গল সলিমপুরের পরিবেশ ও প্রকৃতি বাঁচিয়ে এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে সেখানে উন্নয়ন পরিকল্পনা নিতে হবে। একটি টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা উন্নয়নের সুফল ভোগ করতে পারে এবং ভবিষ্যতে সন্ত্রাসের পুনরুত্থান রোধ করা যায়।