চলতি সপ্তাহের শুরুতে হরমুজ প্রণালির কাছে একটি নতুন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে ইরান। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে কয়েক মাস ধরে সামরিক স্থাপনাগুলোতে ক্রমাগত হামলা সত্ত্বেও মার্কিন ও ইসরায়েলি আক্রমণ প্রতিহত করার সক্ষমতা তেহরান এখনও বজায় রেখেছে।
ইরানি গণমাধ্যমের বরাতে
ইরানি গণমাধ্যমের বরাতে জানানো হয়, হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপের কাছে ড্রোনটি ভূপাতিত করা হয়। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি আরাশ-ই কামানগির নামক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার এটিই প্রথম যুদ্ধকালীন ব্যবহার। তবে ইরানের এই নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দাবির পক্ষে স্বাধীন কোনও সূত্রের সত্যতা পাওয়া যায়নি।
ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের প্রতিক্রিয়া
ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানায়, তারা প্রতিশোধ নিতে একটি মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যেও দুই দেশের উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, তখন ড্রোন ভূপাতিত করার এই ঘটনা ইরানের অবশিষ্ট বিমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
ইরানের বক্তব্য ও আরাশ-ই কামানগির
ইরানের আধাসরকারী বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির আকাশে একটি ‘শত্রুভাবাপন্ন’ নজরদারি ড্রোন প্রতিহত করতে আরাশ-ই কামানগির ব্যবস্থাটি ব্যবহার করা হয়েছে। পারস্য পুরাণের বীর তীরন্দাজ আরাশ-এর নামানুসারে এই ব্যবস্থার নামকরণ করা হয়েছে, যিনি লোকগাথা অনুযায়ী তীরের সাহায্যে ইরান ও মধ্য এশিয়ার সীমানা নির্ধারণ করেছিলেন। ফার্স নিউজ এটিকে রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম ড্রোন শনাক্তকরণের ক্ষমতাসম্পন্ন হিসেবে বর্ণনা করলেও বিস্তারিত প্রযুক্তিগত তথ্য প্রকাশ করেনি। ইরানি গণমাধ্যম একে তাদের আকাশসীমা ও সামুদ্রিক সীমানার কাছে অবস্থান করা শত্রুভাবাপন্ন বিমানগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ইরানের দাবির নির্ভরযোগ্যতা কতটুকু?
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের এমন দাবি সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত, কারণ দেশটির কর্মকর্তাদের সামরিক অগ্রগতির প্রচার করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, ইরানের এই দাবির পেছনের মূল ধারণাটি যুক্তিসঙ্গত। ইরান মূলত সস্তা, সহজে স্থানান্তরযোগ্য এবং অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় প্রচুর বিনিয়োগ করেছে, যা বড় ও স্থায়ী রাডার ঘাঁটির ওপর নির্ভর না করেই ড্রোন ও বিমানকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।
কিংসবেরি কলেজ লন্ডনের সিকিউরিটি স্টাডিজ স্কুলের সিনিয়র লেকচারার মার্ক হিলবোর্ন আল জাজিরাকে বলেন, আরাশ-ই কামানগির সম্পর্কে তথ্য খুব কম থাকলেও এই হামলাটি তাদের সামগ্রিক কৌশলের সঙ্গে মিলে যায়। তিনি বলেন, ইউক্রেনের মতো ইরানও যুদ্ধের অর্থনৈতিক সমীকরণ বদলে দিতে বেশ চতুরতার পরিচয় দিয়েছে। সস্তা ও সাধারণ ব্যবস্থা দিয়ে তারা অনেক বেশি জটিল ও ব্যয়বহুল ব্যবস্থাকে ঝুঁকিতে ফেলছে।
নিউ ইয়র্কভিত্তিক কৌশলগত গোয়েন্দা সংস্থা হরাইজন এনগেজ-এর নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যালেক্স আলমেদা আল জাজিরাকে জানান, এই ব্যবস্থাটি প্রথাগত রাডারের স্থায়ী নির্দেশনার ওপর নির্ভর না করে সম্ভবত কোনও ধরনের তাপ অনুসন্ধানকারী গাইডেড ব্যবস্থার মাধ্যমে কাজ করে, যা সহজে মোতায়েন ও উৎক্ষেপণযোগ্য। ধীরগতির নজরদারি ড্রোন এমকিউ-৯ রিপার এ ধরনের ব্যবস্থার কাছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্যারিসের সায়েন্সেস পো বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর নিকোল গ্রাজিউস্কিও জানান, সহজে স্থানান্তরযোগ্য এই উৎক্ষেপণ ব্যবস্থাগুলোর বড় সুবিধা হলো এগুলোকে খুব দ্রুত সরিয়ে নেওয়া যায়।
কৌশলগত গুরুত্ব কী
গ্রাজিউস্কি বলেন, ইরানের সামরিক কৌশল প্রযুক্তিগত সমতার চেয়ে টিকে থাকার ক্ষমতার ওপর বেশি নির্ভরশীল। যদি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল ইরানের পাল্টা আঘাত হানার ক্ষমতা পুরোপুরি নির্মূল করতে না পারে, তবে প্রতিটি নতুন হামলা পারস্য উপসাগরে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধি করবে, যা বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী করে তুলবে। তিনি আরও বলেন, ২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেছে। ফলে পশ্চিমা ডকট্রিন অনুযায়ী তাদের ক্ষেপণাস্ত্রকে অকার্যকর মনে করা হলেও, একটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ইরান আসলে তাদের নিজেদের প্রত্যাশার চেয়েও ভালো দক্ষতা দেখিয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা



