খুলনা মহানগর ও জেলায় বিশেষ যৌথ অভিযান চালিয়ে তিন দিনে ১৮৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। তবে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে চিহ্নিত সন্ত্রাসী মাত্র তিনজন। স্থানীয় লোকজন বলছেন, বিশেষ অভিযান চালিয়ে চুনোপুঁটি ধরা কোনো কাজের কথা নয়। পুলিশ বলছে, অপরাধ ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।
অভিযানের বিস্তারিত
গত তিন দিনের অভিযানে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের মধ্যে কসাই লিটন, রিফাত হোসেন ও আজম খানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার অন্য ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন বিভিন্ন মামলার আসামি, মাদক ব্যবসায়ী, মাদকসেবী ও চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ৪ জুন ৬৩ জন, ৫ জুন ৫৯ জন ও ৬ জুন ৬২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সব মিলিয়ে এই তিন দিনে গ্রেপ্তার ব্যক্তির সংখ্যা ১৮৪। এর মধ্যে ৪ জুন সদর থানা–পুলিশ ৬ নারীসহ ১৯ জনকে নগরের তিনটি আবাসিক হোটেল থেকে অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগে গ্রেপ্তার করে।
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা বলেন, সবকিছু পুলিশের নখদর্পণে কিন্তু তাঁদের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। বিশেষ অভিযান করে চুনোপুঁটি ধরাটা কোনো কাজ নয়। চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও দাগি আসামিদের ধরে জনমনে আতঙ্ক দূর করে শান্তি আনতেই বিশেষ অভিযান করা হয়। বিশেষ অভিযান করে চোর-ছ্যাঁচড় ধরলে, সেটা লোকদেখানোই হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বড় অংশই মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এ ধরনের অভিযান এলাকায় সাময়িক স্বস্তি আনে। তাঁর অভিযোগ, খুলনায় সামাজিক অবক্ষয় মোকাবিলায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা তেমন দৃশ্যমান নয়। পাশাপাশি পুলিশের কিছু সদস্যের মধ্যেও গা-ছাড়া মনোভাব রয়েছে।
সন্ত্রাসী গ্রুপের তালিকা
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা ও দুর্বল নজরদারির সুযোগে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। খুলনা মহানগর ও জেলায় এখন ৯টি সন্ত্রাসী গ্রুপের নাম বেশি আলোচিত। এগুলো হলো– রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর বি কোম্পানি, শেখ পলাশের পলাশ গ্রুপ, হুমায়ুন কবীরের হুমা বাহিনী, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান শেখের আরমান গ্রুপ, শাকিল শেখের শাকিল গ্রুপ ও নাসিমুল গণির নাসিম গ্রুপ।
পুলিশের পদক্ষেপ
অপরাধপ্রবণ এলাকা লবণচরা থানার জিন্নাহপাড়া, পুটিমারি, শিশুবাগান আশি বিঘা ও কৃষ্ণনগর এলাকায় চারটি অস্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়েছে। বিভিন্ন ফাঁড়িতে জনবল বৃদ্ধি এবং কয়েকটি এলাকায় ২৪ ঘণ্টা টহল শুরু হয়েছে। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) সূত্র জানায়, ২ জুন রাতে কেএমপি সাতজনকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন কেএমপি সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত বিশেষ অপরাধবিষয়ক সভায় র্যাব, এপিবিএন ও গোয়েন্দা বিভাগকে (ডিবি) এ অভিযানে সম্পৃক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে তাদের কাছে চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের তালিকা সরবরাহ করা হয়।
বি কোম্পানির তথ্য
শনিবার দুপুরে খালিশপুরে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ডিবির উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেন, গ্রেপ্তার লিটন মীর ওরফে কসাই লিটন এবং রিফাত হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ ও তাঁদের ব্যবহৃত মুঠোফোনসহ ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণ করে ‘বি কোম্পানি’ নামে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের প্রচারণা চালালেও এর আড়ালে চক্রটি বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করত। ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, কসাই লিটন শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘গ্রেনেড বাবু’ নামে পরিচিত রনি চৌধুরীর ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ করতেন। সর্বশেষ ঈদেও তিনি বি কোম্পানির ব্যানারে মাংস বিতরণ করেছেন।
খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, চিহ্নিত অনেক সন্ত্রাসী বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। গত তিন দিনে তালিকাভুক্ত নতুন কোনো সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তবে সন্ত্রাসী আশিক বাহিনীর সক্রিয় সদস্য সোহেল, নয়ন ও মেহেদীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও মাদকের একাধিক মামলা রয়েছে।
খুলনার অপরাধজগতে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত নাম রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবু। তাঁর নেতৃত্বাধীন বি কোম্পানিকে ঘিরেই সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি অপরাধমূলক ঘটনার অভিযোগ উঠেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে—এই পাঁচ মাসে খুলনা নগরে ১৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। পুলিশের হিসাবে, গণ-অভ্যুত্থানের পর সংঘটিত ৩৪টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে।



