উখিয়ায় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী নবী হোসেনের ভাই গুলিবিদ্ধ নিহত
উখিয়ায় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী নবী হোসেনের ভাই নিহত

কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী নবী হোসেনের ছোট ভাই মোহাম্মদ কামালকে (৩৫) গুলি করে হত্যা করেছে রোহিঙ্গাদের আরেকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী। বুধবার (৬ মে) বেলা ২টার দিকে উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্প-৮ পশ্চিম বি-ব্লকে এ ঘটনা ঘটে।

নিহতের পরিচয় ও পটভূমি

নিহত মোহাম্মদ কামাল ওই ক্যাম্পের বাসিন্দা মিয়ানমারের মোস্তাক আহমদের ছেলে। তিনি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী নবী হোসেনের ছোট ভাই ও বি-৪১ ব্লকের মাঝির দায়িত্বে ছিলেন। কামাল দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধে জড়িত ছিলেন বলে জানা গেছে।

ঘটনার বিবরণ

আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক রিয়াজ উদ্দিন আহমদ বলেন, 'রোহিঙ্গাদের আরেকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী কামালকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। এতে বুকে ও মাথায় গুলি লেগে তার মৃত্যু হয়। যারা গুলি করেছে তাদের শনাক্ত করা যায়নি। তবে আগের দিনের একটি ঘটনার জেরে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি আমরা। এ ঘটনার পর ক্যাম্পে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে।'

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নিহতের স্ত্রী জানান, জোহরের নামাজ শেষে ইজিবাইকযোগে বাড়ি ফেরার পথে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। রোহিঙ্গাদের আরেকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী এ ঘটনায় জড়িত।

নিহতের চাচাতো ভাই মোহাম্মদ আইয়ুব বলেন, 'ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে রোহিঙ্গাদের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কামালের বিরোধ চলছি। তার জেরে ওই গোষ্ঠীর সদস্যরা গুলি করে হত্যা করেছে।'

চিকিৎসা ও ময়নাতদন্ত

কক্সবাজার সদর হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সাইফুল ইসলাম বলেন, 'গুলিবিদ্ধ অবস্থায় কামালকে হাসপাতালে আনা হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে।'

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রায়ই গোলাগুলির ঘটনা ঘটছে। সংঘর্ষে জড়াচ্ছে মিয়ানমারের একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী। ঘর থেকে তুলে নিয়ে গুলি কিংবা কুপিয়ে হত্যার ঘটনাও রয়েছে। এই সবকিছুর মূলে নবী হোসেনকে (৪৮) দায়ী করছেন রোহিঙ্গা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

মাদক চোরাচালান ও নবী হোসেনের ভূমিকা

রোহিঙ্গা নেতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, নবীর হাত ধরেই ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথের (আইস) বড় বড় চালান ঢুকছে উখিয়া ও টেকনাফে। ক্যাম্পগুলোতে প্রতি মাসে ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকার ইয়াবা ও আইস ঢুকছে। ৯০ শতাংশ ইয়াবার কারবার নবী হোসেন বাহিনীর কবজায়। নবী হোসেনের এই কারবারে সহযোগিতা দেয় মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান সলিডারিটি অর্গানাইজেশনসহ (আরএসও) আরও ৯টি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী বাহিনী। বিনিময়ে তারা পায় মাদক বিক্রির টাকার ভাগ।

কে এই নবী হোসেন

২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে নিপীড়নের মুখে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় আট লাখ রোহিঙ্গা। এই রোহিঙ্গা ঢলের সঙ্গে আসেন নবী হোসেনও। তার বাড়ি রাখাইন রাজ্যের মংডু শহরের ঢেকুবনিয়ায়। বাবার নাম মোস্তাক আহমদ। তার ঠাঁই হয় উখিয়ার বালুখালী আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-৮ পশ্চিম) বি-ব্লকের ৪১ নম্বর শেডে। ২০১৮ সালের শুরুতে মিয়ানমার থেকে আশ্রয়শিবিরে এবং টেকনাফে ইয়াবার বড় চালান আনা শুরু করেন নবী হোসেন। তখন টেকনাফের একজন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন নবী। আশ্রয়শিবিরে নিজের নামে গড়ে তোলেন 'নবী হোসেন' বাহিনী। এই বাহিনীর সদস্য তিন শতাধিক।

পুলিশ ও রোহিঙ্গা নেতাদের দেওয়া তথ্যমতে, নবী হোসেনের এক ভাই ভুলু ক্যাম্প-৮ পশ্চিমের ডি ব্লক এবং আরেক ভাই মোহাম্মদ কামাল বি-৪১ ব্লকের মাঝির দায়িত্বে ছিলেন। আরসার হুমকিতে আত্মগোপনে ছিলেন কিছুদিন। বালুখালী এলাকার চারটি আশ্রয়শিবির (ক্যাম্প-৮ পশ্চিম, ৯, ১০ ও ১৪) নবী হোসেন বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। টাকার ভাগ বসিয়ে মাদক চোরাচালানে নবী হোসেনকে সহযোগিতা দেয় আরও ৯টি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী বাহিনী। এদের মধ্যে রয়েছে মাস্টার মুন্না, ইসলাম, আবদুল হাকিম, আসাদ, জুবাইর, জাবু, মুমিন, জাকির ও শফিউল্লাহ বাহিনী।

নবী হোসেনের ওপর পুরস্কার ঘোষণা

২০২২ সালে মার্চে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরসহ উখিয়া ও টেকনাফে নবী হোসেনকে জীবিত অথবা মৃত ধরে দিতে ১০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে পোস্টার সেঁটেছিল বিজিবি কক্সবাজার ৩৪ ব্যাটালিয়ন। পোস্টারে জঙ্গলের ভেতরে অস্ত্র হাতে দাঁড়ানো নবী হোসেনের ছবি ছাপানো হয়। এতে লেখা হয়, 'ইয়াবা গডফাদার ও মিয়ানমারের নাগরিক নবী হোসেনকে জীবত অথবা মৃত ধরে দিতে পারলে ১০ লাখ টাকা পুরস্কার প্রদান করা হবে।' কিন্তু এখন পর্যন্ত নবী হোসেনের বিষয়ে কেউ সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।

পূর্ববর্তী ঘটনা

এর আগে মঙ্গলবার উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আবারও সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে। দুর্বৃত্তদের গুলিতে এক রোহিঙ্গা নেতা নিহত এবং আহত হয়েছেন আরও দুজন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় উখিয়ার নৌকারমাঠ পুলিশ ক্যাম্পের আওতাধীন ক্যাম্প-৭ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।